চৌর্যগাথা নাটকটি লেখার পিছনে একটি ছোট ঘটনা আছে। তখন আমার বাড়িতে মাঝেমধ্যে একটি বিহারী ছেলে আসত। বালুরঘাটে ওর দাদার কাছে মাস দু’য়েক ছিল। ছেলেটা সম্ভবত সাহিত্য নিয়ে পড়ত। সে বাংলা বুঝতে পারত কিন্তু ভাল বলতে পারত না। আমাকে হঠাৎ একদিন বলল, ‘‘বাংলা মে এক গাব হ্যা, আপ্ পড় লিজিয়ে।’’ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি গল্প—একটা চোরকে নিয়ে লেখা। পড়ে আমার দারুণ লাগল। আমি গল্পটাকে মাথায় রেখে নাটক লিখলাম ‘অন্যমনস্ক চোর’ নামে। ২০০৫ সালে নাটকটি এই নামে ত্রিতীর্থ প্রযোজনা করে। কিন্তু ‘রঙ্গপট’ পত্রিকায় ২০০৯ সালে যখন নাটকটি প্রকাশিত হয় তখন তার নাম বদল করে রাখি চৌর্যগাথা।

বালুরঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের তখন শতবর্ষ পূর্তি উৎসব। আমার সৌভাগ্য যে, আমাকে সভাপতি করা হয়। একদা আমি এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম, ফলে আমার একটা আবেগও জড়িয়ে ছিল। স্কুলের প্রধানশিক্ষক আমাকে অনুরোধ করেন একটা নাটক লেখার জন্য এবং সেই নাটকটা যাতে স্কুলের ছেলে মেয়েদের দিয়ে করানো যায় সেটাও বিশেষভাবে জানান। তখন আমি কলকাতায় ঔরঙ্গজেব নাটক নিয়ে খুবই ব্যস্ত। এ সবের মধ্যেও আমি স্কুলছুট ছেলে মেয়েদের মাথায় রেখে ছড়া ও গান সহযোগে ‘যদি এমন হত’ নামে মজার একটি একাঙ্ক নাটক লিখি। নাটকটা মূলত সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রদের দ্বারা অভিনীত হয়। পরে স্কুল কম্পিটিশনে নাটকটি জোনালে প্রথম হয় এবং স্টেট লেভেলে দ্বিতীয় হয়।

‘বীজমন্ত্র’ নাটকটির রচনা সম্পর্কে প্রকৃত সত্য কথাটি বলতে চাই। কোনও একটি পত্রিকায় কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি ছোট পাঁচ ছ’পাতার জাপানি ‘নো’ নাটকের দেশী পরিবেশন পড়ে মুগ্ধ হই। শান্তিপুরের কৌশিক আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন। তাই দূরভাষ মারফৎ কৌশিককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, ‘‘তোমার নাটকটি পড়ে সত্যিই আমি মুগ্ধ। তোমার এই ছোট্ট নাটকটি পড়ে আমি একটা পূর্ণাঙ্গ নাটকের সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছি। আমি তোমার এই নাটককে অবলম্বন করে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখতে চাই যদি তোমার সম্মতি পাই।’’ শুনেই কৌশিক আনন্দে হইহই করে আমাকে জানায়, ‘‘এ কথা বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না। আপনার যা খুশি, যেমন ভাবে খুশি লিখুন।’’ এই বরাভয় আমাকে প্রণোদিত করে এবং এরই ফলস্বরূপ ‘বীজমন্ত্র’ নাটক লিখে ফেলি। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

কৌশিকের নাটকের নাম ছিল ‘থলে মাহাত্ম্য।’ আমি একটি বৃহত্তর পরিসরে এই নাটকটি যথার্থ মনে না করে আমার মতো করে নতুন নামকরণ করি। রচনার প্রথম দিকে কৌশিকের লেখা সংলাপ ও সিক্যুয়েন্স প্রায় অবিকল ব্যবহার করেছিলাম। পরিবর্তন কষ্টকর বা অসাধ্য ছিল না, কিন্তু ইচ্ছে করেই তা করিনি। নাটকটি লেখার সময় এবং অভিনয় করার সময় আমি স্ল্যাপস্টিক কমেডির ধাঁচায় রেখেছিলাম। শুধু তাই নয়, সংলাপ ও অভিনয় যতটা সম্ভব স্ল্যাপস্টিক হয় তার ইচ্ছাকৃত চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের দেশী যাত্রার ধরণ এবং অভিনয়ের আতিশয্য (এবং সেটা গ্রহণযোগ্যও বটে) এই নাটকের মূল সুর ছিল। আবহে ক্ল্যারিওনেট, ঢোল, বাঁশি, এ সব যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি এ নাটকের পাত্রপাত্রীরা প্রায় সবাই গান গায় এবং এ সব গানের সুর প্রচলিত বাংলা ও হিন্দি গানের প্যারোডি ছিল। বীজমন্ত্র বালুরঘাটে তো বটেই উত্তরবঙ্গের নানা স্থানে পঁচিশের অধিক অভিনীত হয়েছে। নাটক চলাকালীন দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত হাস্যরোল এবং প্রশংসায় আমরা উদ্বেলিত হয়েছি বারবার। দুঃখের বিষয় কৌশিককে এ নাটকের অভিনয় আমি এখনও দেখাতে পারিনি। দেখলে হয়তো খুশি হত অথবা নাও হতে পারত। আজ একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, কৌশিক যদি ছোট নাটকটি না লিখত এবং আমার গোচরে যদি না আসত তাহলে হয়তো আমি কোন দিনই বীজমন্ত্র লিখতাম না। 

আর একটি কথা এ প্রসঙ্গে বলা জরুরি। মিনার্ভা রেপার্টরি থিয়েটারে অভিনেতা নির্বাচনের জন্য যে কয়েকটি ওয়ার্কশপ হয় তার প্রথম ওয়ার্কশপটির পরিচালনার দায়িত্ব ছিল আমার। অভিনয়ের অন্য ক্লাস ছাড়াও একটি ছোট মডেলের নাটক পরিবেশনার শর্ত আমার ওপর বর্তে ছিল। আমি বীজমন্ত্র নাটকের প্রথম সামান্য অংশটুকু বেছে নিয়েছিলাম কারণ তখন সদ্য সদ্য নাটকটা লেখা শেষ করেছিলাম। নাটকটি মহড়া এবং পরিবেশনায় শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ এবং আগ্রহ আমাকে তো বটেই বিচারকদেরও মুগ্ধ করেছিল। আনন্দের কথা ওই দলটি থেকে আট জন শিক্ষার্থী রেপার্টরিতে অভিনয়ের জন্য মনোনীত হয়েছিল। 

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ আমার প্রিয় একজন লেখক, তাঁর গল্প ও উপন্যাস আমার দারুণ লাগে। আসলে আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল ওয়ালীউল্লাহ্-এর ‘লালসালু’ উপন্যাস অবলম্বনে নাটক লেখা। কিন্তু হঠাৎই ওয়ালীউল্লাহ্-এর একটা নাটকের সংগ্রহ আমার হাতে আসে। সেটা পড়তে গিয়ে আমার ‘বহিপীর’ নাটকটাতে চোখ আটকে যায়। ‘বহিপীর’ পড়ার পরে বুঝলাম নাটক হিসেবে সেটা খুবই দুর্বল। ওয়ালীউল্লাহ্ অনেক আগে মারা গিয়েছেন, বেঁচে থাকলে আমি মুখোমুখি কথা বলতাম। ‘পীরনামা’ নামে নাটকটা লিখতে শুরু করি—যা ছিল সেটাকে রেখে, কিছু বাদ দিয়ে, অনেক কিছু জুড়ে নাটকটা শেষ অবধি আমার মতো দাঁড় করাই। ত্রিতীর্থের প্রযোজনায় নাটকটি মঞ্চ সফল হয়েছে।

(মতামত নিজস্ব)