উত্তর দিনাজপুর জেলার দু’টি সুবিখ্যাত মন্দির হল রায় কলোনি-কালিয়াগঞ্জে অবস্থিত বয়রা কালীমাতার মন্দির’এবং রায়গঞ্জের বন্দরে অবস্থিত বন্দর-কালীবাড়ি। রাজ্য সড়কের উপর অবস্থিত বয়রা কালীমাতার মন্দিরে দীপাবলি আর শিবরাত্রিতে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। তবে প্রাচীন পুজো বা প্রাচীন মন্দির বলতে যা বোঝায়, তা অবশ্য বয়রা কালীমাতার মন্দির নয়। যদিও ভক্তেরা মনে করেন যে, বয়রা কালীমাতা খুবই ‘জাগ্রত’। রায়গঞ্জের কাছে অবস্থিত বিন্দোলে টেরাকোটার তৈরি ভৈরবীদেবীর একটি মন্দির রয়েছে। মনে করা হয় যে, এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা আঠারোশো  খ্রিস্টাব্দে, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময়। রায়গঞ্জের দেবীনগর কালীবাড়িতে কালীপুজোর দিনই দেবীমূর্তি তৈরি করা হয়, রাতে পুজো এবং নিরঞ্জন হয়।
বরং প্রাচীনত্বের দিক থেকে রায়গঞ্জের বন্দরে অবস্থিত বন্দর কালীবাড়ি উল্লেখ্য। পাঁচশো বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যের অধিকারী এই মন্দিরে প্রতিবার কালীপুজোর সময় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পারিবারিক দিক থেকে সাধক বামাক্ষ্যাপা বা বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের বংশধরই হন বলে এলাকার মানুষদের বক্তব্য। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে কুলিক নদীর গতিপথ ছিল অধুনা-রায়গঞ্জ শহরের মধ্যে দিয়ে। তখন ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের মালপত্র বজরা আর ছোট ছোট জাহাজে তোলা হত বন্দর এলাকা থেকে। সেই তখন থেকেই বন্দর কালীবাড়ির কথা জানা যায়। অবশ্য এটিও উল্লেখ্য যে, জনশ্রুতি আর লোকমুখে শোনা ইতিহাসের বাস্তবতার অনুসন্ধান বেশ দুরূহ বিষয়ই।  
দার্জিলিং জেলার সবচেয়ে পরিচিত মন্দির হল মহাকাল মন্দির। শিবের মন্দির বলে প্রতি বছর শিবরাত্রির সময় মানুষের ভিড়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে দার্জিলিঙের চৌরাস্তার কাছের ২৩৭ বছরের প্রাচীন এই মন্দির। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা লামা দোর্জে রিংজিঙ, যিনি ১৭৬৫ সালে প্রায় একই জায়গায় দোর্জে লিঙ্গ নামেই একটি বৌদ্ধ মঠ তৈরি করেন। ১৮১৫ সালে, ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, কিছু বহিরাগত সৈনিক দোর্জে লিঙ্গ মঠে লুটপাট চালায় এবং মঠটিকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। দার্জিলিং জেলার এই মহাকাল মন্দিরে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে, যা জেলার অন্য কোনও স্থাপত্যে সাধারণত লক্ষ করা যায় না।
কোচবিহার জেলার সুবিখ্যাত মন্দির, মদনমোহনদেবের মন্দিরের কথা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের মানুষ জানেন। প্রতি বছর রাসপূর্ণিমার সময় কোচবিহারে রাসমেলা বসে মদনমোহনের পুজো উপলক্ষে। উত্তর দিনাজপুর জেলায় বিভিন্ন জায়গা কৃষ্ণের নামের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নামে নামাঙ্কিত হলেও (যেমন, রাইগঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, করণদীঘি ইত্যাদি), এই জেলাতে কৃষ্ণের পুজো ততটা জমজমাট নয়, যতটা তা প্রাধান্য পায় কোচবিহার জেলায়। ১৮৮৯ সালের জুলাই মাসে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ কোচবিহারে মদনমোহন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তা উদ্বোধন করা হয় ১৮৯০ সালের মার্চ মাসে। তাই প্রাচীনত্বের দিক থেকে মদনমোহন মন্দির কিছুটা নবীনই। তবে, জানা যায় যে, মহারাজা নর নারায়ণ ষোলোশো শতাব্দীতে মদনমোহনের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন নিজের রাজ্যে। কোচবিহার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বানেশ্বর শিবমন্দির সংলগ্ন পুকুরে প্রচুর কচ্ছপ দেখতে পাওয়া যায়। এদের আদর করে ‘মোহন’ বলা হয়।
উত্তরবঙ্গে পুজো আর মন্দিরের কোনও অভাব নেই। তা সংখ্যায় প্রচুর। আসলে, স্থানাভাবে সবগুলির কথা আলাদা করে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। যেমন ধরা যাক, জলপাইগুড়ি জেলায় বেশ কিছু বিখ্যাত মন্দির রয়েছে, প্রায়ই সবগুলিই শিবমন্দির। রয়েছে প্রাচীন জল্পেশের শিবমন্দির। রয়েছে জটিলেশ্বরের শিবমন্দির। শিবের পুজোর সময় এই মন্দিরগুলিতে ভিড় উপচে পড়ে। তবে, জলপাইগুড়ি জেলার সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দির হল বোদাগঞ্জের ভ্রামরীমাতার মন্দির। পূরাণবর্ণিত ৫১ পীঠের একটি এই ভ্রমরীমাতার মন্দির। সতীর বাঁ পা এই ত্রিস্রোতা শক্তিপীঠে পড়েছিল বলেই লোকবিশ্বাস। তবে, জলপাইগুড়ি শহরের একটু বাইরে অবস্থিত এই মন্দিরটি সে ভাবে প্রচার পায়নি। বরং, দেবী চৌধুরানীর মন্দির বলে পরিচিত শহরের কাছের মন্দিরটি অনেক বেশ পরিচিত সবার কাছে।
(লেখক রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত)