রায়ান এখন সাত বৎসরের শিশু, ২০১৫ সালের মার্চ মাস হইতে সে ইউটিউব-এ বিভিন্ন খেলেনা রিভিউ শুরু করে। রিভিউ বলিতে, খেলেনাটিকে বাক্স হইতে বাহির করা, তাহা কী ভাবে খেলিতে হয় তাহা মা-বাবার সাহায্যে শিখিয়া লওয়া, তাহার পর তাহা লইয়া প্রবল খেলা ও উল্লাস। ইহা সমগ্র পৃথিবীর শিশুদের নিকট এমন অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা লাভ করে, রায়ান হইয়া উঠে ইউটিউবের বিশাল নক্ষত্র। তাহার রিভিউ দেখিয়া শিশুরা নির্দিষ্ট খেলেনা কিনিতে আরম্ভ করে, তাহার একটি ভিডিয়ো পায় ১.৫ বিলিয়ন ভিউ, যাহা ইউটিউবের ইতিহাসে অত্যুচ্চসংখ্যক। তাহার মা কেমিস্ট্রির শিক্ষয়িত্রী ছিলেন, তিনি চাকুরি ছাড়িয়া সম্পূর্ণ সময় সন্তানের ইউটিউব চ্যানেলে ঢালিয়া দেন। এখনও অবধি রায়ান পাইয়াছে প্রায় ২৪ বিলিয়নেরও অধিক ভিউ। ফোর্বস পত্রিকা অনুযায়ী, ইউটিউব চ্যানেলের মধ্যে সর্বাধিক অর্থোপার্জক উদ্যোগপতিদের তালিকায় রায়ান অষ্টম। এই বার, সেই শিশু নিজেই হইল খেলেনা। বিভিন্ন খেলেনায় তাহার ছবি দেওয়া হইতেছে, যাহাতে তাহা দেখিয়া শিশুরা সেই খেলেনা কিনিতে উৎসাহী হয়, কিন্তু অধিক আকর্ষক সংবাদ: বিক্রয় হইতেছে রায়ান-পুতুল। প্রিয় বান্ধব রায়ানকেই বিভিন্ন মূর্তিতে বাড়ি লইয়া যাইবে শিশুরা। বিখ্যাত মানুষদের পুতুল গড়িয়া বিক্রয়ের চল বহু দিনই রহিয়াছে, শান্তিনিকেতন যাইলে সহস্র দোকানে রবীন্দ্রনাথ-পুতুল মিলিবে, কিন্তু বাস্তব শিশু-পুতুল? 

শার্লি ম্যাকলিন হলিউডে শিশু-নায়িকা হিসাবে প্রবল খ্যাত হন ১৯৩০-এর দশকে। মাত্র তিন বৎসর বয়সে, ১৯৩২ সালে, তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। দুই বৎসর পরেই, ‘ব্রাইট আইজ়’ ছবি তাঁহাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি আনিয়া দেয়। ১৯৩৫ সালে তিনি বিশেষ ‘জুভেনাইল অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ১৯৩৪ হইতে শার্লি-পুতুল উন্মত্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে, লক্ষ লক্ষ পুতুল বিক্রয় হয়, আজও হইতেছে। লেডি ডায়ানার পুতুল জনপ্রিয়, কিন্তু অতি অদ্ভুত ভাবে, শুরু হইয়াছে ডায়ানার শিশুরূপী-পুতুল বিক্রয়। শিশু-ডায়ানা পরিয়া আছে, প্রাপ্তবয়স্ক ডায়ানা যে পোশাকগুলিকে বিখ্যাত করিয়াছিলেন, সেইগুলির ক্ষুদ্র সংস্করণ। শিশু-ওবামা পুতুলও তৈয়ারি হইয়াছে, তাহার টি-শার্টে লিখা: ‘ওবামা’, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার চিত্রের নিম্নে: ‘দ্য বার্থ অব হোপ, জানুয়ারি ২০, ২০০৯’। যেন, টাইম মেশিনে চড়িয়া শিশু ওবামা অকস্মাৎ প্রাপ্তবয়স্ক ওবামার রাষ্ট্রপতি হইবার সময়ে উপস্থিত হইয়াছে। 

রায়ান খেলেনা রিভিউ করিতে গিয়া নিজেই খেলেনা হইয়াছে, ইহার কাহারও প্রতীকী মনে হইতে পারে। একটি শিশু খেলেনা লইয়া নিজমনে মহানন্দে খেলা করিবে, ইহা প্রত্যাশিত। ক্যামেরার সম্মুখে খেলেনা-সংস্থার ঠিক করিয়া দেওয়া খেলেনা লইয়া খেলিয়া তাহাকে প্রতি বার পর্যাপ্ত আনন্দ প্রদর্শন করিতে হইবে ও ক্রমাগত ধনী হইয়া উঠিতে হইবে, তাহার ক্রীড়ার মধ্যে প্রবল অভিনয় বাধ্যতামূলক ভাবে ঢুকিয়া পড়িবে, ইহা তাহার শৈশবকে বিকৃত করিয়া তুলিতেছে না কি? একটি শিশুর খেলাকে বাণিজ্যায়িত করিলে তাহার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না কি? রায়ান শেষে এক শিশুশ্রমিক, বা বলা ভাল, এই বাজারসর্বস্ব যুগ ও অভিভাবকদের লোভের ক্রীড়নক হইয়া যায় নাই তো? মাত্র সাত বৎসর বয়সেই যে বিশ্বময় পরিচিত, সে আর কয়েক বৎসর পরে যখন শিশু থাকিবে না, কেমন করিয়া খ্যাতিহীন জীবন কাটাইবে, সে প্রশ্নও স্বাভাবিক। মনে রাখিতে হইবে, রায়ান কোনও একটি কাজ করিবার প্রতিভা প্রদর্শন করে না, সে গান গায় না বা অভিনয় করে না, কেবল খেলেনা লইয়া খেলে। এই যুগে ইহাতেই বিখ্যাত হওয়া যায়, কিন্তু ঝলমলে শিশু শ্মশ্রুময় যুবক হইলে তো আর খেলেনা ছড়াইয়া বসিতে পারিবে না। শার্লি টেম্পলের কালে চলচ্চিত্রের পর্দা কেবল নিজ সময়ে আবদ্ধ থাকিত না, বহু মানুষের স্মৃতিতে খচিত থাকিত। এখন যে ইউটিউব-দর্শক শিশুরা রায়ান বলিতে পাগল, তাহারা প্রতিনিয়ত অযুতনিযুত বিনোদন-উপকরণ পাইয়া কিশোরবয়সে রায়ানকে মনে রাখিবে? রায়ানের মাতা বলিয়াছেন, সে তখন হয়তো ভিডিয়ো গেম লইয়া ভাবিবে। পিতা বলিয়াছেন, রায়ান নিজেই পরামর্শ দিয়াছে, হুবহু তাহার ন্যায় দেখিতে একটি ‘শয়তান’ রায়ান-পুতুল নির্মাণ করিয়া বিক্রয় করিতে। রায়ানের এই রূপ মৌলিক চিন্তা নাকি পিতাকে মুগ্ধ করিয়াছে। আশা করা যাউক, এই প্রকার ‘মৌলিকতা’র কদর ক্রমে বাড়িবে!

যৎকিঞ্চিৎ

মেট্রোয় দমঠাস ভিড়, লোকে দু’স্টেশন পেরিয়ে গিয়ে নামতে পাচ্ছে, দেখে বনগাঁ লোকাল মুচকি হাসছে। বড়লোক গাড়িতে গম্ভীর মুখে ফোন চেক করছেন, ঘণ্টা দেড় পরে মুখ তুলে দেখেন গাড়ি এক চাকাও এগোয়নি। অটো যা খুশি ভাড়া হাঁকছে, অ্যাপ ক্যাব গলা কাটছে। একে ব্রিজ ভেঙেছে, তায় পুজোর শপিং, গোটা কলকাতায় নড়নচড়ন বন্ধ। এর মধ্যে যদি দু’চারটে রগরগে সমাজ-সচেতন অবরোধ লাগিয়ে দেওয়া যায়, দেখতে হবে না। মা দুর্গা পৌঁছবেন কি না, সন্দেহ।