Advertisement
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বাংলার চিত্রশিল্পীদের তুলি ও কল্পনায় দুর্গার নানা রূপ
Art

চিত্রশিল্পের ঘরের মেয়ে

১৯৩৮ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জলরঙে আঁকলেন দুর্গা। সেই দুর্গার চার পাশে আমরা দেখি সিংহিনি, বাঘিনি, হস্তিনী আর হরিণীকে। এঁরা সবাই মানুষরূপী।

বহুরূপেণ: নন্দলাল বসু, যামিনী রায় ও শানু লাহিড়ীর আঁকা দুর্গার ছবি।

বহুরূপেণ: নন্দলাল বসু, যামিনী রায় ও শানু লাহিড়ীর আঁকা দুর্গার ছবি।

শুভব্রত নন্দী
শেষ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৩ ০৫:০৫
Share: Save:

কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কো-র আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতেই, অর্থনীতিতে যে দুর্গাপুজোর প্রভাব বাড়বে তা আগাম আঁচ করা গিয়েছিল। দশ বছর আগে সারা কলকাতার দুর্গাপুজোর বাজেট ছিল আনুমানিক ২৫,০০০ কোটি টাকার, ২০১৯-এ তা হয় ৩২,০০০ কোটি; আর ইউনেস্কো-র তকমা পাওয়ার পরে গত বছর পৌঁছয় ৫০,০০০ কোটিতে। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬০,০০০ কোটি। বছর বছর লাফিয়ে বাজেটের বৃদ্ধি দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এঁদের অনেকেরই সারা বছরের উপার্জন আসে এই পুজোর কাজ করে। এঁদেরই গড়া থিমের চমক, প্রতিমার বৈচিত্র, আলোর খেলা দেখতে লক্ষ মানুষ ভিড় করেন, মণ্ডপে মণ্ডপে জনস্রোত দেখে পুজো উদ্যোক্তা, শিল্পী থেকে বিজ্ঞাপনদাতা ও প্রচারমাধ্যম যারপরনাই পুলকিত হয়। যে মানের শিল্পকীর্তি এই পুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় তা বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশের শিল্পী ও শিল্পবেত্তাদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আক্ষেপের বিষয়, এই সমস্ত শিল্পকীর্তির গুণগান শেষ হয়ে যায় পুজো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। অপেক্ষা— পরের বছরের নতুনতর চমকের।

এই নব ও অভিনব শিল্পকীর্তি যেমন এক অর্থে ‘ঐতিহ্য’-এরই সংযোজন ও সম্প্রসারণ, তেমনই এও ভাবার, নতুন নতুন চমকের আড়ালে দুর্গা ও দুর্গাপুজো ঘিরে আমাদের ধ্রুপদী ঐতিহ্য বিস্মরণে চলে যাচ্ছে না তো? থিম-পুজোর প্রাবল্যে মণ্ডপে মণ্ডপে কতশত প্রতিমা দেখে আমরা আহ্লাদিত হলাম সম্প্রতি, সমাজমাধ্যম ছবিতে ভরিয়ে দেওয়া এই শিল্পপ্রেমী আধুনিক বাঙালিকেই যদি জিজ্ঞেস করা যায় উনিশ শতকের শেষ দিকে তেলরঙে আঁকা রাজা রবি বর্মার দুর্গার কথা— বা বিশ শতকের গোড়ায় করা সেই বিখ্যাত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ লিথোগ্রাফ, মুম্বইয়ে ওঁরই প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য রবি বর্মা ফাইন আর্ট লিথোগ্রাফিক প্রেস’ থেকে করা যা— কেউ কি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবেন সে প্রসঙ্গে?

১৯৩৮ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জলরঙে আঁকলেন দুর্গা। সেই দুর্গার চার পাশে আমরা দেখি সিংহিনি, বাঘিনি, হস্তিনী আর হরিণীকে। এঁরা সবাই মানুষরূপী। এই বিচিত্র সংমিশ্রণে ছবিটি এক অন্য রূপে ধরা দিয়েছে। এই চিত্রলিপি অনুসরণ করে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হলে তার শিল্পরূপও হত অনন্য। ১৯১৫ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অস্বচ্ছ জলরঙে আঁকা বিসর্জন-ও চমকপ্রদ এক ছবি। বঙ্গসমাজে এ ছবি ইতিহাস তৈরি করেছে, বহু শিল্পপ্রেমীর ঘরের দেওয়ালে তার প্রতিলিপি বিদ্যমান। পরবর্তী কালে আমাদের মুগ্ধ করেছে নন্দলাল বসুর নানা ভঙ্গিতে আঁকা দুর্গা। তার মধ্যে ১৯৪৪ সালে গ্রাফাইট ও গুয়াশ পদ্ধতিতে কাগজে আঁকা, বেশ বড় মাপের (৪৬/৩০ ইঞ্চি) ড্রয়িংটি অনবদ্য। ঠাসবুনট রেখার কারিকুরিতে দুর্গার সংহারমূর্তি ও প্রসন্নতা, এই দুই ভাবেরই সহাবস্থান বিস্ময়কর। যামিনী রায়ের সঙ্গে বাঙালিরও রয়েছে এক আশ্চর্য সহাবস্থান: সাদামাটা বাঙালি থেকে শিল্পরসিক, ড্রয়িং রুম থেকে আর্ট গালারি, যামিনী রায় একাকার হয়ে আছেন আমাদের সঙ্গে। সম্ভবত তিনিই একমাত্র শিল্পী, যাঁর ছবি দেখে সমগ্র জনসাধারণের একটি বড় অংশ ‘এ তো যামিনী রায়ের আঁকা!’ বলে উচ্ছ্বসিত হন। এই শিল্পীও আমাদের উপহার দিয়েছেন তাঁর চিরাচরিত ঘরানায় আঁকা নানা রকম দুর্গা।

আরও এক জন বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীর কথা না বললেই নয়। তিনি রাধাচরণ বাগচি (১৯১০-১৯৭৭)। নব্যবঙ্গীয় ঘরানার সঙ্গে প্রচলিত ইউরোপীয় ঘরানার সংমিশ্রণ তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য। তাঁর দুর্গাপূজা ছবিটি ভিন্ন ভাবে ভাবা। গুয়াশ পদ্ধতিতে, বোর্ডের উপর আঁকা ছবিতে দেবীমূর্তির সঙ্গে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন উৎসবকেও, সেখানে সমাজের উচ্চ ও নিম্নবর্ণের মানুষ এক সঙ্গে উৎসবে মেতেছেন। শিল্পী গোবর্ধন আশের (১৯০৭-১৯৯৬) আঁকা যে দুর্গা দেখতে পাই আজ থেকে পঁচাশি বছর আগে বঙ্গশ্রী পত্রিকার আশ্বিন ১৩৪৫ (১৯৩৮) সংখ্যায়, তা কিছুটা ভারতীয় চিত্ররীতির ধরনে আঁকা। শিল্পী যে বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহারেই অসামান্য দক্ষ ছিলেন, এ ছবি তার সাক্ষ্য বহন করে।

পরবর্তী সময় শিল্পী নীরদ মজুমদার তাঁর নিজস্ব ঘরানায় দুর্গা এঁকেছেন। সমসাময়িক শিল্পী পরিতোষ সেন তাঁর ছবিতে দেখিয়েছেন দুর্গাপুজো-শেষের এক বিশেষ রীতি— লালপাড় শাড়ি-পরা এক সধবা নারী মা দুর্গাকে সিঁদুর পরাচ্ছেন। ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ কলকাতার একটি পুজোয় দুর্গা সম্ভবত প্রথম বার কোনও চিত্রশিল্পীর কল্পনায় মূর্ত হন। শিল্পী নীরদ মজুমদারের তুলি প্রাণ পায় প্রতিমা রূপে। সেই শুরু। তার পর একে একে ১৯৭৬ সালে রথীন মিত্র, ১৯৭৭ সালে পরিতোষ সেনের কল্পনার দুর্গাচিত্র রূপান্তরিত হল মূর্তিতে। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েক জন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী তাঁদের কল্পনায় দুর্গা গড়েছেন। শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজস্ব অননুকরণীয় রীতিতে দুর্গা এঁকেছেন, এবং তাঁর মতো করে দুর্গা গড়েছেন পুজোয়।

আর এক প্রথিতযশা শিল্পী ঈশা মহম্মদের নামও এ ক্ষেত্রে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি ছিলেন রিয়্যালিজ়ম বা বাস্তববাদী ঘরানার শিল্পী। ১৯৯২ সালে তিনি যখন সেই আঙ্গিক বা ঘরানার সঙ্গে তাঁর নিজস্ব কল্পনা মিশিয়ে দুর্গা গড়েন, তা শুধু দুর্গাপ্রতিমায় আবদ্ধ না থেকে উত্তীর্ণ হয়েছিল এক অনন্য শিল্পকর্মে। এখানে দেবী অসুর, সিংহ, অতিনাটকীয়তা বর্জিত। দেবীর মুখে ঘরের মেয়ে উমার মুখের আদল। পিছনে চালচিত্রের বদলে ক্যানভাসে শিল্পী নিজস্ব ধারায় এঁকেছিলেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। আর মহাদেব প্রতিস্থাপিত ক্যানভাসের ডান দিকে, একটু উপরে। সম্পূর্ণ বাহুল্যবর্জিত এক শিল্পকর্ম, যাকে দুর্গামূর্তি না বলে অনায়াসে দুর্গাচিত্রও বলা যায়।

বাঙালির দুর্গাপুজোয় স্বমহিমায় উপস্থিত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনও। এঁকেছেন বিভিন্ন ধরনের দুর্গারূপ। ক্যানভাসে বলিষ্ঠ গতিশীল রেখার ব্যবহার, তুলির টানে পুরু রঙের প্রয়োগ এবং সর্বোপরি ছবির বিন্যাস-বৈচিত্র হুসেনের দুর্গাচিত্রকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। কলাভবনে থাকাকালীন কে জি সুব্রহ্মণ্যন— সবার প্রিয় ‘মানিদা’— সব শিক্ষক সহকর্মীকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতেন হাতে আঁকা কার্ড দিয়ে। এই কার্ডে বেশির ভাগ সময়ে তিনি দেবীপ্রতিমার ছবি এঁকে দিতেন। এই ছবির দুর্গা কোথাও দশভুজা, কখনও চতুর্ভুজা বা অষ্টভুজা। কখনও দেবীর হাতে অস্ত্রের বদলে থাকত ফুলের সমাহার। সেই সব চিত্রিত কার্ডও বাঙালির দুর্গাচিত্রের ইতিহাসের আশ্চর্য দলিল।

শানু লাহিড়ী, গণেশ পাইন, প্রকাশ কর্মকার, শক্তি বর্মন, যোগেন চৌধুরীর কল্পনায় দেবী দুর্গার নানা রূপচিত্র আমরা দেখেছি। প্রতিটি চিত্রই এক-একটি বিশেষ ধারা বহন করে। শানু লাহিড়ীর দুর্গাচিত্রে আমরা খুঁজে পাই সারল্য, গণেশ পাইনের দুর্গা রসবেত্তাকে নিয়ে যায় এক নৈঃশব্দ্যের জগতে, প্রকাশ কর্মকারের দুর্গায় দেখি এক আদিম কৌতুক। শক্তি বর্মন দুর্গা আঁকেন তাঁর একান্ত নিজস্ব এক পৌরাণিক অভিব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে, আবার যোগেন চৌধুরীর সংবেদনশীল রেখায় দুর্গা ধরা পড়ে যুগপৎ সংহারক অথচ হৃদয়স্পর্শী রূপে।

দুর্গাচিত্রের কথা বলতে গেলে অনিবার্য ভাবেই চলে আসেন বিকাশ ভট্টাচার্য। যিনি একটি গোটা সিরিজ় বা চিত্রমালা এঁকেছিলেন দুর্গা নিয়ে। তেলরঙে আঁকা সে সব ছবি দেখেননি এমন শিল্পরসিক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তেমনই এক ছবিতে আমরা দেখি দুর্গাপ্রতিমার সামনে দর্শনার্থীদের ভিড়, তার মাঝে এক নারীর ফিরে-দেখা মুখ। সে চাহনির মধ্যে আছে একাকিত্ব, আছে উৎসবের আনন্দ নিয়ে আকুল জিজ্ঞাসা, আর সব ছাপিয়ে অদম্য এক আকর্ষণ। বেশ কিছু বছর আগে চোখে পড়েছিল শারদীয় দেশ পত্রিকার একটি প্রচ্ছদ, শিল্পী ছিলেন চিত্রভানু মজুমদার। সম্ভবত তখন কলেজে পড়ি, এত বছর পরেও সেই দুর্গাচিত্রের রেশ স্মৃতিতে উজ্জ্বল অক্ষয় হয়ে আছে। ক্যানভাসের উপরে সে ছিল যেন এক বিস্ফোরণ। সদ্য কৈশোর থেকে যৌবনে প্রবেশের পথে, সেই সময়ে সেই ছবি আমাদের সকলের কাছে হয়ে উঠেছিল শিক্ষণীয়।

বাঙালির চিরাচরিত দুর্গাপুজো আজ সর্বজনীন দুর্গোৎসবের দিগন্ত ছাড়িয়ে বিশ্বের নজর টেনে নিয়েছে তার উৎসবময়তা আর শিল্পসৌষ্ঠবে। খোলনলচে বদলে-যাওয়া এই দুর্গোৎসবের হৃদয় খুঁড়ে পুরনো অথচ চিরকালীন চিত্রশিল্পের ‘ঐতিহ্য’কেও ফিরে দেখা দরকার, নতুনের যাত্রাপথকেই তা সমৃদ্ধ করবে আরও।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE