Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

প্রবন্ধ ১

‘হিন্দু’ হওয়াটা যেন কোনও দিন একঘেয়ে হয়ে না পড়ে

দীপেশ চক্রবর্তী
১৫ এপ্রিল ২০১৭ ০০:০০
নববর্ষবরণ: পয়লা বৈশাখে ঢাকার শিল্পময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় বিপুল জনসমাগম, নতুন বছরকে এ ভাবে আহ্বান জানানো আজ ঐতিহ্যে পরিণত।

নববর্ষবরণ: পয়লা বৈশাখে ঢাকার শিল্পময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় বিপুল জনসমাগম, নতুন বছরকে এ ভাবে আহ্বান জানানো আজ ঐতিহ্যে পরিণত।

নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান: সব বিবিধের মধ্যে কোনও একটি মিলনসূত্র আমাদের ইতিহাস তৈরি করে দিয়ে গেছে, ইস্কুলজীবনে এই কথাটিই সমস্ত পাঠ্যপুস্তকে বলা হত, ও শিক্ষকরা তা বিশ্বাসভরে বোঝাতেন। ছোটকালে রেষারেষি বোধ থাকত — হিন্দি বেশি উন্নত ভাষা না বাংলা, তামিল শুনতে অদ্ভুত কি না, এই সব প্রশ্নে বালকসুলভ নিষ্ঠুরতা ইস্কুল-প্রাঙ্গণে বা দৈনন্দিন আচরণে নিশ্চয় প্রকাশ পেত, কিন্তু গরমের বা পুজোর ছুটিতে দেশের অন্যত্র বেড়াতে গিয়ে ভারত সম্বন্ধে যে সত্যটি মনে গেঁথে যেত, তা এক আশ্চর্য বৈচিত্র ও তারই মধ্যে এক গভীর সমন্বয়বোধ। বৈচিত্র নিয়ে ঠাট্টা হত, কিন্তু শেখারও থাকত অনেক। শুধু শিক্ষাজীবনেই নয়, ব্যবহারিক জীবনেও। আমার এক বন্ধু পণ্য-বাজার নিয়ে গবেষণার ব্যবসা করতেন: একদা পাশাপাশি রাজ্য গুজরাত ও রাজস্থানে নামী একটি ব্যাটারির বিপণনের প্রভেদ তিনি আমায় বুঝিয়েছিলেন। একই ব্যাটারির নবতম সংস্করণ, কিন্তু গুজরাতে বিক্রি করতে গেলে বলতে হয় ‘এ হল একেবারে আধুনিকতম সংস্করণ, লেটেস্ট’, আর রাজস্থানে বলতে হয়, ‘জানেন তো, এ কোনও হাল ফ্যাশনের ঠুনকো জিনিস নয়, এ হল সেই সাবেকি চিরাচরিত ব্র্যান্ডের ব্যাটারি!’ অর্থাৎ ভারতবর্ষের ধনতন্ত্রও এই বৈচিত্রের সত্যকে না মেনে চলতে পারে না।

এ সব কথা মনে পড়ল নববর্ষ প্রসঙ্গে। বাংলা নববর্ষ আজ। এ দিকে কয়েক দিন আগে দেখলাম পার্লামেন্টে উদযাপিত হয়ে গেল নববর্ষ-উৎসব। দিল্লির বন্ধুরা ‘শুভ গুডি পড়ওয়া’ বলে শুভেচ্ছা বার্তাও পাঠালেন। কিন্তু অবাক হলাম এই দেখে যে সংসদ ভবনের উৎসবে ডাক দেওয়া হল ‘হিন্দু নববর্ষ’-এর! ‘হিন্দু’ কেন? আমিও তো হিন্দু, বাঙালি হিন্দু, কিন্তু যখন সংসদে নববর্ষ চলল, আমার নববর্ষ তো তখনও আসেনি! এখানেও ভারতবর্ষীয় হিন্দু-সমাজের বৈচিত্রের কথাই এসে পড়ে। অন্ধ্র বা কর্নাটকে ‘উগাড়ি’ বা মহারাষ্ট্র-গোয়ায় ‘গুডি পড়ওয়া’ উৎসব করা হয় চৈত্রকেই বছরের প্রথম মাস ধরে। এবং এর প্রকাশভঙ্গি ও আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকর্মের চেহারা যে ‘হিন্দু’, তা মানি। কিন্তু দুই বাংলারই যে বঙ্গাব্দ আমরা মেনে চলি তা হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ইতিহাসের ফসল। একে এ রকম এককথায় ‘হিন্দু’ বলা যাবে না, ‘মুসলমান’ও বলা যাবে না। এখানেই বাঙালির বৈশিষ্ট্য— এবং, ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে, বৈচিত্র!

সবাই জানেন, সন-তারিখ এ সব আরবি কথা। ‘সাল’ কথাটি আদিতে ফারসি। ঐতিহাসিক দম্পতি কুণাল ও শুভ্রা চক্রবর্তী তাঁদের প্রণীত ‘বাঙালের ঐতিহাসিক অভিধান’-এ ও অমর্ত্য সেন মহাশয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’-এ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে হিন্দুর সৌর বৎসর ও মুসলমানের চান্দ্র বৎসর মিলে-মিশে বঙ্গাব্দ তৈরি হয়েছে। হিজরি সনের ৯৬৩ সালে, যখন আকবর বাদশাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন থেকে বঙ্গাব্দের শুরু। আবার হিজরি সনের ভিত্তি হল ৬৬২ খ্রিস্টাব্দে নবির মক্কা থেকে মদিনা গমন। বাংলায় সৌরকালপঞ্জির প্রবর্তক হিসেবে রাজা শশাঙ্ককে ধরা হয়। এই বর্ষপঞ্জির ভিত্তি ছিল চতুর্থ শতকের গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’। কিন্তু বঙ্গাব্দ— আদিতে দীন-ই-ইলাহি-র মতো তারিখ-ই-ইলাহি, আকবরের সভার জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজির সৃষ্টি। এই কালপঞ্জিতে সৌর ও চান্দ্র বৎসর-হিসাবের এক মেলবন্ধন করা হয়েছে, ফসল গোলাজাত করার পর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। মুঘল যুগের কাগজপত্রে তাই বাংলা সনকে ‘ফসলি সন’-ও বলা হত। তা হলেই বুঝুন, আমরা যখন বর্ষপঞ্জি ধরে পুজো-আচ্চা শুভদিন শুভমুহূর্তের হিসাব কষি, আমাদের ক্যালেন্ডারের মধ্যেই বসে থাকে মুসলিম ইতিহাসের দুটি বড় ঘটনা— হজরত মহম্মদের হিজরত ও আকবর বাদশাহ-র রাজত্বের শুরু!

Advertisement

আকবর-প্রবর্তিত ধর্ম ‘দীন-ই-ইলাহি’র মতো তাঁর তৈরি ক্যালেন্ডার ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ তাঁর মৃত্যুর পর আর বিশেষ চলেনি। কিন্তু বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রম। এখানে তাঁর ‘তারিখ-ই-ইলাহি’-ই নানা কারণে বঙ্গাব্দ হয়ে আজও বেঁচে আছে। মাসগুলোর ফারসি নাম বদলে বিভিন্ন নক্ষত্রের সংস্কৃত নাম অনুযায়ী নাম তৈরি করা হয়েছে, যেমন ‘বিশাখা’ থেকে ‘বৈশাখ’। বাংলার এই ব্যতিক্রম কিন্তু ইতিহাসের কোনও ‘সেকুলার’ পরিহাস নয়। বরং আমরা একে ইতিহাসের দান বলে ভাবতে পারি। পৃথিবীতে বাংলা-ভাষী মানুষের বেশির ভাগই ধর্মমতে মুসলমান, হিন্দুরা এই গোষ্ঠীতে সংখ্যালঘু। তার ওপর আমরা দুটো সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিভক্ত। আমাদের বিভাজনটিও এককালীন জার্মানির বিভাজনের মতো নয়। কোনও পরাক্রমশালী শক্তি এসে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভাগ করে দেয়নি। এই বিভাজন আরও গভীরে, মনে মনে। আজও দুটি দেশের মানুষের মধ্যে অনেক ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব সত্ত্বেও বহু অবিশ্বাস জমা আছে, আর তাকে ভিত্তি করে রাজনীতি করার মানুষের অভাব নেই। অথচ শত শত বছরের ইতিহাস হিন্দু ও মুসলমান বাঙালিকে নানান সূত্রে আবদ্ধও করেছে। ওঁরা কোনওদিন রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দকে ছাড়তে চাইবেন না। আমরাও কি চাইব নজরুল, জসীমউদ্দিন বা আব্বাসউদ্দিনকে ছাড়তে?

সেই রকম বাংলা নববর্ষেরও কোনও ‘হিন্দু/মুসলমান’ নেই। ঢাকায় যে নববর্ষ উদযাপন হয়, তাতে অংশগ্রহণ করতে কত মানুষ যান কলকাতা থেকে; আবার সেই রকম কলকাতাতেও ঢাকার মানুষ আসেন (একই জিনিস হয় পঁচিশে বৈশাখের ক্ষেত্রেও)। এই সব উৎসবের কোথাও যে কোনও স্থানিক বা ধার্মিক চরিত্র (বিশেষত লোকসংস্কৃতির ভূমিতে) হতে পারে না, তা বলছি না। কিন্তু ঢাকা ও কলকাতা মহানগরীতে নববর্ষ একটা হিন্দু-মুসলমানের মিলিত চেহারা নিয়েছে। এই মিলিত চেহারার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ও রাবীন্দ্রিক ঐতিহ্যের অবদান অবশ্যস্মর্তব্য। ঢাকার ক্ষেত্রে দেখেছি, আজও দেখছি, নববর্ষ-উদযাপনের এই ধারাটিকে যাঁরা ‘হিন্দু’ বলে বর্জন বা আক্রমণ করতে চান তাঁরা গোঁড়া কট্টর ইসলামপন্থী। পশ্চিমবঙ্গে এখনও এই রব শুনিনি যে নববর্ষকে ‘প্রকৃত ভাবে হিন্দু’ করা প্রয়োজন বা তাকে ‘গুডি পড়ওয়া’র ধরনে ঢেলে সাজাতে হবে। কিন্তু সদ্য একটা দুর্লক্ষণ দেখছি। কেউ কেউ আমাদের বাসন্তী পুজো ও সত্যনারায়ণ/সত্যপিরের পুজোকে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের কায়দায় রামনবমীতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছেন। এটা নিশ্চয়ই রাজনৈতিক স্বার্থেই করা হচ্ছে। এমন একছাঁচে ঢালা হিন্দুত্ববোধ যদি বাংলায় তৈরি হয়, তবে তা কিন্তু কেবল ইতিহাসবিরোধী হবে না, বাঙালির সত্তাবিরোধীও হবে।

আসল কথা, হিন্দু সমাজটা বিরাট ও বিচিত্র। মরাঠি ব্রাহ্মণ, বাঙালি ব্রাহ্মণ, দক্ষিণী ব্রাহ্মণে যেমন মিল আছে তেমনই অমিলও প্রচুর। আমাদের রাজনীতি যেন কোনওদিন হিন্দুর এই বৈচিত্রের ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে ‘হিন্দু’ হওয়াটাকে একটি বৈচিত্রহীন, একঘেয়ে পৌনঃপুনিকতায় পর্যবসিত না করে— বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে এই আমার প্রার্থনা।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের শিক্ষক

আরও পড়ুন

Advertisement