সম্প্রতি কলিকাতা মহানগরীতে দুই-একটি ছোট-বড় নাগরিক সভার আয়োজন দেখা গেল। কলিকাতার ঘটনাবহুল জীবনে এমন সভার কথা আলাদা ভাবে বলিবার প্রয়োজন কী, সে প্রশ্ন উঠিতেই পারে। উত্তর— দৃশ্যতই এই সভাগুলির আকারপ্রকার অনেক আলাদা। ইহারা পুরাদস্তুর নাগরিক সংগঠন দ্বারা পরিচালিত, কিন্তু বিষয়ভাবনায় সর্বৈব রাজনৈতিক। দলতন্ত্রের বাহিরে রাজনীতির কথা যখন সচরাচর আর চিন্তাও করা যায় না, এমন সময়ে এই নাগরিক সভাগুলি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বুঝাইয়া দেয়, দেশব্যাপী ক্ষমতাগোষ্ঠীর দাপাদাপিতে প্রতিবাদের নিবন্ত শিখাটি ক্রমে জ্বলিয়া উঠিতেছে। এখনও শিখাটি বড়ই ক্ষীণ, এখনও তাহার আলোক বড়ই স্তিমিত। সভাগুলিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দুঃখজনক ভাবে কম, কার্যপদ্ধতি অতি সীমিত। তবু কোথাও আশা জাগে। তবু ভরসা করিতে ইচ্ছা হয়, অতীতে যেমন প্রতিবাদের ধুকপুকানিকে অঙ্গীকারের দৃপ্ত ঘোষণায় পরিণত হইতে দেখিয়াছে এই শহর, আবারও হয়তো তেমন ঘটিবে। আবারও হয়তো হাতে হাত রাখিয়া প্রতিবাদী ভিড় শাসকের অত্যাচার-প্রকল্পকে ব্যর্থ করিয়া দিবে।   

সন্দেহ নাই, রাষ্ট্র বনাম নাগরিক কিংবা শাসক বনাম বিরোধী— যে কোনও আতসকাচ দিয়া দেখিলেই ভারতের পরিস্থিতি এখন গভীর হতাশাময়। কোথাও নাগরিক তাহার পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রের দ্বারা নিপীড়িত হইতেছে। কোথাও বিরোধীর চিন্তাভাবনা তাহাকে শাসকের দমনের লক্ষ্য করিয়া তুলিতেছে। সব মিলাইয়া, স্বাধীন ভারতের গণতন্ত্র তাহার এ যাবৎ কালের নিম্নতম বিন্দুটির দিকে দ্রুত ধাবমান। গণতন্ত্রের কোনও অর্থ যদি এখনও বাঁচাইতে হয়, তবে একটিই বস্তু অতীব জরুরি। প্রতিবাদ। রাজনীতির বাস্তব কোন দিকে বাঁক লইবে, সে সকল ভবিষ্যতের কথা। বর্তমানে যদি কিছু করিবার থাকে, তাহা হইল, ছোট বড় সম্ভাব্য সকল পরিসরে প্রতিবাদ সংগঠিত করা। সমাজতাত্ত্বিক পল গিনসবর্গ লিখিয়াছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয়তার বাহিরে নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা না থাকিলে কিন্তু গণতন্ত্র দুই দিক হইতে অচল হইয়া পড়ে। প্রথমত, নাগরিক সক্রিয়তাই পারে সত্যকারের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব তৈয়ারি করিতে। দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণ, আলাপ-আলোচনা এবং প্রয়োজনে বিরোধিতা সংগঠন করিয়া নাগরিক সমাজই গণতন্ত্রকে ক্ষমতাব্যবস্থার বাহিরেও অর্থময় করিয়া তোলে। ভারতের নাগরিক সমাজকে এখন প্রধানত এই দ্বিতীয় ভূমিকাটির বিষয়েই অধিক সচেতন হইতে হইবে, যদি আবারও তাহার গণতন্ত্রকে গণকল্যাণের দিকে লইয়া যাইতে হয়।

নাগরিক সমাজের ভূমিকার দিক দিয়া কলিকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ এক কালে দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল। সে অবশ্যই গত শতকের কথা। দীর্ঘ খরার পর একবিংশ শতকের প্রথম দশকে আবারও সেই গরিমা কিছুটা দাবি করা সম্ভব হয় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে। অতঃপর যদিও নাগরিক বিবেক রাজনীতির গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়া ফেলে, তাহার অর্থ নিশ্চয় ইহা নহে যে আবারও সে জাগিয়া উঠিবে না, অন্যায়ের প্রতিবাদে মুষ্টি উঠাইবে না? বাস্তবিক, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের তুলনায় এখনকার রাজনৈতিক সঙ্কট অনেক গভীরতর, বিপদ তীব্রতর। অসহনশীল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দাপট এবং স্বৈরাচারী শাসকের অপশাসন, উভয়ই আজ দেশের একেবারে মূলগত ভিতটিকে আঘাত করিতেছে, গণতন্ত্রের শিকড় উপড়াইবার চেষ্টায় মাতিয়াছে। এ এমন পরিস্থিতি যেখানে অসুস্থ বর্ষীয়ান নাগরিকও তীক্ষ্ণ দায়িত্ববোধে প্রতিবাদসভায় হাজির হইতে পারেন। এ এমন পরিস্থিতি যখন বিবেকবান নাগরিক মাত্রেই বিপন্ন বোধ করিতে পারেন। আর এক বার সক্রিয় ও সরব হইবার কথা ভাবিতে পারেন।