নরেন্দ্র মোদীর জমানায় ভারতীয় অর্থনীতির হাল আগের জমানার চেয়ে ভাল কি না, এত দিন তুল্যমূল্য আলোচনার কোনও উপায়ই ছিল না। ২০১৪ থেকে সেন্ট্রাল স্ট্যাটিস্টিকাল অর্গানাইজ়েশন ভারতের জিডিপি মাপার বেস ইয়ার বা ভিত্তিবর্ষ ২০০৪-০৫ থেকে বদলে ২০১১-১২ করে দেয়। কিন্তু নতুন ভিত্তিবর্ষের নিরিখে ২০১১-১২’র আগের বছরগুলোর পরিসংখ্যান নতুন করে তৈরি করা হয়নি, ২০১১-১২ সালের পরের পরিসংখ্যানও পুরনো অঙ্কে ফেলা হয়নি। ফল হয়েছিল এই যে ২০১১-১২’র আগের আর পরের আয়বৃদ্ধির হারের মধ্যে তুলনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইউপিএ জমানার শেষ তিন বছরেরই বৃদ্ধির হার জানা যেত এই নতুন হিসেবে। আর, বৃদ্ধির হারের নিরিখে সেই তিনটে বছর ছিল ইউপিএ-র সব চেয়ে খারাপ তিন বছর। ফলে, একটা অন্যায্য তুলনা হয়ে আসছিল এত দিন। কতখানি অন্যায্য? ধরুন, বিরাট কোহালি আর সচিন তেন্ডুলকরের ব্যাটিং-এর তুলনা করতে গিয়ে আপনি এক জনের গোটা কেরিয়ারের গড় দেখলেন, আর অন্য জনের ক্ষেত্রে তিনি যে ম্যাচগুলোতে ভাল রান করেননি, শুধু সেগুলোর গড় নিলেন। এ তুলনা একপেশে হবেই। সেই একপেশে তুলনা শুনেই এত দিন মানুষ জেনেছেন, মনমোহন আমলের তুলনায় মোদী জমানায় অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ঢের ভাল।

এত দিনে সমস্যাটা মিটল। অন্তত, এই মুহূর্তে। সিএসও-র এক সাব-কমিটি ব্যাক সিরিজ় পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, নতুন হিসেবে বিগত বছরগুলির পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে এ বার। তবে, এই পরিসংখ্যান সরকার মানবে কি না, রীতিমতো সংশয় তা নিয়ে। পরিসংখ্যান যা বলছে, সেটা নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে সুখবর নয়। দেখা যাচ্ছে, ইউপিএ-র মোট দশ বছরের শাসন কালে গড় আর্থিক বৃদ্ধির হার বছরে ৮.১ শতাংশ। মোদী সরকারের ক্ষেত্রে সেই হার ৭.৩%। এমনকি, দ্বিতীয় ইউপিএ-র আমলে, যখন নাকি কেন্দ্রীয় সরকার নীতিপঙ্গুত্বে ভুগছিল, বছরে গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৪%। মোদী জমানার চেয়ে সামান্য হলেও বেশি। ‘অচ্ছে দিন’ কোথায় গেল, খোঁজ করে দেখতে পারেন। যে বাজপেয়ী আমলের বৃদ্ধিহার নিয়ে বিজেপির উত্তেজনার শেষ নেই— মনমোহন সিংহ ক্ষমতায় এসে নাকি যে বৃদ্ধির সর্বনাশ করেছিলেন— সেই আমলে বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ৫.৮%। আর একটা হিসেব দেওয়া যাক। দ্বিতীয় ইউপিএ-র আমলে, যখন ভারতে আর্থিক বৃদ্ধির হার তুলনায় কম ছিল, তখন গোটা দুনিয়ার গড় বৃদ্ধির হারের চেয়ে ভারতে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৫.২৬ শতাংশ-বিন্দু বেশি ছিল। মোদীর আমলে এই ফারাক ৪.৪৮ শতাংশ-বিন্দুর, আর বাজপেয়ীর আমলে ফারাক ছিল ৩.০২ শতাংশ-বিন্দু।

এটা না মেনে মোদী-ভক্তদের উপায় নেই। কাজেই, তাঁরা ভিন্নতর প্রশ্ন তুলতে আরম্ভ করেছেন। বৃদ্ধির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করছেন। ইউপিএ জমানায় রাজকোষ ঘাটতি মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৫ শতাংশের বেশি হওয়ার পর থেকেই বলা হয়, মাত্রাতিরিক্ত খরচ আর আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারাই সেই জমানার অভিজ্ঞান। কথাটা এখনও উঠছে। তবে, সরকারি ঋণের পরিপ্রেক্ষিতে মনমোহন সিংহের আমলকে আক্রমণ করলে মুশকিল। বলুন দেখি, সাম্প্রতিক কালে কোন জমানায় দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুপাতে ঘাটতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ছিল? অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানায়। এই অনুপাতের গড় ছিল ৫.৭%। ইউপিএ-র দশ বছরে এই গড় ছিল ৪.৬%, আর নরেন্দ্র মোদীর আমলে তা কমে হয়েছে ৩.৮%। অর্থাৎ, নরেন্দ্র মোদীর সরকার তার পূর্বসূরির তুলনায় জাতীয় আয়ে ঘাটতির অনুপাত খানিক কমাতে পেরেছে বটে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কমিয়েছিল ইউপিএ।

আর একটা সমালোচনা খুব শোনা যাচ্ছে— ইউপিএ-র আমলে মূল্যবৃদ্ধির হার লাগাতার বেশি ছিল। বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধি জিনিসটা যে খারাপ, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু, সেই সমালোচনায় যাওয়ার আগে মনে রাখা ভাল, মূল্যবৃদ্ধির হারকে সরিয়ে রাখলেও ইউপিএ আমলে আর্থিক বৃদ্ধির হার বেশি ছিল। কিন্তু, এই সমালোচনার মধ্যে খানিক হলেও সত্যি আছে। ক্রেতাপণ্য সূচকের নিরিখে মূল্যবৃদ্ধির হিসেব দেখলে স্পষ্ট হবে, ইউপিএ আমলে এই হার ছিল বছরে ৮.৩%। বাজপেয়ী এবং নরেন্দ্র মোদীর আমলে হারটি যথাক্রমে ৪.২% ও ৪.৪%। কিন্তু, এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে কারণ কী ছিল, সেটা দেখা দরকার। ইউপিএ আমলে যে যে জিনিসের দাম বেলাগাম বেড়েছিল, পেট্রোলিয়াম তার মধ্যে অন্যতম, যার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। ২০০৮ সালে অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১৬০ ডলার ছুঁয়েছিল। দ্বিতীয় ইউপিএ-র পাঁচ বছরে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ছিল ৯৩ ডলার। আর, মোদীর আমলে এই দাম মাত্র ৫৩ ডলার। ফারাকটা তাৎপর্যপূর্ণ। এবং, মনে রাখা ভাল, পেট্রোলিয়ামের দাম বাড়লে তাতে শুধু মূল্যবৃদ্ধিই হয় না, রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণও বাড়ে। সে দিক থেকে, বাজপেয়ী এবং মোদী, দুই আমলেই এনডিএ-র ভাগ্য ইউপিএ-র তুলনায় ঢের ভাল ছিল।

তার চেয়েও বড় কথা, ইউপিএ আমলে আর্থিক বৃদ্ধির হার ভাল ছিল, কারণ সরকার বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল ক্ষেত্রে (যেমন সামাজিক কল্যাণের পিছনে) প্রভূত টাকা খরচ করেছিল— যে খরচ বজায় রাখা যেমন অসম্ভব, তেমনই যার মূল্যবৃদ্ধির মতো বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে— এই যুক্তিটা দাঁড়ায় না। এক দশক ধরে শুধুমাত্র সরকারি খরচের জোরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির চড়া হার বজায় রাখা যায় না। সত্যিটা হল, ইউপিএ আমলে সরকারি ব্যয় (যার মধ্যে কল্যাণখাতে ব্যয়ও ধরা আছে) কার্যত অপরিবর্তিত ছিল, কিন্তু নতুন মূলধন তৈরি হয়েছিল। আগেই উল্লেখ করেছি, এই আমলে অভ্যন্তরীণ আয়ের অনুপাতে ঋণের পরিমাণ কমেছিল। আয় বৃদ্ধির কারণ লুকিয়ে আছে এখানে।

২০১৪ সালে পরীক্ষিৎ ঘোষ ও অশোক কোটওয়ালের সঙ্গে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম, ভারতের কর্পোরেট দুনিয়া, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ অধৈর্য হয়ে পড়েছেন ভারতের অর্থনীতি, রাজনীতি, ও সার্বিক পরিবেশ নিয়ে। নেহরু জমানার বাম-ঘেঁষা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানে আস্থা হারিয়ে এক ধাক্কায় উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে টক্কর দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তাঁরা মনে করলেন, এক জন শক্তিশালী নেতার প্রয়োজন, যিনি রাতারাতি ভারতকে চিন বানিয়ে দেবেন। কিন্তু প্রচার আর বাস্তব তো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। স্বাধীন ভারতে যে সরকারের আমলে এক দশকে সব চেয়ে বেশি আর্থিক বৃদ্ধি হল, সেই সময়টাকেই দাগিয়ে দেওয়া হল প্রশ্নাতীত বিপর্যয়ের আমল হিসেবে। আজ নতুন তথ্যের আলোয়, গত চার বছরে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের মধ্যে ফারাক দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ভবিষ্যতের কোনও ইতিহাসবিদ অবাক হয়ে ভাববেন, অর্থনীতির হালের মতো ব্যবহারিক বিষয় নিয়েও কী ভাবে তৈরি করা প্রচার অন্তত কিছু সময়ের জন্যে ঢেকে দিতে পেরেছিল বাস্তব সত্যকে।

 

লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস-এ অর্থনীতির শিক্ষক