×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

সুন্দরবন করুণা চায় না

সুমন মাইতি
০৭ জুন ২০২১ ০৫:৫৩
ফাইল চিত্র।

ফাইল চিত্র।

কলকাতা, হাওড়া-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দরবন। বিপুল জনবসতি সেখানে। এঁদের জীবনযাপনের দৈন্য, দুশ্চিন্তা, অভাব, উন্নয়নের বৈষম্য সচরাচর আমাদের ভাবনায় ঠাঁই পায় না। ক্রমবর্ধমান অসম নগরায়ণ এবং আত্মঘাতী উন্নয়নের বলি ম্যানগ্রোভ এবং বাদাবনের ভবিষ্যৎ। বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের পৌনঃপুনিক ব্যর্থতা কলকাতাকেন্দ্রিক শ্রেণিবৈষম্যের সূচক। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু-পরবর্তী আলোকিত কক্ষে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ নিয়ে বিদগ্ধ বক্তার উজ্জ্বল আলোচনায় সুন্দরবনের মানুষরা অনুপস্থিতই থেকে যান। এঁরা সাহিত্যে আসেন না, গল্প কবিতা নাটকের উজ্জ্বল চরিত্র নন।

দ্রুত উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কোভিড পরবর্তী বেকারত্ব এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্যের কারণে সুন্দরবনের সমস্যা আক্ষরিক অর্থেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বাস্তু সমস্যা সৃষ্টি করবে। পরবর্তী দশকে এই সমস্যা আরও তীব্র হবে। জলবায়ুজনিত অভিঘাতের প্রভাব স্থানীয় স্তর ছাড়িয়ে কলকাতার এবং সম্ভবত সামগ্রিক পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে যাবে। কয়েক লক্ষ মরিয়া, ভূমিহীন মানুষের জনস্রোত কলকাতা এবং সন্নিহিত অঞ্চলে উঠে আসবে। নতুন করে তৈরি হওয়া উদ্বাস্তু-সমস্যার একটি বহুমাত্রিক চরিত্র রয়েছে। এক দিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, অন্য দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বেড়ে যাবে বহু গুণ।

উপর্যুপরি ঝড়ে প্রচুর গাছ শিকড়সমেত পড়ে গিয়েছে, ফলে পাখিদের বাসা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বেলাভূমি সন্নিকটস্থ অঞ্চলে বসতি, এমন প্রজাতিগুলির প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরীসৃপ এবং উভচর— এদের ভারসাম্য ব্যাহত হলে সুন্দরবনের নিজস্ব বাস্ততন্ত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। ক্রমবর্ধমান জলস্তর, ভূমিক্ষয় এবং বাড়তে থাকা লোকালয়ের চ্যুতিরেখা বরাবর আমাদের বাস্তুতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ধরে নিয়েই পরিকল্পনা প্রণয়নে জোর দেওয়া উচিত। স্থানীয় স্তরে সমাধানের জন্য ম্যানগ্রোভ বাদাবন এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের জীববৈচিত্র সুরক্ষায় নজর দিক সরকার। জনশুমারির তথ্য থেকে, উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির প্রজননক্ষম জনসংখ্যা ও বনভূমির বিস্তার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল থাকুক। অন্য দিকে, সমবায় পদ্ধতির বিস্তার ঘটিয়ে কৃত্রিম মাছচাষের সুফল ব্যষ্টির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। এর ফলে বেআইনি ভাবে নদীবাঁধের জমি বুজিয়ে গড়ে ওঠা ভেড়িগুলিতে রাশ টানা সম্ভব। ভেড়ির সমপরিমাণ জমিতে ম্যানগ্রোভ বসানোর উপায় রাখা হোক। এবং সমস্ত অংশীদারের নির্দিষ্ট কোটায় ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাক। আমেরিকার ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যানে এ ধরনের একাধিক কাজ হয়েছে। বায়োস্ফিয়ার রিজ়ার্ভ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে অনুদানের তদবির করাও জরুরি। ‘কার্বন নিউট্রাল ইকনমি’-তে সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সেই সাপেক্ষে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইউনিভার্সাল বেসিক স্কিমের বাজেট বরাদ্দ করতে পারে। রাজ্য স্তরে তা সম্ভব।

Advertisement

সুন্দরবন এবং সন্নিহিত অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্যপঞ্জি একটি কেন্দ্রীয় সাইটে ডেটাবেস হিসেবে জনপরিসরে নিয়ে আসা প্রয়োজন। তথ্যগুলি সময়-সারণির সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করলে অঞ্চলের সামগ্রিক অভিঘাতের পরিষ্কার চিত্র উঠে আসবে। এর ফলে সাধারণ নাগরিক থেকে অভিজ্ঞ পরিবেশবিদ, প্রযুক্তিবিদ বা গবেষকদের পক্ষে পরিকল্পনা সমন্বয়ে, সমস্যার চরিত্র নির্ধারণের কাজ সহজ হতে পারে। সমস্যাটা বহুমুখী, তাই কয়েকটি স্তরে সমাধান সূত্র খুঁজতে হবে। প্রথম ধাপে, উপগ্রহভিত্তিক ছবি এবং স্থানীয় নদীবাঁধ বরাবর সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গাণিতিক মডেল প্রয়োগ করে স্বল্পমেয়াদি ক্ষয়রোধ এবং সে অনুযায়ী বাঁধ মেরামতির কাজে গতি আনা সম্ভব। দ্বিতীয় ধাপে, বন্যাপ্রবণ অঞ্চলগুলিকে চিহ্নিত করে সেখানকার জনঘনত্ব অনুসারে স্থায়ী স্টর্ম শেল্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয় ধাপে, আগামী দশকের মধ্যে সুন্দরবন অঞ্চলের জনঘনত্ব স্থিতিশীল করার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান এবং নিয়ন্ত্রিত পরিযাণ পরিকল্পনা রূপায়ণের প্রয়োজন। কারণ, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এই শতকের মাঝামাঝি প্রায় তিন-চার ডিগ্রি উষ্ণায়ন ঘটতে চলেছে। ফলে, এখানকার সামুদ্রিক জলস্তর কয়েক মিটার অবধি বাড়বে। এমতাবস্থায় বৃহত্তর কলকাতাকেও সুন্দরবন সংক্রান্ত পরিবেশ পরিকল্পনায় আনা জরুরি। এখানকার বাস্ততন্ত্রের মূলচালিকাশক্তিকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। সুন্দরবনের প্রজাতি বৈচিত্র ব-দ্বীপ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার স্বার্থে বাঁচিয়ে রাখা দরকার।

প্রতি বার দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর কিছুটা ত্রাণ, কয়েকটি মেডিক্যাল টিম গিয়ে বা কিছু জামা-কাপড় বিলি করে সুন্দরবন সমস্যার সুরাহা হবে না। এটা এক ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দেয় যে, অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে আমরা উন্নয়নের দায় সেরে ফেলতে পারি। সুন্দরবনের মানুষ করুণা চান না; তাঁরা রাষ্ট্রের শরিক এবং নাগরিক হিসেবে সুস্থ জীবন দাবি করেন।

ইউনিভার্সিটি অব আরকানস’ ফর মেডিক্যাল সায়েন্সেস, আমেরিকা



Tags:

Advertisement