Advertisement
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
কৃষিঋণ মকুব করার নীতি থাকুক, কিন্তু শেষ ভরসা হিসেবে

সহায়ক মূল্যই আসল অস্ত্র

কৃষিঋণ মকুব করা নিয়ে যে রাজনীতি এখন চলছে, তা আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এই রাজনীতিতে কংগ্রেস-বিজেপি সকলেই শামিল।

অভিরূপ সরকার
শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০১৯ ০০:০০
Share: Save:

কৃষিঋণ মকুব করা নিয়ে যে রাজনীতি এখন চলছে, তা আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এই রাজনীতিতে কংগ্রেস-বিজেপি সকলেই শামিল। ৬০,০০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউপিএ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিল এবং তার পর খরা-কবলিত অঞ্চলগুলিতে প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকার ঋণ মকুব করেছিল। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরপ্রদেশে প্রায় ৩৫,০০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মকুব করেছিলেন যোগী আদিত্যনাথ। আর তার চার মাস পরে আরও ৩৫,০০০ কোটি মকুব করেছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির দেবেন্দ্র ফডনবীস। এর পর পঞ্জাব ও কর্নাটকে ৪২,০০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মকুব করা হয়েছিল, যার কিছু করেছিল বিজেপি, কিছু কংগ্রেস।

সম্প্রতি হিন্দি বলয়ের তিনটি রাজ্যে বিজেপিকে হারিয়ে দেওয়ার পর উজ্জীবিত কংগ্রেস এই তিনটি রাজ্যে ৫৯,০০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মকুব করেছে। মধ্যপ্রদেশে ৩৫,০০০ কোটি, রাজস্থানে ১৮,০০০ কোটি, ছত্তীসগঢ়ে ৬,০০০ কোটি। এই ঋণ মকুবের অনুপাত সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির মোট বাজেটের ১০ থেকে ২০ শতাংশ। রাহুল গাঁধী জানিয়েছেন, সারা দেশে সমস্ত কৃষিঋণ মকুব না হওয়া অবধি তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। লোকসভা ভোট দরজায়।

ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনও কৃষিজীবী। নির্বাচনের খাতিরে সব দলই এই বিপুল কৃষিজীবী ভোটব্যাঙ্ককে খুশি রাখতে চাইবে। কিন্তু যে ভাবে সমস্ত বিচার-বিবেচনা জলাঞ্জলি দিয়ে কোটি-কোটি টাকা মকুব করে দেওয়া হচ্ছে, সেটা নিয়ে অনেকেই আপত্তি তুলেছেন। ঋণ মকুব বিরোধীদের তালিকায় যেমন রঘুরাম রাজন, অরবিন্দ পানাগড়িয়া কিংবা কৌশিক বসুর মতো প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদরা রয়েছেন, তেমনিই রয়েছেন স্বামীনাথনের মতো কৃষি-বিশেষজ্ঞ, নীতি আয়োগের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।

কৃষিঋণ মকুবের বিরুদ্ধে অনেক রকম আপত্তি। নীতি আয়োগ বলছে, কৃষিঋণ মকুব করা হলে শুধুমাত্র বড় কৃষকদের লাভ হবে, এর থেকে ছোট কৃষকদের কোনও সুবিধেই নেই। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, কৃষিঋণের সিংহভাগ যায় বড় কৃষকদের হাতে, ছোটদের হাতে যায় খুব কম, আর, খুব ছোট কৃষকরা তো ব্যাঙ্কের নাগালই পান না। নীতি আয়োগের মতে, গরিব রাজ্যগুলোতে ২৫ শতাংশেরও কম কৃষক প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের নাগাল পেয়ে থাকেন, ঋণ মকুব হলে বড় জোর ১০-১৫ শতাংশ কৃষক তার সুবিধে পাবেন।

দ্বিতীয় আপত্তি, কৃষিঋণ মকুবের কারণে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বিভিন্ন রাজ্য সরকারের তহবিল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং এর ভার বহন করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলি আরও অক্ষম হয়ে পড়ছে। গত জুলাই মাসের হিসেব অনুযায়ী সারা দেশে সাম্প্রতিক কৃষিঋণ মকুবের মোট পরিমাণ ছিল ২.৭ লক্ষ কোটি টাকা। তিনটি রাজ্যে কংগ্রেসের বিজয়োত্তর ঋণ মকুব ঘোষণা এই পরিমাণকে আরও অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ঋণ মকুবের অপচয় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কাজে খরচ করা হলে রাজ্যগুলির অনেক উপকার হত।

তা ছাড়াও, অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিঋণ মকুব সৎ ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহ করে, অসৎদের উৎসাহ দেয়। ধার নেওয়ার পর যাঁরা খুব কষ্ট করে সেই ধার শোধ দিলেন, তাঁরা দেখলেন, অন্যরা যারা ধার শোধ দিল না, তাদের ঋণ মকুব হয়ে গেল। অর্থাৎ যাঁরা ঋণ শোধ করলেন না, তাঁদের তুলনায় যাঁরা ঋণ শোধ করলেন তাঁদের এক রকম জরিমানাই হল। এই রকম বিকৃত উৎসাহদান সৎ-অসৎ সবাইকেই ভবিষ্যতে ঋণ ফেরত না দিতে প্রলুব্ধ করবে। ফলে ব্যাঙ্কগুলোর পক্ষে কৃষিঋণ দেওয়াটাই অসম্ভব হয়ে উঠবে।

উল্টো দিকের যুক্তি যা আছে, সেগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার। আমাদের দেশে সম্পন্ন কৃষক কম, ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক চাষিরাই সংখ্যায় বেশি। গণতন্ত্রে যে হেতু সংখ্যাটাই আসল, কৃষিঋণ মকুব যদি শুধুমাত্র বড় কৃষকদের সুবিধে করে দিত, তা হলে রাজনৈতিক দলগুলো এমন করে কৃষিঋণ মকুবের প্রতিযোগিতায় নামত না। যখন নেমেছে, তখন ধরে নিতে হবে এর ভেতর দিয়ে তারা কৃষিজীবীদের একটা বড় অংশের কাছে পৌঁছতে পারছে। সাধারণত ছোট ছোট ঋণই মকুব করা হয়, আর, ঋণ মকুবের উপযুক্ত হতে গেলে জমির মালিকানাও খুব বেশি হলে চলে না। তাই ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষিরা ঋণ মকুবের কিছু সুফল অবশ্যই পান। তা ছাড়া ভূমিহীন খেতমজুরদের কাছেও পরোক্ষ ভাবে ঋণ মকুবের সুফল খানিকটা পৌঁছয়, কারণ এর ফলে কৃষিক্ষেত্রের কাজকর্মে গতি আসে।

দ্বিতীয়ত, কৃষিঋণ মকুবের ফলে সরকারের তহবিলে চাপ পড়ে বটে, কিন্তু মনে রাখা দরকার, এটা এক ধরনের ভর্তুকি। কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়ার প্রথা সারা পৃথিবীতেই চালু আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাৎসরিক কৃষি-ভর্তুকি ১৭২ বিলিয়ন ডলার, চিনে ১৬৫ বিলিয়ন, ইয়োরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৭০ বিলিয়ন, জাপানে ৬৫ বিলিয়ন। ভারতে কৃষিঋণ মকুবের খরচ পৃথিবীর বড় দেশগুলোর কৃষি-ভর্তুকির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অবশ্য সম্পন্ন দেশগুলোর পক্ষে যে খরচটা করা সম্ভব, আমাদের গরিব দেশের সেই সামর্থ্য আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু গভীরতর প্রশ্ন হল, কৃষিঋণ মকুবের মধ্য দিয়ে যে ভর্তুকিটা কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে, সেটা কি ভর্তুকি দেওয়ার কুশলীতম পন্থা? তারও আগের প্রশ্ন, কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়ার দরকার পড়ে কেন?

কৃষির সমস্যা দু’রকম, একটা উৎপাদনের, একটা চাহিদার। ভারতে সেচ ব্যবস্থা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে, কৃষিকে বৃষ্টিদেবতার মেজাজ-মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও বিপদ, কম বৃষ্টি হলেও। এটা উৎপাদনের সমস্যা। কিন্তু বৃষ্টির দেবতা দয়া করলেও কি নিস্তার আছে? অতিফলন হলে বাজারে পণ্যের দাম পড়ে যায়, তখন চাষের খরচটাও ওঠানো কঠিন হয়। এটা চাহিদার সমস্যা। এ ছাড়াও চাহিদার একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, তার চাল-ডাল-আনাজের চাহিদা সেই হারে বাড়ছে না। সেটা স্বাভাবিকও বটে।

জোগান ও চাহিদাগত এই সব সমস্যার কারণে কৃষিপণ্যে ভর্তুকি দেওয়াটা জরুরি। বিশেষ করে এই কারণে যে, ভারতের বেশির ভাগ মানুষ এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া, ভর্তুকি না দিলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বিপজ্জনক ভাবে কমে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। সেটা কাম্য নয়। উৎপাদনের ঝুঁকিটা কৃষি বিমা দিয়ে খানিকটা কমানো যায়। ভারতেও এখন কৃষিবিমা চালু হয়েছে। তবে খরা বা অতিবৃষ্টি সাংঘাতিক আকার ধারণ করলে কোনও বিমাই যথেষ্ট নয়। তখন ঋণ মকুব ছাড়া গতি নেই।

আসল সমস্যাটা কিন্তু চাহিদার। চাহিদার স্থবিরতা কৃষিপণ্যের দামকে তেমন ভাবে বাড়তে দেয় না। অথচ চাষের খরচ বাড়ছে, গ্রাম থেকে শহরে পণ্য নিয়ে যাওয়ার খরচ বাড়ছে। আবার অনাবৃষ্টি-অতিবৃষ্টির কারণে মাঝে মাঝে হঠাৎ খুব দাম বেড়ে যায়। তখন অন্য বিপদ। দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনও পেট ভরে খেতে পান না। চাল-গমের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে তাঁদের পক্ষে বেঁচে থাকা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

চাহিদা ও জোগানের সমস্যাগুলো মেটানোর জন্য সরকারি পদক্ষেপ দরকার, ভর্তুকির প্রয়োজন। পূর্বঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে সরকার ফসল কিনলে সমস্যাগুলো খানিকটা মেটানো

যেতে পারে। ভারতে সে ব্যবস্থা নেই, তা নয়। কিন্তু তাতে অনেক ফাঁক আছে। প্রথমত, প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকরা দূরত্বের কারণে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলোয় পৌঁছতে পারেন না, ফড়ে়েদর কাছেই পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। সরকারের উচিত কৃষকদের বাড়ি বাড়ি সরকারি এজেন্ট পাঠিয়ে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ফসল কেনা। ডোরস্টেপ ব্যাঙ্কিংয়ে যেমন হয়। দ্বিতীয়ত, শুধু ধান-গম নয়, অন্যান্য পণ্য,

বিশেষ করে আনাজের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম সহায়ক মূল্য থাকা দরকার।

সরকারি ক্রয় ও বিপণন ব্যবস্থা সমস্ত কৃষকের কাছে পৌঁছলে কৃষিঋণ মকুবের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যাবে আর এটাই হবে ভর্তুকি দেওয়ার কুশলীতম পন্থা। তখন বিকৃত উৎসাহদানের সমস্যাটাও আর থাকবে না। অর্থাৎ, কৃষিঋণ মকুবের বিকল্পটা শেষ অস্ত্র হিসেবে তোলা থাকুক, স্বাভাবিক সময়ে ছোট কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি দেওয়া হোক উৎপাদন ও বিপণনে।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট,

কলকাতায় অর্থনীতির শিক্ষক

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE