উখড়ার পূর্বতন জমিদার লাল সিংহ হান্ডা পরিবারের প্রায় ১৭৭ বছরের প্রাচীন রথ এবং রথযাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত মেলা-মহোৎসবে পশ্চিম বর্ধমানের খনি অঞ্চলের জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে আজও একই রকম মেতে ওঠেন।

উল্লেখ্য যে লাল সিংহ হান্ডা পরিবার কিন্তু বাঙালি পরিবার নয়, এই পরিবারের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন লাহোরের মচ্ছিহাটা থেকে, ব্যবসা সূত্রে, তার পরে “বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল... রাজদন্ডরূপে”। কিন্তু এঁরা বংশপরম্পরায় বাঙালি সংস্কৃতিকে মনের মাধুরী মিশিয়ে দোল, দুর্গোৎসব, রাস, ঝুলন, রথোৎসব—জনসাধারণের সঙ্গে মিলেমিশে পালন করে মনেপ্রাণে বাঙালি হয়ে উঠেছেন। 

উখড়ার জমিদার বাড়ির রথ এবং রথোৎসব বেশ কিছু বিষয়ে অনন্য। এখানে রথ একটি নয়, দু’টি। দু’টি রথ একই রকম দেখতে হলেও আকার, আয়তনে বিস্তর ফারাক। ছোট রথটি উখড়ার জমিদার বাড়ির মহিলা সদস্যেরা রশির সাহায্যে টেনে নিয়ে যেতেন, পরে সামাজিক পরিস্থিতিতে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রথটিকে নির্দিষ্ট কক্ষে স্থায়ী ভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে। এই রথটি শুধু রথের দিন ও উল্টোরথের দিন জনসমক্ষে আসে।

উখড়ার বৃহদাকার রথটি বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধাতুশিল্পের একটি অনন্য নিদর্শন। উখড়ার রথের অলঙ্করণ দর্শককে শুধু মুগ্ধ করে না, এটি কারিগরি নৈপুণ্যের অসাধারণ নিদর্শন। তারাপদ সাঁতরা ‘পশ্চিমবঙ্গের পিতলের রথের তালিকায়’ উখড়ার উল্লেখ করেছেন। ত্রিপুরারঞ্জন বসু জানিয়েছেন, অণ্ডাল থানার উখড়ার জমিদার লাল সিংহ হান্ডা পরিবারের পিতলের রথটি নির্মাণে প্রধান শিল্পী ছিলেন বর্ধমান জেলার কাঁকসা থানার আদুড়িয়া-অমরপুরের রাধাবল্লভ কর্মকার। তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন টিকরবেতার শিল্পী রমানাথ কর্মকার। রথটিতে আগে কোন নির্মাণলিপি ছিল না। সম্প্রতি রাধাবল্লভের নাতি আশিস মেহতরীকে দিয়ে রথের সামনের দিকে একটি ফলক সংযোজিত হয়েছে।

বারোটি ২৩ ইঞ্চির ব্যাস-বিশিষ্ট চাকার উপর এই নবরত্ন রথটি দাঁড়িয়ে আছে। সর্বনিম্ন পাটাতন থেকে সর্বোচ্চ চূড়া পর্যন্ত রথটির উচ্চতা ২০ ফুট ৬ ইঞ্চি। ভূমি থেকে উচ্চতা ২২ ফুট। রথটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি। নীচের থাকের উচ্চতা ৩ ফুট ১ ইঞ্চি, দ্বিতীয় থাকের উচ্চতা ৭ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং তৃতীয় থাকের উচ্চতা ৪ ফুট ২ ইঞ্চি। ছোট রত্নগুলির উচ্চতা ২ ফুট ২ ইঞ্চি, মাঝারি রত্নগুলির উচ্চতা ৪ ফুট এবং সর্ববৃহৎ চূড়াটির উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি।

তারাপদ সাঁতরার মতে, রথশিল্পীরা মন্দিরের স্থাপত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন না মন্দিরের কারিগররা রথের সৌকর্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তা বর্তমানে বলা প্রায় অসম্ভব। সে যাইহোক, উখড়ার রথটি যে সনাতন বাংলা নবরত্ন মন্দিরের ধরনেই তৈরি হয়েছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পিতলনির্মিত রথটির গায়ে অবিশ্বাস্য সূক্ষ্ম অলঙ্করণ লক্ষ করা যায়। যা রিলিফের কাজগুলিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছে। রথের চারদিকের রিলিফ ভাস্কর্যের বিষয়বস্তু হ’ল– জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম পূজিত হচ্ছেন; অনন্তনাগের উপর শ্রীবিষ্ণু; গরুড়ের উপরে শ্রীবিষ্ণু। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের সামনে প্রণামরত হনুমান; ওঁ-এর ভেতর রাধাকৃষ্ণ; বংশীবাদক শ্রীকৃষ্ণ; নৌকাবিলাস; কালীয়দমন; শ্রীকৃষ্ণ ও গোপিনীদের দোল উৎসব; কৃষ্ণ ও বলরামের গোষ্ঠলীলা; মহাভারতের যুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্য; সিদ্ধার্থ, হাঁস ও দেবদত্ত; প্রলয়নাচনে নটরাজ; শ্রীকৃষ্ণের পাশাখেলা; ঝুলন; নৃসিংহ অবতার; শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী বিষ্ণু; পরশুরাম; সিংহের পিঠে বসে মা দুর্গা, কোলে ছোট্ট গণেশ ও গীতগোবিন্দের পদ অনুসরণে রাধার পা ধরে কৃষ্ণের ক্ষমা চাওয়ার চিত্ররূপ ইত্যাদি।

রথের প্রতিটি দিকের নীচের থাকে দু’পাশে দুই প্যানেলে দু’টি রিলিফ, মাঝখানে ঝালর এবং ছ’খানি রেলিংয়ের মতো দণ্ড বা ‘বর্শা’; দ্বিতীয় থাকে দু’পাশে দু’টি রিলিফ এবং মাঝে দু’খানি বড় রিলিফের কাজ। শেষ বা তৃতীয় থাকে দু’পাশে দু’টি রিলিফের কাজ এবং মাঝে ঠাকুরের সিংহাসনের মতো জায়গায় একটি বড় কাজ। তারাপদ সাঁতরা লিখেছেন, “... যে রথগুলির নক্‌সা বা খোদাই করা কাজ আছে তা আবার দু’টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এরমধ্যে প্রথমটি হ’ল স্বল্প গভীর দাগ কেটে নক্্সার কাজ এবং অপরটি হ’ল পিছন থেকে নক্্সার ছাঁচ দিয়ে পিটিয়ে উঁচু করা রিলিফের কাজ”। আলোচ্য রথটিতে দ্বিতীয় ধরনের কাজই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে পৌরাণিক গল্প, চরিত্র ও ফুলকারি নকশা করার ক্ষেত্রে আর প্রথম ধরনের কাজ– তাও অল্প পরিমাণে – ব্যবহৃত হয়েছে ঝালর ও নকশার ক্ষেত্রে। রথটিতে একটি প্রমাণ আকারের ঘোড়া এবং রথের চালক ছাড়া অন্য কোনও মূর্তি ব্যবহৃত হয়নি। ন’টি রত্নের বড় রত্নটি ছাড়া আটটি চূড়াতেই তিনটি করে কলস, চক্র ও নিশান আছে। যাত্রার সময়ে তারে আটকে যায় বলে বড় রত্নটির এই অংশগুলি খুলে রাখা হয়েছে।

জমিদার পরিবারে বর্তমান প্রজন্মের কাছে জানা গেল প্রতি বছর প্রায় ষোল কিলোগ্রাম তেঁতুল লাগে রথটি পরিষ্কার করতে। রথযাত্রা শুরু হওয়ার আগে গোপীনাথ জীউয়ের মন্দির থেকে শ্রীশ্রী গোপীনাথ জীউ, রাধা এবং অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহকে চৌদোলায় বসিয়ে কীর্তন গাইতে গাইতে রথের কাছে এনে প্রদক্ষিণের পরে সর্বোচ্চ কক্ষে স্থাপন করা হয়। ২০০৫ সাল থেকে ট্রাক্টর দিয়ে রথটি টানানো হচ্ছে, তবে এখানে ভক্তরা দড়ি ধরে টানতে পারেন। এখানে রথের দিন এবং উল্টোরথের দিন– এই দু’বার রথ বেরোয় বিকেল সাড়ে চারটেয়। রথটিকে নিয়ে শোভাযাত্রা কয়েকশো মিটার গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং নির্দিষ্ট ভবনে প্রবেশ করিয়ে দেউড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। রথযাত্রা উপলক্ষে উখড়ার রথতলা থেকে বাজপাই মোড় পর্যন্ত মেলা বসে এবং প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন হয়। রথের দড়ি স্পর্শ করার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। লাল সিং হান্ডা পরিবারের বর্তমান সদস্যেরা এবং এস্টেটের কর্মচারীরা রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। পরিবারের মহিলারাও চাল ও বাতাসা ছুঁড়ে প্রণাম করেন। এক বার রশিতে হাত ছোঁয়ান।

তারাপদ সাঁতরা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সম্পাদক