Advertisement
০১ ডিসেম্বর ২০২২
যাকে ভরসা, তাকে ভোট
Congress

জাতের ঊর্ধ্বে রাজনীতিকে তুলছে গ্রাম-মফস্সলের মেয়েরাই

তাত্ত্বিকেরা সে সময় এই ধারাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়নের রাজনীতির ধারণা এনেছিলেন।

অশোক সরকার
শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২২ ০৮:২৪
Share: Save:

আশির দশক থেকেই ভারতের রাজ্য রাজনীতিতে একটি পরস্পরবিরোধী ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে। তার একটি হল, বেশ কিছু রাজ্যে ওই সময় থেকে প্রায় নিয়মমাফিক প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তৎকালীন মুখ্য বিরোধী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসছে। প্রথম নজরে পড়েছিল কেরল ও তামিলনাড়ু। কেরলে কে করুণাকরন, ই কে নাইনার, এ কে অ্যান্টনি, ভি এস অচ্যুতানন্দন, উমেন চান্ডি ও পিনারাই বিজয়নের হাত ধরে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কংগ্রেস ও বাম শক্তির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। একই ভাবে তামিলনাড়ুতে এম জি আর, করুণানিধি, জয়ললিতা, পনিরসেলভম, এম কে স্ট্যালিন, ও পালানিস্বামীর হাত ধরে ডিএমকে ও এডিএমকে-র মধ্যে ক্রমাগত পালাবদল হয়েছে। মাঝে এক-দু’বার একটু ব্যতিক্রম ঘটলেও পরিবর্তনের ওই ধারায় তেমন বড় রকমের কোনও ছেদ এখনও দেখা যায়নি।

Advertisement

তাত্ত্বিকেরা সে সময় এই ধারাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়নের রাজনীতির ধারণা এনেছিলেন। মুখ্য রাজনৈতিক দলগুলি যখন তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর সরকারি কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন সাধারণ মানুষ দুই দলকেই সমান সুযোগ দেয়, এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলিতে কোনও ছেদ পড়ে না। এই তত্ত্বকে সমর্থন করে কেরলে দু’টি বড় উদাহরণ দেওয়া যায়। এক কেরলের ‘পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেন’ যা এক ধাক্কায় সারা রাজ্যে সুস্পষ্ট ভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করেছিল। আর দ্বিতীয়, সে রাজ্যের মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী নির্মাণ, বা ‘কুডুম্বশ্রী’ কর্মসূচি, যা সমস্ত রাজ্য জুড়ে মহিলা ক্ষমতায়নের কাজ করেছিল। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও এই দুই কর্মসূচিতে বিশেষ কোনও ছেদ পড়েনি। তামিলনাড়ুতেও তাই— শাসক দলে নিয়মিত পরিবর্তন ঘটলেও জনকল্যাণমুখী সরকারি কর্মসূচিগুলিতে কোনও ছেদ দেখা যায়নি, বরং দু’টি দলই এ ব্যাপারে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কৃষি, শিল্পনীতি ও শিক্ষানীতিতেও কোনও ছেদ পড়েনি।

নব্বইয়ের দশকে এসে পাঁচ বছর অন্তর নিয়মিত ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনি আরও কিছু রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, অসম, পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচলেও ছবিটা একই চেহারা নেয়। রাজস্থানে কংগ্রেস-বিজেপি, পঞ্জাবে অকালি-কংগ্রেস, উত্তরপ্রদেশে এসপি–বিএসপি–বিজেপি, অন্ধ্রে তেলুগু দেশম–কংগ্রেস–ওয়াইএসআর। তালিকা না বাড়িয়ে বলা যায়, পাঁচ বছর অন্তর রাজনৈতিক পালাবদল এ সব রাজ্যে ‘রুটিন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রাজ্যের জনকল্যাণ ও উন্নয়ন কি কেরল-তামিলনাড়ুর পথে এগিয়েছে? এনটি রামা রাও আর চন্দ্রবাবু নাইডু মহিলা ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জনকল্যাণের পথ ধরেছিলেন। রামা রাও-র আমলে আরক-বিরোধী মহিলা আন্দোলনে যার শুরু, চন্দ্রবাবুর হাতে ‘জন্মভূমি’ কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে তার প্রসার হয়ে কেরলের কুডুম্বশ্রীর মতোই সারা রাজ্যে মহিলা ক্ষমতায়নের ঢেউ ছড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জনার্দন রেড্ডি, বা ওয়াইএসআর সেই পথ ধরেননি, কেসিআর-ও নয়। রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, অসম, পঞ্জাবেও পালাবদলের পিছনে প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়নের রাজনীতির তত্ত্ব বেশি দূর এগোয় না। অর্থাৎ রাজনীতির ধারাটি দেখতে এক রকম হলেও, আসলে তার চরিত্র এক নয়। এই সব রাজ্যে যা ঘটেছে তাকে জাতি-সমীকরণের পালাবদল বলা যেতে পারে।

জাতি-সমীকরণের পালাবদলের মূলে আছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার এবং (সংরক্ষণ-সমেত) বিবিধ সরকারি সহায়তার স্বাদ কে বেশি পাচ্ছে, কে পাচ্ছে কম, তার উপর। কোন শাসনে জাঠ, গুজ্জর, যাদব, রাজপুত, জাঠভ, কুর্মী, পাসোয়ান, রবিদাসিয়া, ইত্যাদি বড় সংখ্যার জাতিরা কতটা লাভবান হচ্ছে বা হচ্ছে না, সেই আশা-নিরাশা থেকে সমীকরণ বদলাচ্ছে।

Advertisement

কিন্তু গত তিন-চার দশকে একটি বিপরীত ধারাও দেখা যাচ্ছে— কিছু রাজ্যে একটি সরকার ১৫ বছর থেকে ২০ বছরও রাজত্ব করছে। ছত্তীসগঢ়ে বিজেপি, ওড়িশায় বিজেডি, বাংলায় প্রথমে বামফ্রন্ট ও পরে তৃণমূল, গুজরাতে এবং মধ্যপ্রদেশে বিজেপি, বিহারে প্রথমে লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি ও পরে নীতীশ কুমারের জেডিইউ। অর্থাৎ, এই সব রাজ্যে শাসকবিরোধী (অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি) মনোভাব তৈরি হতে অনেক বেশি সময় লাগছে। রাজ্য রাজনীতির এই ধাঁধা নিয়ে খুব বেশি চর্চা হয় না। বাংলা ও ওড়িশায় জাতি-সমীকরণ হয়তো নেই, কিন্তু বাকি রাজ্যগুলিতে দিব্যি আছে। জাতি-সমীকরণকে অতিক্রম করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে গেলে আরও কিছু লাগে। সেটা কী হতে পারে?

রমণ সিংহ তার উত্তরে দাবি করবেন, ছত্তীসগঢ়ের রেশন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, ও আইন শৃঙ্খলার উন্নতি। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলবেন বিবিধ জনকল্যাণ কর্মসূচি এবং সহায়তা প্রকল্পের বিস্তার, নবীন বলবেন ওড়িশার গরিমা, তার সঙ্গে জনকল্যাণ প্রকল্প, দুর্যোগ মোকাবিলার বিশ্ব-প্রশংসিত ব্যবস্থা। নীতীশ কুমার বলবেন আইনশৃঙ্খলা, পরিকাঠামো ও জনকল্যাণ। গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলবেন, গুজরাত মডেল। কথাগুলির মধ্যে কিছু সত্যি আছে। তবে একটু তলিয়ে দেখলে একটা কি দুটো কৌশল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে এমন কোনওটি নেই যা প্রায় সব দিকে কর্ম-কুশলতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে। উন্নয়নের সূচক বলে, বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, পশ্চিমবঙ্গ গত ১৫-২০ বছরে সামগ্রিক ভাবে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো কিছু এগোয়নি। কিন্তু বিহারে আইনশৃঙ্খলা আগের চেয়ে অনেকটা ভাল হয়েছে, মফস্সল শহরে, গ্রামে-গঞ্জে রাস্তা ভাল হয়েছে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বেড়েছে। ছত্তীসগঢ়ে রেশন ব্যবস্থার সংস্কারের ফলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়েছে, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামো অনেকটা ভাল হয়েছে, কয়েকটি জনকল্যাণ কর্মসূচি জনপ্রিয় হয়েছে। ওড়িশায় রেশন ব্যবস্থা অনেকটা উন্নত হয়েছে, সাইক্লোন-প্রবণ বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা, ত্রাণ, উদ্ধার ব্যবস্থা অনেকটাই এগিয়েছে। এর প্রত্যেকটিকে জনমানসে এবং পরিসংখ্যানের অঙ্কে মাপা যায়।

এটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসছে যে, কোনও সরকার যদি এমন একটা কি দুটো জরুরি বিষয়, যেগুলিতে অল্প সময়ে অনেকটা উন্নতি করা যায়, সেগুলি বেছে নিয়ে সুষ্ঠু ভাবে করে ফেলতে পারে, তা হলে কয়েকটা নির্বাচন পার করে দেওয়া যায়। সাংগঠনিক শক্তি, সঠিক স্লোগান ও প্রচার, ভাল প্রার্থী চয়ন, ইত্যাদিকে ছোট করা চলে না। তবে শুধু সেগুলি দিয়ে দু’টি-তিনটি নির্বাচন পার করা যায় না। টিকে থাকার সঙ্গে সরকারের প্রতি মানুষের ভরসার ঘনত্বের একটা স্পষ্ট সম্পর্ক আছে। সেই ঘনত্ব তৈরি হতে একটু সময় লাগে, তবে তৈরি করলে তা থাকে অনেক দিন। আবার, গলতে শুরু করলে খুব তাড়াতাড়ি গলে যায়। ভাষা, ধর্ম, জাতির সমীকরণ সরকার পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় যতটা কাজে লাগে, টিকে থাকার ব্যাখ্যায় ততটা কাজে লাগে না। ভোটের রাজনীতির এই পরিচিত অক্ষপথগুলি সময় সময়, আঞ্চলিক বা জাতীয় দলগুলিকে শক্তিশালী করেছে, সরকার তৈরি করেছে, সরকার ভেঙেছে। কিন্তু সরকার টেকায়নি। টিকিয়েছে সরকারের কয়েকটি কাজ।

তবে কি টিকে থাকার রাজনীতির একটু নতুন অক্ষপথ তৈরি হচ্ছে? আমি বলব, হ্যাঁ। যাঁরা তা তৈরি করছেন, তাঁরা হলেন মহিলা— প্রধানত গ্রামীণ ও মফস্সল শহরের সাধারণ ঘরের মহিলা। সমস্ত তথ্য বলে, মহিলারা এখন নিজের মন ও বিচারমতো ভোট দেন। মমতা থেকে নীতীশ, রমণ থেকে নবীন— এঁদের সমর্থন বলয়ের নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলেন মহিলা। আইনশৃঙ্খলা, রেশন, ব্যাঙ্কের খাতায় মাসে কিছু টাকা, সময়মতো ত্রাণ, সাইকেল, ইত্যাদি এই ভরসা তৈরি করেছে। এটা উন্নয়নের রাজনীতি নয়, জাতপাতের রাজনীতি নয়, ভাষা আঞ্চলিকতার রাজনীতিও নয়। এটা নিরাপত্তা ও ভরসার রাজনীতি। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে মনে হয়, মহিলারাই বোধ হয় রাজনীতিতে পুরুষদের আগে জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবেন।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.