Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৫ জুন ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

আর, কালো গাউনের সম্মান?

কলকাতা হাই কোর্টে পর পর কয়েকটি ঘটনায় দলীয় রাজনীতির সংঘাতের যে প্রকাশ ঘটল, তা আইনজীবীদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।

একরামুল বারি
২৫ মে ২০২২ ০৫:২২
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

কলকাতা হাই কোর্টে পর পর কয়েকটি ঘটনায় দলীয় রাজনীতির সংঘাতের যে প্রকাশ ঘটল, তা আইনজীবীদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী পি চিদম্বরম একটি ডেয়ারি কোম্পানির পক্ষে সওয়াল করতে এসেছিলেন। ওই সংস্থা তথা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরী। রাজ্য সরকারের অধীন মেট্রো ডেয়ারি হস্তান্তরে দুর্নীতি হয়েছে, এই অভিযোগে অধীরবাবু তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকার ও অধিগ্রহণকারী ডেয়ারি সংস্থা কেভেন্টার্সের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন। কংগ্রেস এই বিষয়ের মধ্যে কোনও ভাবেই জড়িত ছিল না। তা সত্ত্বেও কিছু আইনজীবী প্রকাশ্য আদালতে চিদম্বরমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখালেন। চিদম্বরম কংগ্রেসের বরিষ্ঠ নেতা হয়েও অধীরবাবুর বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের পক্ষে মামলা লড়ছেন কেন, এই তাঁদের ক্ষোভ।

এই ঘটনায় কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবীদের মর্যাদা অন্যান্য রাজ্যের কাছে ক্ষুণ্ণ হল না কি? বিশেষত আইনজীবীরা যে ভাবে নিজেদের গাউন খুলে সেগুলিকে ঝান্ডার মতো ব্যবহার করলেন, তা মেনে নেওয়া কঠিন। মক্কেলকে আইনি সহায়তা দেওয়াই আইনজীবীর প্রধান কাজ। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের মন্ত্রী, সাংসদ বা বিধায়ক হলেও, পেশার ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কখনওই বড় হয়ে উঠতে পারে না। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব তৃণমূল-পরিচালিত রাজ্য সরকারের সপক্ষে মামলা করতে নিষেধ করেনি চিদম্বরমকে। তা হলে তাঁর দোষ কোথায়? কেনই বা কোনও একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী আইনজীবী অন্য আদর্শের অনুগামী ব্যক্তি, বা সংস্থা, বা নির্বাচিত সরকারের হয়ে মামলা করতে পারেন না? কলকাতা হাই কোর্টে রোজই দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাংসদ বা সমর্থক হয়েও সেই দলের বাইরে অন্য মতাদর্শের মক্কেলের স্বার্থে মামলা লড়ে যাচ্ছেন। আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার কথা হাই কোর্টের আইনজীবীদের অজানা তো নয়।

একই প্রশ্ন আরও তীব্র ভাবে উঠে এল বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিছু আইনজীবীর আচরণে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগে দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় ডিভিশন বেঞ্চের সঙ্গে তাঁর সিঙ্গল বেঞ্চের মতানৈক্যের প্রতি বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাতে ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে এ রাজ্যের শাসক দলের অনুগামী আইনজীবীরা। এজলাস বয়কটের সিদ্ধান্তে মতবিরোধের জেরে বার অ্যাসোসিয়েশনের সভায় নজিরবিহীন ভাবে ধ্বস্তাধ্বস্তি হল আইনজীবীদের মধ্যে। এজলাসের বাইরে ঘেরাও করে বিক্ষোভরত আইনজীবীরা এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করলেন যে, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় বলতে বাধ্য হলেন, “মাথায় বন্দুক ধরতে পারেন।... কিন্তু দুর্নীতি দেখলে চুপ করে থাকব না। আওয়াজ তুলবই।” এই ঘটনায় এ রাজ্যের আইনজীবীদের ভাবমূর্তির মস্ত ক্ষতি হয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা ফোন করে বলেছেন, “এঁদের মাধ্যমেই কি আমরা বিচার চাইতে যাব?”

Advertisement

আইনজীবীরা বার বার আদালত চত্বরে দলীয় রাজনীতির সংঘর্ষকে টেনে আনছেন। দুর্ভাগ্য, গত ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির পাটিয়ালা হাউসে রাজদ্রোহে অভিযুক্ত ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারকে আনা হলে বেশ কিছু আইনজীবী তাঁর সঙ্গে আগত সহপাঠী, শিক্ষক, ও কর্মরত সাংবাদিকদের উপর চড়াও হন। তাঁদের কিল-চড়-ঘুষিতে আহত হন সাত জন সাংবাদিক, বেশ কিছু ছাত্র ও শিক্ষক। ওই আইনজীবীরা ‘ভারতমাতা কি জয়’, ‘জেএনইউ মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিতে থাকেন আদালতের মধ্যেই।

আইনজীবীদের পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং আচরণ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে (ওপি শর্মা বনাম পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট, ২০১১) মন্তব্য করেছিল, আইনজীবীরা সমাজের অভিজাত বুদ্ধিজীবী। তাঁরা সমাজকর্মী। আর একটি মামলায় (আর ডি সাক্সেনা বনাম বলরামপ্রসাদ শর্মা, ২০০৭) সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে, আইনজীবীদের সামাজিক দায়িত্ব মানুষকে আলোর পথ দেখানোর, তাঁদের আচরণ ও কর্মের দ্বারা। আইনজীবী সহকর্মীর প্রতি এবং বিচারপ্রার্থীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করবেন।

এই পেশাকে কত উচ্চ আসনে বসিয়ে গিয়েছেন অতীতের রাজনীতিক-আইনজীবীরা। ভারতীয় রাজনীতিতে তখন বালগঙ্গাধর তিলক ছিলেন চরমপন্থী, মহম্মদ আলি জিন্না মধ্যপন্থী। দু’জনের তীব্র বিতর্ক চলছে। ১৯০৯ সালে তিলক জেলে গেলেন, তাঁর মুক্তির জন্য আদালতে সওয়াল করার জন্য তিনি মনোনীত করলেন জিন্নাকে। ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের পক্ষে মামলা লড়েছেন তিনি— যাঁকে আজকাল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর চরম বিরোধী হিসেবে প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা হচ্ছে, সেই জওহরলাল নেহরু। সর্দার বল্লভভাই পটেল গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় যখন সওয়াল করছিলেন, সেই সময়ে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ আসে তাঁর কাছে। সেই টেলিগ্রাম পকেটে পুরে, সওয়াল শেষ করে তবে আদালত ছেড়েছিলেন পটেল।

পেশাগত দায়বদ্ধতা ভুলে গেলে কি চলে?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement