সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

একের উদ্‌যাপন যেন অন্যের অসুবিধার কারণ হয়ে না ওঠে

রঙের উৎসবের চেহারা বদলেছে উত্তরবঙ্গে। যদিও এখন প্রশাসনিক পদক্ষেপে অবস্থা আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। লিখছেন সোনালি ঘোষ

Colour

উত্তরবঙ্গের অরণ্যভূমি প্রতিবারের মতোই বসন্তের সাজে সুসজ্জিত। গাছে গাছে কচি পাতার নূপুর বাজলেও জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু হাঁটাপথে ঝরাপাতার চাদর পাতা। পাতাঝরার নিজস্ব শব্দ থাকে। নিঝুম অরণ্যে সেই শব্দ চিরকালীন বসন্তসঙ্গীতও। ‘ঝরাপাতা গো, আমি তোমারই দলে’!

শরতের শ্রেষ্ঠ উৎসব যেমন দুর্গাপুজো, তেমনই বসন্তের বর্ণিল উৎসব দোলযাত্রা। দোল বা বসন্তোৎসবের সূচনা হয়েছিল অতি প্রাচীনকালে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব উৎসবেরই চেহারা বদলে যায়। স্বাভাবিক ভাবে, দোলও তার থেকে বাদ পড়েনি।

কিন্তু কতটা বদলে গিয়েছে রং খেলার এই আয়োজন? অন্তত আমাদেরএই উত্তরবঙ্গে?

উত্তরবঙ্গে দু’দিন ধরে রং খেলা চলে। প্রথম দিন হয় আবির-খেলা। এই দিনটির চেহারা আর পাঁচটা কর্মব্যস্ত দিনের চেয়ে খুব একটা বদলায় না। তবে, সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাই এ দিন বন্ধ থাকে। রাস্তায় যানবাহন এবং লোক চলাচল থাকে অন্য দিনের মতোই। খোলা থাকে দোকানপাট আর বাজারও। প্রথম দিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় ঢল নামে রঙিন সব মানুষজনের। একে অন্যকে আবির মাখিয়ে রঙের উৎসবে মেতে ওঠেন সবাই।  

দোলের দ্বিতীয় দিনটির চেহারা অবশ্য একটু আলাদা এখন। খুব সকালে গুটিকতক দোকান খুললেও ওষুধের দোকান ছাড়া মোটামুটি সকাল ৯টা বা তার আগেই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় বাকি সব দোকানের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে  যায় রং খেলা। আপাদমস্তক রং মাখা আরোহীকে নিয়ে রাস্তা দিয়ে ছুটে যায় একের পর এক মোটরবাইক।

উত্তরবঙ্গের দোলের এই দ্বিতীয় দিনটি এক সময় সাধারণ মানুষকে রীতিমতো আতঙ্কিতই করে তুলত। মেয়েরা তো বটেই, শান্তিপ্রিয় কোনও সাধারণ মানুষই রাস্তায় বার হতে ভয় পেতেন। চোখে সানগ্লাস, মাথায় রুমালের  ফেট্টি বাঁধা লোকজন দখল নিতেন পথঘাটের! সেই উল্লাসের সঙ্গে যোগ ছিল মাত্রাছাড়া নেশারও। টলতে টলতে হাঁটা আর অসংলগ্ন কথাবার্তা বা চিৎকার। 

ইদানীং বাইকের গতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কড়া পদক্ষেপ কড়ায় অবস্থা অনেকটাই বদলেছে। যে কোনও শান্তিপ্রিয় মানুষ যে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এখন প্রতিটি বড় রাস্তা আর শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশি পাহারা থাকে এই দিনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট প্রশংসার দাবিই করতে পারে প্রশাসন।

একই সঙ্গে এ কথাও ঠিক যে, প্রহরীর  সংখ্যাটাও তো নির্দিষ্ট। পাড়ার অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো বা নজরদারি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভবও না। তবুও তাঁদের প্রহরায় এখন অনেকটাই স্বস্তি বোধ করেন শান্তিপ্রিয় মানুষ।

তবু কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। দোলের এই দ্বিতীয় দিনটিতে উত্তরবঙ্গের রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা থাকে প্রায় হাতে-গোনা। খুব জরুরি প্রয়োজনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটা রিকশ বা টোটো খুঁজে পেতে হন্যে হয়ে ঘুরলেও মেলে না প্রায় কিছুই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ভরসা বলতে একমাত্র অ্যাম্বুল্যান্স। 

কিন্তু উৎসবের দিনে শহরাঞ্চলে দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার সুযোগ-সুবিধা থাকলেও গ্রামের কোনও দিন-অানি দিন-খাই মানুষ কি সহজে পারেন অ্যাম্বুল্যান্সে অসুস্থ কোনও মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে? সেই সামর্থ্য তাঁদের আছে কি না, প্রশ্ন তো সেটাও। টোটো বা রিকশর টাকা ভাড়া গোনার ক্ষমতা হয়তো তাঁদের আছে। ‘মাতৃযান’ হলে আলাদা কথা। কিন্তু টাকা গুনতে হয় যে বেসরকারি  অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য, তার নূন্যতম ভাড়া? পারবেন কি তাঁরা?  তা হলে এই অসহায় মানুষগুলো কী করবেন?

অন্য আরও ভাবার বিষয়ও রয়েছে। শহরতলি থেকে যে মানুষটি রিকশ বা টোটো নিয়ে শহরে আসেন রোজগারের আশায়, সেদিন ক’টাকা রোজগার করতে পারেন তিনি? কিংবা গ্রাম থেকে শাক-আনাজ এনে বাজারে  বিক্রি করেন যিনি? বাজার বন্ধ থাকায়  একটা টাকাও তো রোজগার হয় না তাঁর। এই প্রান্তিক মানুষজনের কথা কি আমরা কোনওদিনও ভেবেছি? সামাজিক মাধ্যমে একটা পোস্টও কি দিয়েছি এঁদের নিয়ে?

অথবা, নিজেদের ছেলেমেয়েদেরই-বা ক’জন বলেছি, কারও মুখ লক্ষ করে জলে গোলা রং না ছুড়ে দিতে? ক’জন বুঝিয়েছি তাদের, চোখের কতটা মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে রঙের প্রকোপে? দোলের উল্লাসে, রং খেলার আনন্দে আমরা ভুলে যাই এইসব জরুরি প্রশ্নগুলো। ঘনঘন নিজস্বী তোলা আর ফেসবুকে স্টেটাস দেওয়ার সময় মনের মধ্যে কেন প্রশ্ন জাগে না এই সব বিষয় নিয়ে!  

প্রশ্ন উঠতে পারে, তার মানে কি রং খেলা খারাপ? না, মোটেই খারাপ নয়। কোনও উৎসব খারাপ হতে যাবে কেন! উৎসব তো মিলনের কথাই বলে! বলে উদ্‌যাপনের কথা! একঘেয়ে জীবনের মধ্যে মানুষ যদি অন্য রকম কোনও দিনে রঙের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠতে পারেন, রাঙিয়ে নিতে পারেন নিজেদের, 

তাতে দোষের কী! কিন্তু একই সঙ্গে তো ভেবে দেখার কথা এটাও যে, এই আনন্দ, এই উদ্‌যাপন বা এই উল্লাস যেন অন্যের আতঙ্ক আর অসুবিধার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়! সেটা দেখা বা ভাবাও তো উৎসবেরই প্রাথমিক শর্ত!

রং খেলা মানুষের মিলনোৎসব। আমরা একে অন্যকে রঙে রঙিন করে এই বার্তাটাই তো দিতে চাই যে, এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই। বসন্তের এই শ্রেষ্ঠ উৎসবে নিমন্ত্রণ আমাদের সকলেরই।

দোলের এই দু’দিন সামাজিক মাধ্যমে নিশ্চয়ই নিজস্বী আর স্টেটাস পোস্ট করার প্রবণতা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে! সে সবের মধ্যে কি এই ধরনের কোনও বার্তা থাকতে পারে না যে— বসন্তের এই অতুলনীয় উৎসবে রং খেলুন আনন্দে, রং খেলতেও দিন আনন্দে, কিন্তু রং খেলা যেন একজন মানুষেরও অসুবিধার কারণ হয়ে না ওঠে? 

(লেখক জলপাইগুড়ির ফুলবাড়ি হাইস্কুলের বাংলার শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন