Advertisement
E-Paper

সস্তা হাততালির রাজনীতি

প্রাদেশিকতার কোনও জায়গা এখানে নেই। সুভাষচন্দ্রের পোর্ট ব্লেয়ারে পদার্পণের পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে মোদী গেলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের ওই পর্বটিকে স্মরণ করতে।

উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০১৯ ০২:০৫
অতিভক্ত: সেলুলার জেলে সাভারকরের ছবির সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রণাম, পোর্ট ব্লেয়ার, ৩০ ডিসেম্বর। পিটিআই

অতিভক্ত: সেলুলার জেলে সাভারকরের ছবির সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রণাম, পোর্ট ব্লেয়ার, ৩০ ডিসেম্বর। পিটিআই

নাম বদলের হিড়িকে এ বার আন্দামান। আজ়াদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ’ আখ্যা দিতে চেয়েছিলেন। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার পোর্ট ব্লেয়ারের মূল ভূখণ্ড বাদ দিয়ে রস আইল্যান্ডকে সুভাষচন্দ্রের নামে এবং হ্যাভলক ও নেল আইল্যান্ডকে যথাক্রমে ‘স্বরাজ’ ও ‘শহিদ’ দ্বীপ হিসেবে ঘোষণা করলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই ঘোষণা বাঙালি হিসেবে আমাদের নিশ্চয়ই গৌরবান্বিত করেছে। সেই সঙ্গে তুলে ধরেছে কিছু অপ্রিয় প্রশ্নকেও। পোর্ট ব্লেয়ার এবং তৎসন্নিহিত সেলুলার জেল কেন এই ইতিহাসের সম্মান থেকে বঞ্চিত হল? পোর্ট ব্লেয়ারের নামটিই তো সুভাষচন্দ্রের নামে রাখা যেত। না কি তা হলে সাভারকরকে ঘিরে যে ইতিহাসের বিকৃতি চলছে, সেটা আড়াল করা যেত না? হ্যাভলক ও নেল আইল্যান্ডে প্রকৃতি অনবদ্য সৌন্দর্যের হাত ধরে আছে। কিন্তু তার সামাজিক ইতিহাস দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যার সঙ্গে জড়িত। বাঙালি উদ্বাস্তুদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম আজ সেখানে প্রতিষ্ঠিত। সামান্য জনসংখ্যার দ্বীপ দু’টিতে সেই মানুষেরা পর্যটনশিল্পের উপর আর প্রকৃতির খামখেয়ালের উপর নির্ভরশীল। কখন কী বিপর্যয় ঘটে বলা যায় না। রস আইল্যান্ডের কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনও পর্বের সঙ্গেই হ্যাভলক বা নেল দ্বীপের কোনও সম্পর্ক ছিল না।

প্রাদেশিকতার কোনও জায়গা এখানে নেই। সুভাষচন্দ্রের পোর্ট ব্লেয়ারে পদার্পণের পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে মোদী গেলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের ওই পর্বটিকে স্মরণ করতে। কিন্তু মূল ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে নিকটবর্তী তিনটি দ্বীপের নামকরণ আজ়াদ হিন্দ বাহিনীর শৌর্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মধ্যে একটি বার্তা পাওয়া যায়— স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল সংযোগ যে সেলুলার জেল, তাকে সাভারকরের নামের সঙ্গে অন্বিত করে রাখা। সেলুলার জেলের প্রতিটি কক্ষ যে যন্ত্রণার, যে আত্মত্যাগের ইতিহাস বহন করে চলেছে, তা কোনও ভাবেই কোনও প্রদেশ বা ব্যক্তির নিজস্ব নয়। তবু সেখানে ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিকে অসম্মান করছে। সেলুলার জেলে যাঁরা দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন তাঁদের সবাইকে বিভিন্ন কক্ষে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাখা হত। অথচ কোণের দিকে একটি কক্ষকে সাভারকর কক্ষ হিসেবে দেখিয়ে সেখানে তাঁর ছবি, জীবনী সাজিয়ে রেখে কী প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে, তা সহজেই বোধগম্য। যদি জেল মিউজ়িয়াম কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান, কোন কক্ষে উল্লাসকর দত্ত ছিলেন, কোনও উত্তর পাবেন না। বস্তুত সেলুলার জেলে সাভারকর পুজো এতটাই পরিব্যাপ্ত যে সরকারি গাইড সারা ক্ষণই তাঁর বর্ণনায় এক জন ব্যক্তির কথাই বলে যাবেন।

সাভারকর ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন কি না, সে বৃত্তান্ত না হয় আলোচনার বাইরেই থাক। শুধু হিন্দুত্ববাদীদের কাছেই নয়, গোটা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেরই লজ্জাজনক অধ্যায় সেটা। ১৯১০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত সেলুলার জেলে বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সংখ্যা ৪৯৯। এঁদের বেশির ভাগই বাঙালি— ৩৭০। এর পরই আছেন পঞ্জাবের বিপ্লবীরা। এঁদের সংখ্যা ৮৪। মরাঠা থেকে মাত্র তিন জনের নাম পাওয়া যায়। (তথ্যসূত্র: আন্দামানের সেলুলার জেল, রতন চন্দ্র কর)।

তিন মরাঠা বিপ্লবীর এক জন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। তিনিই আলোকবৃত্তের কেন্দ্রে। কারণ সহজবোধ্য। তিনিই হিন্দুত্ববাদের মূল কান্ডারি, তাদের আকরগ্রন্থের স্রষ্টা। সেখানে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন হিন্দু পুণ্যভূমির প্রেক্ষিতে। অর্থাৎ এ দেশ যাঁদের ধর্মীয় সত্তার উৎসভূমি নয় তাঁদের দেশপ্রেমকে সন্দেহ করা হয়েছে। বর্তমানের কর্পোরেট হিন্দুত্বের নিপাট আগ্রাসনের থেকে অবশ্য সাভারকর পৃথক। তিনি একটি বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে তোলার চেষ্টা করেছেন যাকে অক্ষরের দ্বারাই স্পষ্ট বিরোধিতা করা সম্ভব। কিন্তু গোরক্ষার নামে তাণ্ডবকারী ও তার প্রশ্রয়দাতাদের প্রতিহত করার কোনও শিক্ষা তো অর্জিত নয়। নেহাত তর্কপ্রিয়তাই আমাদের অস্ত্র। অতএব সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের নতুন অবয়বকে প্রতিহত করতে পারে পাল্টা ভিন্ন দাবির রাজনীতি। যেখানে ধর্মীয় অনুষঙ্গ সম্পূর্ণ ব্রাত্য হয়ে পড়বে। মানুষের বেঁচে থাকার উপাদানগুলির উপরেই গড়ে উঠবে নতুন দিনের রাজনৈতিক ভাষ্য।

এখানেই আন্দামান আর সেলুলার জেলের প্রাসঙ্গিকতা। অথচ তার ইতিহাসকে শুধুমাত্র সাভারকরের নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার রাজনীতির নেপথ্যে রয়েছে এক তীব্র অসহায়তা। বস্তুত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নায়কদের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনও প্রত্যক্ষ যোগসূত্র নেই। বিচ্ছিন্ন ভাবেও প্রাক-স্বাধীনতা পর্বে হিন্দুত্ববাদী বা ইসলামি সাম্প্রদায়িক উচ্চারণের মধ্যে সমগ্র দেশভাবনার পরিচয় মেলে না। কিন্তু তাতে কী? মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা কি আজ বাংলাদেশে রাজনীতি করবেন না? বাংলাদেশি সত্তার সঙ্গে নিজেদের অন্বিত করবেন না? ঠিক তেমনই এ দেশেও দেশপ্রেমের ছড়াছড়ি বোঝাতে স্বাধীনতা সংগ্রামে ভাগ বসাতে হচ্ছে। তাই সর্দার পটেলকে নিয়ে টানাটানি। নেহরুর সঙ্গে নানা কল্পিত বিরোধের গল্প ফেঁদে মূলস্রোতের কংগ্রেসি জাতীয়তাবাদী ভাবনার একটি পৃথক ভাষ্য নির্মাণ। যেন সর্দার পটেলের সঙ্গে দেশপ্রেমের প্রকল্পটি সমানে সমানে মিলে যায়। সাভারকরের ক্ষেত্রে সেলুলার জেল এবং পোর্ট ব্লেয়ারকে ঘিরে তৈরি করা হল এক বিচ্ছিন্ন ইতিহাস, যা দেশবাসীর সামনে কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে হিন্দুত্ববাদী আইকনের সঙ্গে একাত্ম করে দিতে পারে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে প্রাদেশিকতার সম্পর্ক থাকা উচিত নয়, সে আমরা জানি। কিন্তু আত্মত্যাগ? কেন তুলে ধরা হবে না স্বাধীনতা অর্জনের সম্পূর্ণ ইতিহাস? পঞ্জাবের কারামন্ত্রী সম্প্রতি এই প্রশ্ন তুলেছেন যে, কেন সেলুলার জেলে পর্যটকদের সামনে পঞ্জাবের বিপ্লবীরা যথার্থ গুরুত্ব পান না? অবশ্যই, তাঁর বক্তব্য বাঙালিদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে। তবে এ প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে, সাভারকরের সঙ্গে সেলুলার জেলকে এমন ভাবে গেঁথে ফেলা হচ্ছে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেন, আমরাই অনেকে ওখানে গিয়ে ছুটছি সাভারকরের কক্ষ দেখার জন্য, তাঁর জীবনী শোনার অভিপ্রায়ে। অথচ চট্টগ্রামের অনন্ত সিংহ, লোকনাথ বল, গণেশ ঘোষ বা উত্তর ভারতের আলি আহমেদ সিদ্দিকী, আব্দুল কাদের চৌধুরী, আলিপুর বোমার মামলার উল্লাসকর দত্ত, বারীন ঘোষ, গদর পার্টির বাবা সোহন সিং ভাকনা, রুম্পা কৃষক বিদ্রোহের যোদ্ধা বোনাঙ্গী পান্ডু পাদল-সহ অসংখ্য বিপ্লবীর একমাত্র প্রতিনিধি কখনওই সাভারকর হতে পারেন না। তাঁর যোগ্যতাকে খাটো না করেই এ কথা বলা যায়।

পঁচাত্তর বছর কিসের? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম পর্বে জাপানি সৈন্যরা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ব্রিটিশ মুক্ত করে। ১৯৪৩-এর ৬ নভেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো আন্দামান ও নিকোবরকে আজ়াদ হিন্দ সরকারের হাতে সমর্পণ করেন। সুভাষচন্দ্র ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেলুলার জেলে যান ও বন্দিদের মুক্ত ঘোষণা করেন। ওই বন্দিদের অনেকেই ছিলেন জাপানিদের দ্বারা গ্রেফতার হওয়া ভারতীয় যাঁদের ধরা হয়েছিল ব্রিটিশ চর হওয়ার অভিযোগে। বস্তুত ব্রিটিশদের চর খুঁজতে গিয়ে আন্দামানের সর্বত্র বেশ কিছু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটিয়েছিল জাপানের বাহিনী। সুভাষচন্দ্র সে বিষয়টি জানতে পারেন। সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেও দ্বিধা করেননি। সেলুলার জেলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেছিলেন। ৩০ ডিসেম্বরের ভাষণে তিনি প্যারিসের বাস্তিল দুর্গের পতনের সঙ্গে সেলুলার জেলের বন্দি মুক্তির তুলনা টানেন। সস্তা হাততালির রাজনীতি তাঁর লক্ষ্য ছিল না। সামগ্রিক ভাবে দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামেরই অংশ ছিল এই অধ্যায়। কক্ষগুলির নির্জনতা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে সন্ধ্যার আঁধারে, মনে হয়, আমাদের চেতনা জুড়ে অস্থির হয়ে উঠছেন জেলের অত্যাচারে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা উল্লাসকর, জেলার ডেভিড ব্যারির বর্বরোচিত আচরণে সেলের মধ্যেই আত্মহত্যা করছেন যুবক ইন্দুভূষণ রায়, আর সুভাষচন্দ্রের পদধ্বনি আজকের পাটোয়ারি রাজনীতিকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিজেপি শাসকের নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে তো তার অতি সুদূরের সম্পর্ক!

বঙ্গবাসী কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

BJP Narendra Modi Cellular Jail Netaji Subhash Chandra Bose
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy