শাসকের ভাষ্যে লক্ষ্যণীয় বদল যেন। গত সাড়ে চার বছরে ভাষ্যজুড়ে ছিল শুধুই ‘সাফল্যের’ উত্তুঙ্গু প্রচার।কিন্তু রাজদণ্ডের উপর অধিকার নবীকরণের সময়টা কাছে আসতেই শাসকের বচন বদলাতে শুরু করেছে।সংলাপের অনেকটা অংশ জুড়েই আজকাল থাকছে বিরোধী শিবিরের প্রতি, বিশেষত বিরোধী ঐক্যের প্রতি, শাণিত কটাক্ষ।

সংসদে বৃহস্পতিবার ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বাজেট অধিবেশন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ নির্বাচনের আগে সংসদে ভাষণ দেওয়ার জন্য মোদীর সামনে এতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনও অবকাশ তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।সুতরাং, দীর্ঘ ভাষণ প্রত্যাশিত ছিল, হলও তাই। কিন্তু নির্বাচনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কোনও মন্ত্রিসভার প্রধান আইনসভায় যে ধরনের ভাষণ দিয়ে থাকেন, নরেন্দ্র মোদীর এই ভাষণ তার চেয়ে বোধ হয় অনেকটাই আলাদা। তাঁর সরকার কী কী করে উঠতে পারল দেশের জন্য, কোন কোন ক্ষেত্রে সাফল্য পেল বলে তিনি মনে করছেন, এ দিনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সে সব নিয়েই বেশি বলবেন বলে আশা করা গিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ভাষণের বেশ উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রইল বিরোধীদের ঐক্য প্রচেষ্টার প্রতি কটাক্ষ।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদের কখনও কটাক্ষ করেন না, বিষয়টা এমন নয় মোটেই।সংসদে রাজনৈতিক আলোচনার পূর্ণ অবকাশ রয়েছে। শুধু মোদী নন, তাঁর পূর্বসূরীরাও সে অবকাশ বারবার কাজে লাগিয়েছেন। সুতরাং বিরোধী ঐক্যের প্রচেষ্টাকে কটাক্ষ করে মোদী অনৈতিক কাজ করেছেন, এমনটা বলা যাবে না। কিন্তু মোদী নিজের ছক নিজেই ভেঙেছেন কিছুটা। গত সাড়ে চার বছর ধরে মূলত সরকারের ‘সাফল্যের’ প্রচারকেই রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার করছিলেন যে নরেন্দ্র মোদী, তিনি এখন আর শুধু মাত্র ওই প্রচারের উপরে ভরসা রাখতে পারছেন না। সংসদে হোক বা সংসদের বাইরে যে কোনও অবকাশেই এখন বিরোধীশিবিরকে তীক্ষ্ণ আক্রমণে বিঁধতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদী।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

আত্মবিশ্বাস কি টাল খেল একটু?‘বিকাশ’-কে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখার বিষয়ে আর কি অতটা আত্মবিশ্বাসী নয় বিজেপি? সেই কারণেই কি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়ছে?

আরও পড়ুন: চৌকিদারকে ধমকাচ্ছে চোর! লোকসভায় বিরোধী ঐক্যকে তীব্র কটাক্ষ মোদীর

১৯ জানুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে যে জনসভার ডাক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছিলেন, সেই জনসভার মঞ্চ বুঝিয়ে দিয়েছিল—নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার পথ অনেকখানি প্রশস্ত হয়ে গিয়েছে।তার পর কলকাতা পুলিশ এবং সিবিআইকে কেন্দ্র করে ঘটনাপ্রবাহ যেদিকে গড়াল, তাতে বিরোধী ঐক্য আরও অনেক বেশি মজবুত হল। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ধর্নায় বসেছিলেন, তখন দেশের প্রায় সবক’টি বিরোধী দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন জানিয়েছে, পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে, যৌথভাবে মোকাবিলার অঙ্গীকার করেছে। তেজস্বী যাদব, কানিমোঝি, চন্দ্রবাবু নায়ডুরা ধর্না মঞ্চে হাজির হয়ে গিয়েছেন। বিরোধীদের মধ্যে মজবুত ঐক্যের বাতাবরণ শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্না মঞ্চ থেকে প্রতিভাত হয়েছে, এমন নয়। গত মাসখানেকে কখনও মায়াবতীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন অখিলেশ যাদব, কখনও চন্দ্রবাবু নায়ডুর পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন দেবগৌড়া, কখনও অরবিন্দ কেজরীবালের হয়ে সওয়াল করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনও যৌথ লড়াইয়ের বার্তা শুনিয়েছেন শরদ পওয়ার বা স্ট্যালিন বা ফারুক আবদুল্লা বা শরদ যাদব। অতএব, বিরোধী শিবিরে ঐক্যের মরিয়া প্রয়াসটা আর কারও অগোচরে নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাপথে যে নেতারা কখনও পরস্পরের পাশে দাঁড়াননি, আজ তাঁরা যে ভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাতে শাসকের উপর চাপ বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। আত্মবিশ্বাস টলে যাওয়ায়ও স্বাভাবিক।

বাংলায় মোদী: প্রধানমন্ত্রী কে কতটা চেনেন? খেলুন কুইজ

বিরোধী শিবিরকে বা বিরোধী শিবিরের ঐক্য প্রচেষ্টাকে সম্প্রতি বারবার আক্রমণ করছেন নরেন্দ্র মোদী।শুধু নরেন্দ্র মোদী নন, কখনও অমিত শাহ, কখনও রাজনাথ সিংহ, কখনও অরুণ জেটলি, কখনও যোগী আদিত্যনাথ—একের পর এক গৈরিক মহারথী বিরোধী ঐক্যকে কটাক্ষের বাণে জর্জরিত করার চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবারও সেই দৃশ্যই দেখা গিয়েছে। দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী বলেছেন—মহাজোট নয়, মহাভেজাল। কলকাতায় শিবরাজ সিংহ চৌহান বলেছেন—মহাগঠবন্ধন নয়, মহাঠগবন্ধন। দেওয়ালের লিখনটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে অতএব।বিরোধী শিবিরে এই বিরল ঐক্যের বাতাবরণকে আর হালকাভাবে নেওয়ার অবস্থায় নেই শাসক। বিরোধীদের প্রাথমিক সাফল্য এখানেই। এই সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বিরোধীরা, না কি আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন শাসক, সে প্রশ্নের উত্তর দেবে বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র। কিন্তু বর্তমান সন্ধিক্ষণে স্পষ্ট উপলব্ধি হয়—যুদ্ধ আর এক তরফা নয়।