Advertisement
E-Paper

কেবল লকডাউনে কাজ হবে না

লক ডাউনে সারা দেশের অর্থনীতির ক্ষতি তো হবেই, এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী, কিন্তু এখনই প্রত্যক্ষ ভাবে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসবে এই মানুষগুলোর ওপরে।

অংশুমান কর

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২০ ০০:০১
ভারতের মতো একটি দেশে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন এতই তীব্র ভাবে আজও প্রকট যে, করোনার মতো মহামারিও সেই অসাম্যকে মুছে দিতে পারেনি পুরোপুরি।

ভারতের মতো একটি দেশে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন এতই তীব্র ভাবে আজও প্রকট যে, করোনার মতো মহামারিও সেই অসাম্যকে মুছে দিতে পারেনি পুরোপুরি।

লক ডাউন পাঁচ দিনের। তাই সকাল সকাল বাজার করতে বেরিয়েছি। যদিও বলা হয়েছে যে, মুদির দোকান খোলা থাকবে, অত্যাবশ্যক পণ্য পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে দুধ, তবুও ভয়— যদি শুরু হয় কালোবাজারি, যদি না-মেলে চাল-ডাল-সব্জির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সকাল সকাল বাজারে বেরিয়েছি তাই। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-আবাসনে থাকি, তার গায়েই সব্জি বিক্রি করতে বসেন একজন। ভিড় এড়াবার জন্য ভেবেছিলাম সেখান থেকেই যা প্রয়োজন সংগ্রহ করে নেব। কিন্তু মনোবাসনা পূর্ণ হল না। তিনি তাঁর দোকানটি খোলেননি। অগত্যা কাছের এক বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই হল। স্কুটারে যেতে যেতে দেখলাম মলিন বসনে এক বৃদ্ধ থুতু ফেললেন রাস্তায়। স্কুটার থামিয়ে তাঁকে এক ধমক লাগালাম। তিনি ভ্রুক্ষেপই করলেন না। পেশায় মাস্টারমশাই। ধমকে কাজ হল না দেখে অহং-এ ঘা লাগল। স্কুটার স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে গেলাম আবার। বাজারে ঢোকার মুখে দেখলাম চায়ের দোকানে জটলা। সেই জটলাতেও আলোচনার বিষয় করোনা। কিন্তু আলোচনা যাঁরা করছেন তাদের মধ্যে থেকেই দু’জন পর পর থুতু ফেললেন রাস্তায়। আমি আবার ধমক লাগালাম। এইবার কিন্তু পাল্টা কথা ভেসে এল আমার উদ্দেশ্যে। এক জন বললেন, “মুখে মাস্ক পরে বড়লোকেরা সব বাজার করতে বেরোচ্ছে আর আমাদের ধমকাছে। আরে অতই যদি ভয়, ঘরে থাক। থুতু ফেলবই। এমনিতেই আমরা মরে আছি, না-হয় করোনাতেই মরব।” কথাগুলো বলে একটা বিড়ি ধরিয়ে তিনি গিয়ে বসলেন তাঁর রিক্সায়, তাঁর পেশা রিক্সা চালানো। আর এক জন যিনি থুতু ফেলেছিলেন, তিনিও রিক্সা চালান। তিনি বললেন, “গতকাল থেকেই রোজগার নেই। আগামী কাল থেকে তো বাড়িতে বসে থাকা। বড়লোকদের বুকুনি শুনতে পারি না আর।”

এই বার মুখ খুললেন চায়ের দোকানের মালিক। আমি ততক্ষণে লক্ষ করেছি যে, চা বানাতে বানাতেই তিনি দু’বার কেশেছেন এবং রুমাল বা কনুই কিছু দিয়েই মুখ চাপা দেওয়ার চেষ্টাই করেননি। তিনি বললেন, “থুতু ফেলা নিয়ে কথা শোনাচ্ছে। আর পকেটে টাকা নিয়ে এসেছে বাজার করতে। টাকা থেকেও তো ছড়াচ্ছে ভাইরাস। পকেটে টাকা নিয়ে বাইরে না-বেরিয়ে থাক না ঘরে বসে।” দেখলাম রাগে গরগর করছেন তিনিও।

কথাগুলো শুনে থমকে গেলাম কিছুক্ষণ। যে-কোনও মানুষকেই তাঁর কৃতকর্মটি যে সঠিক নয়, সেটি বুঝিয়ে দিলে অধিকাংশ সময়েই তিনি তাঁর ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে রেগে ওঠেন। কিন্তু যে তিনটি উত্তর এক জন চা বিক্রেতা আর দুজন রিক্সাওয়ালার কাছ থেকে পেলাম তা কি শুধু ‘ওই ভুল করেছি কিন্তু মানব না’ মানসিকতার প্রতিফলন? অন্য এক সামাজিক সত্য কি লুকিয়ে নেই এর মধ্যে? পেশায় অধ্যাপক আমি আমার বেশভূষার কারণেই ওদের কাছে ‘বড়লোক’। এবং এই মহাসঙ্কটেও সেই শ্রেণিবিদ্বেষের প্রকাশ। আসলে এই যে লক ডাউন হয়েছে, সেই লক ডাউনে, আমরা যারা সরকারি চাকুরে, তারা কাজে না-গিয়েও মাস গেলে মাইনেটি বোধহয় পাব। কিন্তু, যাঁরা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, যারা দিন-আনি-দিন-খাইয়ের ওপর বেঁচে আছেন, তাঁরা অনেকেই ইতিমধ্যেই যা রোজগার করতেন, তার অর্ধেকও করছেন না। আমি থলে ভরতি করে বাজার করে নিয়ে এসে খাওয়া-দাওয়া সুনিশ্চিত করলাম আগামী ক’দিনের জন্য। এঁরা অনেকেই, ইচ্ছে থাকলেও, এক লপ্তে টাকার জন্যই অনেকখানি পণ্য কিনে উঠতে পারবেন না।

লক ডাউনে সারা দেশের অর্থনীতির ক্ষতি তো হবেই, এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী, কিন্তু এখনই প্রত্যক্ষ ভাবে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসবে এই মানুষগুলোর ওপরে। ওই যে থুতু ওঁরা ফেলছেন, তা কি পুরোটাই অজ্ঞানতা থেকে, না কি তার মধ্যে কোথাও মিশে রয়েছে ঘৃণা আর কষ্ট? কিন্তু উপায় কী? রাস্তায় পুলিশ নামিয়ে এদের শায়েস্তা করাই যায়। প্রথমটা আমারও তেমনটাই মনে হচ্ছিল। পরে মনে হল, সম্ভব হবে পুলিশের পক্ষে এত এত মানুষের এই বদ-অভ্যাস রোখা? প্রচার তো যথেষ্ট করা হয়েছে, তাতে তো কাজ হচ্ছে না। এবং রিক্সাওয়ালা দু’জনের কথা শুনে মনে হল যে, এর কারণ কেবলই অজ্ঞানতা নয়। বহু মানুষ যেন জেনেই বসে আছেন যে, তাঁরা অর্ধমৃত। তাই করোনাকে তাঁরা পাত্তা দিতে রাজি নন। বরং কিছু কিছু মানুষের অতি-সাবধনাতা হয়তো তাঁদের কাছে আদিখ্যেতা! কিন্তু এঁদের এই মুহূর্তে নিরস্ত না-করা গেলে লকডাউনেও বিপদ কাটবে না। মনে হচ্ছে যে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই মানুষগুলির জন্য আশ্বস্তবার্তা যদি কিছু দেওয়া যায়, যদি কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা হলে অন্তত ওঁদের ওই ‘বড়লোকদের’ ওপর রাগটুকু প্রশমিত হতে পারে। তবে এই দাওয়াইও সাময়িক। ভারতের মতো একটি দেশে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন এতই তীব্র ভাবে আজও প্রকট যে, করোনার মতো মহামারিও সেই অসাম্যকে মুছে দিতে পারেনি পুরোপুরি।

চায়ের দোকানে মালিক যে-কথাটি বলেছেন, সেটিও প্রণিধানযোগ্য। আমি নিজেই একাধিক ব্যাঙ্কের থেকে এসএমএস পেয়েছি, যতটা পারেন অনলাইন ট্রানজাকশন করুন। তা কি সম্ভব? দুই কেজি আলু কিনে এই ভাবে দাম দেওয়া যাবে? টাকা থেকে যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে এই রকম ভিডিও-ও ঘুরে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

আমাদের করণীয় কী? রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোও বেশি করে এই ধরনের মেসেজ পাঠাচ্ছে। কিন্তু সরকার স্পষ্ট নির্দেশিকা দিচ্ছে না কেন? অনলাইন ট্রানজাকশনেও কিন্তু সুবিধে পাবেন ধনী, উচ্চ-মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্ত মানুষেরা, গরিব মানুষরা ততটা পাবেন না। ইতিহাস সাক্ষী, সর্বদাই মহামারিতে বেশি প্রাণ গিয়েছে গরিব মানুষদেরই।

যাঁরা জনতা কারফিউ-এর দিন ফুটবল বা ক্রিকেট খেলেছেন, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছেন, বা থালা-ঘন্টি বাজাবার নামে জমায়েত করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু নিয়ম যাঁরা মানছেন না, তাঁরা সকলেই ফুর্তি করার জন্য বা নেহাতই অজ্ঞতা থেকে নিয়ম মানছেন না, তা নাও হতে পারে। অন্তত দু’জন রিক্সাওয়ালার কথা শুনে আমার মনে হয়েছে যে, এই নিয়ম ভাঙার পেছনে হয়তো কাজ করছে এক অদ্ভুত রাগ, ক্ষোভ। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে এই ক্ষোভ, এই রাগ প্রশমনে কিছু পদক্ষেপ নিতেই হবে।

তা না-হলে, বিপদ কিন্তু বাড়বে। কেবল লকডাউনে উদ্দেশ্য সাধিত হবে না।

Coronavirus lockdown
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy