এই যা দেখা গেল কলকাতায়, নরেন্দ্র মোদীর সিবিআই-বাহিনী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ-বাহিনীর মধ্যে ধস্তাধস্তি হুমকি ধর্নার কুনাট্য, বাংলা সিরিয়ালকে হার মানিয়ে যা বলিউড থ্রিলারের পর্যায়ে পৌঁছে যায়— তার থেকে একটা কথা জলের মতো পরিষ্কার: এ দেশে সাংবিধানিক মান্যতা বস্তুটি আজ অতীত হতে হতে প্রায় রূপকথার পর্যায়ে চলে গিয়েছে। আজ যদি আমরা অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের বোঝাতে যাই যে সিবিআই হল দেশের কঠিনতম জটিলতম অপরাধগুলির তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান, আর পুলিশ হল সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিষ্ঠান, তারাও বোধ করি হেসে লুটিয়ে পড়বে। পুলিশ কিংবা সিবিআইকে এই অবতলে নামিয়ে আনার জন্য আমাদের রাজনীতিকদের একটা বিরাট সাধুবাদ প্রাপ্য। সামাজিক শান্তি-স্থিতি-ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাঁরা যে নটেগাছটির মতো গোড়া থেকে মুড়িয়ে দিয়েছেন, সে বড় সহজ কাজ নয়! 

ব্যাপারটা নতুন নয়। এ কাজ কোনও রাজনৈতিক দলের একার— এও বলা যাবে না। মধ্য-সত্তর দশকের জরুরি অবস্থার সময়েই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মান্যতা ধ্বংসের প্রবণতা আমরা দেখেছি। কিন্তু প্রবণতা সব সময়ে একই রকম থাকে না, সব সরকারের আমলে তা একই ভাবে প্রকাশিত হয় না। বাস্তবিক, উনিশশো আশির দশকের শেষ থেকে ভারতে নানা ধরনের শরিকি সরকারের রাজত্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি আর একটা ঘটনাও ঘটেছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতার বিক্ষিপ্ততার সূত্রে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি যেন কিছুটা দম ফিরে পেয়েছিল। বিচারবিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সংবাদমাধ্যম ইত্যাদির মধ্যে একটা স্বাধীনতার স্ফুরণ ঘটেছিল। গত পৌনে পাঁচ বছর অবশ্য একটা অসাধারণ সময়। এই সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মান্যতা ধ্বংসের প্রবণতা এমন একটা উচ্চবিন্দুতে উঠে যায় যে তার তুলনা আগের দশকগুলোয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সাম্প্রতিক কলকাতাকাণ্ডে পুলিশ কমিশনার বেশি অন্যায় করেছেন, না সিবিআই কর্তারা, এই তর্ক চলছে, চলবে। তর্কটার মধ্যে তথ্যের ছাপ যতটা, তার থেকে বেশি উজ্জ্বল রাজনৈতিক মতামতের রং। তাই তর্কটার মধ্যে না ঢুকে বরং একটা অন্য কথা বলা যাক। সিবিআইয়ের কথা না শোনার স্পর্ধা যদি কেউ দেখান, সেটাও কিন্তু সিবিআইয়েরই ব্যর্থতা বলেই মানতে হবে। এত বড় একটা তদন্ত সংস্থাকে কেন রাজনীতির পরিসরে নামিয়ে এনে বিরোধীরা তাকে অমান্য করার সাহস পাবেন, সেটার উত্তরও সিবিআইকেই দিতে হবে। কোনও দুর্নীতিকাণ্ডের তদন্তে রাজনৈতিক রং কেন এত স্পষ্ট হয়ে উঠবে? কেবল বিরোধীরাই তো সেই রং দেখতে পাচ্ছেন না, সাধারণ মানুষও পাচ্ছেন! কেন এমন হয় যাতে গত চার বছর দিব্যি চুপচাপ কাটিয়ে হঠাৎ ভোট-বছর পড়তেই বিভিন্ন দুর্নীতি তদন্তের ধুম পড়ে? কেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার থেকে দিল্লির ব্যবসায়ীপ্রবর রবার্ট বঢরাকে এমন সময়ে ডেকে পাঠানো হয় যা আপামর ভারতবাসীকে মনে করিয়ে দেয়: উঠিল বাজনা বাজি/ ভোটের সময় এল কাছে? কেনই বা কেন্দ্রীয় শাসক দলের বিরুদ্ধে রাফাল দুর্নীতি তদন্ত চলার সময়ই সিবিআই অধিকর্তাকে সরানোর হুড়োহুড়ি শুরু হয়? অলোক বর্মা যদি নিজে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন— হতেই পারেন— কেন তাঁকে আগেই সরানো হয়নি? কেনই বা বর্মা চলে যাওয়ামাত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্তাদের ডানা ছেঁটে প্রতিপক্ষ রাকেশ আস্থানার ঘনিষ্ঠদের বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়? কেন্দ্রীয় সরকার এক দিকে বলে যে তারা সিবিআইয়ে হস্তক্ষেপ করছে না, অন্য দিকে কেন তবে এক বিশেষ গোষ্ঠীর ক্যাডারদের উঁচুপদে ওঠানোর ‘শাফলিং’ চলে? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে পর্যন্ত কলা দেখিয়ে, একটি গুরুতর মামলার মধ্যপথে বর্মা-ঘনিষ্ঠ ডেপুটি-ডিরেক্টর এ কে শর্মাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সিবিআইকে কেন গত কাল সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে আদালত অমান্যের কঠোর ভর্ৎসনা শুনতে হয়? 

আসলে ‘টাইমিং’ জিনিসটা খুব গুরুতর। রাজনীতির ভিতর ও বাইরের অনেক কথা তা ফাঁস করে দেয়। সিবিআই যে ভাবে কাজ করছে, যে ভাবে অনাবশ্যক নৈশ অভিযান চালাচ্ছে, তাতে দিনের মতো উজ্জ্বল তাদের রাজনৈতিক হিসেব। বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাত পোহাতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তগুলি এমনি-এমনি নয়, কোনও একটা অবসরগ্রহণ বা বিশেষ তারিখ মাথায় রেখেই বেছে নেওয়া হচ্ছে তল্লাশি বা গ্রেফতারির সময়।

রাত পোহাতে না দেওয়ার কথায় ভেসে আসে আরও একটা স্মৃতি। গত বছর কর্নাটকে রাত বারোটার পর বিচারপতিদের ঘুম থেকে জাগিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারে বসার স্মৃতি। সর্বোচ্চ আদালতকে এ যাবৎ কাল অনেক সময়ই জরুরি অধিবেশন করতে হয়েছে, কিন্তু কর্নাটকে যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, সেটা অভূতপূর্ব। রাত ফুরোলেই বিজেপি প্রার্থীকে মুখ্যমন্ত্রী করতে অসুবিধে হতে পারে বলে সারারাত জেগে রইলেন সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতি, বিপক্ষ দলের আর্জি বাতিল করে ওই রাতেই তাঁদের বলতে হল যে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইয়েদুরাপ্পার শপথগ্রহণে কোনও আইনি বাধা নেই। দিনটা ছিল ২০১৮ সালের ১৭ মে। 

তত দিনে অবশ্য নতুন করে হতাশ হওয়ার আর কিছু নেই, কেননা ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারিতেই ঘটে গিয়েছে সেই বৈপ্লবিক বৈঠক: সুপ্রিম কোর্টের চার মাননীয় বিচারপতি প্রেস ক্লাবের বাইরে টেবিল পেতে বসে সর্বোচ্চ আদালতের উপর রাজনৈতিক চাপ বিষয়ে তাঁদের প্রবল অভিযোগ সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁদের অভিযোগের অভিমুখ যে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির প্রতি, স্পষ্ট করে না বললেও বুঝতে অসুবিধে হয়নি। ভারতের গণতন্ত্রের সামনে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে, এ এক ‘এক্সট্রা-অর্ডিনারি’ পরিস্থিতি— এতটাই তাঁরা বলেছিলেন। বিচারপতিরাই যখন বিচারবিভাগের বিপন্নতার সংবাদ এ ভাবে জানান, বুঝতে অসুবিধে হয় না পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। 

বিচারবিভাগ আর আইনশৃঙ্খলা-ভিত্তিক বৃহত্তর ন্যায়ব্যবস্থা— এই দু’টিই যে কোনও গণতন্ত্রের প্রধান শক্তি, নিরপেক্ষতার মূল ভিত্তি। মোদীর শাসনে এই ভিতগুলোকে ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নষ্ট করা ও সামাজিক প্রতিবাদের মুখ বন্ধ করার কী ধরনের ব্যবস্থাপনা চলছে, আমরা মোটামুটি জানি। প্রতিবাদীদের কণ্ঠরোধের জন্য নিধন পর্যন্ত করা যায় এখন, এবং নিধনকারীরা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় পর্যন্ত পেতে পারে। এম এম কালবুর্গি এবং গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীদের মধ্যে সংযোগ আছে, বস্তুত তারা একই সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত বলে সন্দেহ— কর্নাটক সরকারের বিশেষ তদন্ত কমিটি সুপ্রিম কোর্টে এই তথ্য পেশ করেছিল। এর পর পরই সর্বোচ্চ আদালত সিবিআইকে নির্দেশ দেয় যে, মহারাষ্ট্রের এম এম দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে হত্যাকাণ্ড ও কর্নাটকের কালবুর্গি ও লঙ্কেশ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সাধারণ সূত্র নিয়ে দ্রুত আরও তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে। রাজ্য সরকারগুলির প্রাপ্ত তথ্য এক জায়গায় এনে একটা বৃহত্তর তদন্তের দায় সিবিআইয়েরই। অথচ ডিসেম্বরের গোড়ায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত সিবিআইয়ের তরফে অগ্রসরের প্রমাণ মেলেনি।  

কোনও কোনও ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের তদন্ত হাতে নিতে যেমন অনীহা, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার রাজ্য প্রশাসনকে কেন্দ্রের যথেচ্ছ ‘ফ্রি-হ্যান্ড’ দেওয়ার দৃষ্টান্তও অতি উজ্জ্বল। উদাহরণ উত্তরপ্রদেশ। আইনের বাইরে বেরিয়ে এসে পুলিশ সে রাজ্যে যে ভাবে ‘অপরাধদমন’ ও ‘শৃঙ্খলা’র নামে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার কাজ করে চলেছে, তা শুধু বিরল নয়, অভূতপূর্ব। শাসক দলের বিধায়ক নাবালিকাকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হলেও তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে প্রকাশ্যে, তদন্তের প্রশ্নই ওঠেনি। যোগী আদিত্যনাথ ২০০৫ সাল থেকেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রচারের কারণে বিবিধ ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত— কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রসাদে তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকেছে বাধাহীন, মসৃণ।          

প্রতিষ্ঠানের শিরদাঁড়া ভাঙার কথাই যদি ওঠে, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের উল্লেখটা জরুরি। গভীরে যাওয়ার দরকার নেই, অর্থমন্ত্রকের সঙ্গে অধিকর্তা উর্জিত পটেলের সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের ইতিহাসই যা বলার বলে দেয়। সরকারি ছড়ি যদি দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিকেও গ্রাস করে, বিপন্নতা কত দূর তা হয়তো নাগরিকের বোধবুদ্ধির নাগালেরও বাইরে। 

সামনের জাতীয় নির্বাচনে কে এগোবে কে পিছোবে, সে সব ক্রমশ প্রকাশ্য। কিন্তু নিশ্চিত সত্য হল— যে দলই জিতে এসে সরকার গড়ুক না কেন, গত কয়েক বছরে যা ভেঙে দেওয়া হয়েছে তাকে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না, এমনকি সম্ভব নাও হতে পারে। প্রতিষ্ঠান এমনই একটা জিনিস যা গড়তে বহু সময় লাগে, আর ভেঙে যাওয়ার পর আবার গড়তে তার বহু গুণিতক বেশি সময় লাগে। স্বাধীন দেশে অনেক কষ্টে গণতন্ত্রের যে স্তম্ভগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তার জোরেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত একটি আলাদা উচ্চতা অর্জন করেছিল, উচ্চতায় ইউরোপ-আমেরিকার গণতন্ত্রগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিল। 

তে হি নো দিবসা গতাঃ। এখন কেবল ঝরাপাতার খেলা।