জলাতঙ্ক হল ভাইরাস জনিত একটি রোগ। এই রোগ সাধারণত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে র‌্যাবিস ভাইরাস নামক এক ধরনের নিউরোট্রফিক ভাইরাস দিয়ে এই রোগ হয়। সাধারণত গৃহপালিত এবং বন্যপ্রানীদের এই রোগ সংক্রামিত করে। মানুষ এই সমস্ত প্রানীদের লালার সংস্পর্শে আসলে বা এই সমস্ত প্রাণীরা কামড়ালে বা আঁচড় দিলে মানুষের শরীরে এই রোগ ছড়াতে পারে। 

চিকিৎসকরা জানান, এই রোগের বিস্তার সাধারণত র‌্যাবিস দ্বারা আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড় ও লালার মাধ্যমে বিস্তার করে। র‌্যাবিস ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত প্রাণীর ভাইরাল এনসেফ্যালাইটিস হয় ফলে প্রাণীটি আক্রামণাত্মক হয় এবং অল্পতেই কামড়াতে থাকে। মানুষ সাধারণত কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে এই রোগে আক্রান্ত বেশি হয়। অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে বিড়াল, বাদুড়, ভোঁদড়, শিয়ালের কামড়েও এই রোগের সম্ভাবনা আছে। 

এই রোগ প্রতিরোধের উপায় হলো টিকা নেওয়া। চিকিৎসকরা জানান এই ভাইরাসের অনেকরকম টিকা আবিষ্কার হয়েছে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ ভ্যাকসিন বা টিকা হলো হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিন। অন্যান্য টিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পিউরিফাইড চিক  ইমব্রিও সেল ভ্যাকসিন,  ডাক ইমব্রিও সেল ভ্যাকসিন, নার্ভ টিস্যু 

ভ্যাকসিন ইত্যাদি। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে টিকা নেওয়াকে প্রি এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস এবং আক্রান্ত হওয়ার পরে টিকা নেওয়াকে পোস্ট এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বলে। কুকুর,  বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড়ালে কী করণীয়, আজকাল অধিকাংশ  মানুষই তা জানেন। এবং অবিলম্বে সেই অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য সকলেই সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল সরকারি নির্দিষ্ট মূল্যের দোকান থেকে বাইরের ওষুধের দোকানে হন্যে হয়ে পড়ে থাকতে হয় তাঁদের। সরকারি হাসপাতালে না পেলেও বাজার থেকে চড়া দামে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রতিষেধক জোগাড় করতে হয়। 

রাজ্যে বর্তমানে এই প্রতিষেধকের অভাব আছে। সরকারি হাসপাতাল গুলিতে সাধারণত জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের স্টোর কিপারের অফিস থেকে জেলা হাসপাতাল বা মহকুমা হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। স্বাস্থ্য জেলাগুলির মাধ্যমে ব্লক স্তরে ওই প্রতিষেধকগুলি সরবরাহ করা হয়। 

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, রাজ্যের অধিকাংশ স্বাস্থ্য জেলাতেই এআরভি-র জোগান নেই। জোগানের অভাবে মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য জেলার তরফে বাজার থেকে এআরভি কিনে অভাব পূরণ করতে হয়। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে .৫এমএল একটি ভাওয়েলের বর্তমান বাজার মূল্য ২৬০ টাকা। আড়াই জনকে এই ভাওয়েল দেওয়া হয়। আবার ২টো ভাওয়েল কিনলে পাঁচ জনকে এই প্রতিষেধক দেওয়া যাবে। আবার ১এম এল কিনলে পাঁচ জনকে দেওয়া হয়। এই প্রতিষেধকের বাজার মূল্য ৪০০ টাকা। রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে নিযূক্ত স্বাস্থ্য কর্মীরা এবং জেলার মুখ্য ওষুধ সরবরাহকারী স্টোরকিপার দের দাবি এআরভি চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ার জন্য বছরের অধিকাংশ সময় ঘাটতি দেখা যায়। 

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা যায় এআরভি-র জোগানে অভাব ২০১৮ সালের মার্চ মাসের পর থেকে বেশি পরিমাণে দেখা দিয়েছে। রাজ্যের অধিকাংশ হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, তাঁদের সারা মাসের চাহিদা অনুযায়ী ৫০ শতাংশ প্রতিষেধকও অনেক সময় স্বাস্থ্য দফতর থেকে পাওয়া যায় না।  রামপুরহাট স্বাস্থ্য জেলা সূত্রে জানা যায় রামপুরহাট স্বাস্থ্য জেলার অধীন রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতি মাসে এআরভি-র চাহিদা ৪০০ ইউনিট। আবার স্বাস্থ্য জেলার অধীন ৮ টি ব্লকের জন্য প্রতি ব্লকে ৫০ ইউনিট করে এআরভি দরকার। সেখানে ৫০ শতাংশও জোগান দেওয়া হয় না। 

স্বাস্থ্য কর্মীরা জানান, শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে এ আর ভি র চাহিদা বেশি থাকে। কারন ওই সময় কুকুরের কামড়ে বা আঁচড়ে জলাতঙ্ক রোগ মানুষের শরীরে সংক্রামিত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকালেও চাহিদা পূরণ করতে পারে না এআরভি উৎপাদনকারী সংস্থা। বীরভূম জেলার এক ওষুধের দোকানের মালিক জানান, প্রতিষেধক তৈরির বিষয়টা ওষুধ উৎপাদনের মতো নয়। জীবন্ত কোষ কালচার করে প্রতিষেধক উৎপাদন করতে হয়। তিনি দাবি করেন, ‘‘এই প্রক্রিয়ায় টেকনিক্যাল কিছু ত্রুটি আছে বলে শুনেছি। ফলে বড় প্রতিষেধক উৎপাদনকারী সংস্থা উৎপাদন করতে পারছে না।’’ 

বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগে প্রতিষেধকগুলির দাম গড়ে ৫০০ টাকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করায় এআরভি-র দাম কমেছে। ফলে উৎপাদনকারী সংস্থার লাভও কমেছে। আবার একটি সূত্রে জানা গিয়েছে এ আর ভি উৎপাদনকারী উপকরন ঘোড়ার সিরামের অভাবে এই প্রতিষেধক তৈরি করতে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য দফতর থেকে জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেও প্রতিষেধক না পেয়ে অনেকেই এই রোগের শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ রোগীকে কলকাতাতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল বা কলকাতা থেকে দূরের রোগীদের চিকিৎসার জন্য হয়রান হতে হচ্ছে। অধিকাংশ রোগীদের দাবি কুকুরে কামড়ানো বা আঁচড়ানোর পর নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিষেধকের জোগান থাকা দরকার। এর অভাবের ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।