Advertisement
E-Paper

মেয়েরা ঘরেই, আজও

শ্রমশক্তিতে যোগদান কেন দরকার? প্রথমত, শ্রমশক্তিতে যোগদান মহিলাদের সাংসারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত-গ্রহণ ও দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ভারতের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, যে মহিলারা চাকরি করেন (অথবা যাঁরা নিজস্ব ব্যবসায় যুক্ত), শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে পারিবারিক বিষয়ে তাঁদের মতের মূল্য অন্য মহিলাদের থেকে বেশি, এবং তাঁদের ওপর পারিবারিক হিংসার অনুপাত কম।

পুনরজিৎ রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:০০

ভারতে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। ২০১৭ সালের হিসেবে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্র মিলিয়ে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে কেবল ২৭% কর্মরত ছিলেন বা সক্রিয় ভাবে কাজের সন্ধান করছিলেন, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের গড় হারের প্রায় অর্ধেক। ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বয়সের নিরিখে কর্মোপযোগী ভারতীয় মহিলাদের সংখ্যা প্রায় ৪৭ কোটি বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ ওই সময়েই প্রায় ২ কোটি ভারতীয় মহিলা শ্রমশক্তি থেকে অন্তর্হিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হারের নিরিখে ১৩১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১২১-এ এবং জি-২০ ফোরামের অন্তর্গত দেশগুলির মধ্যে, সৌদি আরবকে বাদ দিলে, একেবারে শেষে। ভারতে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার তলানিতে ঠেকার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়েছে ভারতীয় অর্থনীতি বিষয়ক দু’টি সাম্প্রতিক রিপোর্টে। প্রথমটি রঘুরাম রাজন, গীতা গোপীনাথ-সহ তেরো জন অর্থনীতিবিদ রচিত ‘অ্যান ইকনমিক স্ট্র্যাটেজি ফর ইন্ডিয়া’, দ্বিতীয়টি নীতি আয়োগের ‘স্ট্র্যাটেজি ফর নিউ ইন্ডিয়া @ ৭৫’। এই দু’টি রিপোর্টই দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলছে, মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার বৃদ্ধি করা আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

শ্রমশক্তিতে যোগদান কেন দরকার? প্রথমত, শ্রমশক্তিতে যোগদান মহিলাদের সাংসারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত-গ্রহণ ও দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ভারতের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, যে মহিলারা চাকরি করেন (অথবা যাঁরা নিজস্ব ব্যবসায় যুক্ত), শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে পারিবারিক বিষয়ে তাঁদের মতের মূল্য অন্য মহিলাদের থেকে বেশি, এবং তাঁদের ওপর পারিবারিক হিংসার অনুপাত কম। গবেষণায় এটাও দেখা যাচ্ছে, যে মহিলারা শ্রমশক্তির অংশ, তাঁরা ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে তুলনায় বেশি বিনিয়োগ করেন। মহিলাদের বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করার এই প্রত্যক্ষ প্রভাবগুলি ছাড়া কিছু পরোক্ষ প্রভাবও আছে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে মহিলাদের বোন বা দিদিরা কর্মরত, তাঁদের বিয়ের বয়সও তুলনায় বেশি। যে হেতু অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার ফলে আমাদের দেশে মহিলারা অনেক সময়ই তাঁদের স্কুল শিক্ষাটুকুও সম্পূর্ণ করতে পারেন না, মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের এই পরোক্ষ প্রভাবটি অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।

গোটা অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতেও মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার বৃদ্ধির তাৎপর্য অনেক। ভারতে এখন পুরুষদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার ৭৯%, মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের হিসাব অনুযায়ী, দু’টি হার যদি সমান হত, তা হলে দেশের জাতীয় আয় প্রায় ২৭% বেশি হত।

ঠিক কী কারণে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার কমছে? অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, ভারতের মতো দেশে, যেখানে গত এক দশকে জাতীয় আয় বৃদ্ধির গড় হার ছিল ৭-৮%, সেখানে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার কমেছে একেবারেই অর্থনীতির নিয়মানুসারে। ব্যাখাটি হল এই রকম: পারিবারিক আয় বৃদ্ধির ফলে, বহু ভারতীয় মহিলারই শ্রমশক্তিতে যোগ দিয়ে আয় করে পরিবারকে সাহায্য করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে এবং তাই তাঁরা শ্রমশক্তি থেকে অন্তর্হিত হয়েছেন সংসারে মনোনিবেশ করবেন বলে।

তত্ত্বগত ভাবে ব্যাখ্যাটি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্যভিত্তিক গবেষণায় এর সপক্ষে খুব একটা জোরদার প্রমাণ মিলছে না। প্রসঙ্গত, গত দুই দশকে ভারতে মহিলাদের সন্তান প্রজননের হার বিপুল হারে হ্রাস পেয়েছে। আর, ভারতীয় মহিলাদের স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ করার হারও রীতিমতো বেড়েছে। অর্থনীতির নিয়মে, দু’টি প্রবণতার ফলেই মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। সুতরাং, সব মিলিয়ে দেখলে, গত দুই দশকে ভারতে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার হ্রাস পাওয়ার কথা ছিল না মোটেই। তা হলে কেন তা হ্রাস পাচ্ছে?

এর অন্যতম কারণ অবশ্যই ভারতীয় সমাজে জাঁকিয়ে বসা পিতৃতন্ত্রের রক্তচক্ষু এবং নারীকে কেবল পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক ও শুশ্রূষাকারী হিসেবে দেখার প্রবণতা। বিবাহিত ভারতীয় মহিলাদের অধিকাংশকেই সংসারের কাজকর্মকে অগ্রাধিকার দিতে হয়, যা অনেক সময়ই তাঁদের বাইরে গিয়ে কাজ করার পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বহু ক্ষেত্রেই পরিবারের তীব্র অসহযোগিতা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানে অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাইরে কাজ করার ব্যাপারে মহিলাদের নিজস্ব ইচ্ছে-অনিচ্ছের মূল্য ভারতীয় সমাজে যৎসামান্য, অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অন্যদের থেকে। (বস্তুত, ইন্ডিয়ান হিউমান ডেভেলপমেন্ট সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্যই ৭২% মহিলাকে স্বামীর অনুমতি নিতে হয় এবং পাড়ার মুদির দোকানে যাওয়ার জন্য অনুমতি নিতে হয় ৬০% মহিলাকে!) এবং বেশির ভাগ সময়ই সেই অনুমতি মেলে না। লক্ষণীয়, বাড়ির বাইরে কাজ করা ‘অনুচিত’, এই ধারণাটা আমাদের সমাজ মহিলাদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ভ্যালু সার্ভে অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে ৪ জন ভারতীয় মহিলা মনে করেন, কর্মরত মহিলাদের সঙ্গে সন্তানদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না!

বস্তাপচা সামাজিক নিয়মনীতি বা পিতৃতন্ত্রের রক্তচক্ষু অবশ্য সমস্যার একমাত্র কারণ নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। সেটি হল মহিলাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের চূড়ান্ত অভাব। বরাবর ভারতে কর্মরত মহিলাদের অধিকাংশই কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত। কিন্তু গত দুই দশকে, ব্যাপক যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষিতে কর্মসংস্থান কমেছে বিপুল ভাবে, যার ফলে ভারতীয় মহিলাদের একটা বড় অংশ কর্মচ্যুত হয়েছেন। অবশ্যই পুরুষরাও এর ফলে কর্মচ্যুত হয়েছেন, কিন্তু যে হেতু শতাংশের হিসাবে কৃষিক্ষেত্রে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার পুরুষদের থেকে অনেকটাই বেশি, তাই যান্ত্রিকীকরণের ফল বেশি ভুগতে হয়েছে মহিলাদের।

এ ছাড়া, মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের ক্ষেত্রে কিছু আইনগত বাধাও আছে। আমাদের দেশে সমস্ত শিল্পে নারীদের কাজ করার সুযোগ নেই। মহিলারা কোন শিফটে কাজ করতে পারবেন এবং কোন শিফটে পারবেন না, তারও সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। লক্ষণীয়, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুসময়েও, এই সমস্ত নিয়মকানুন ভারতীয় মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার বাড়ানোর জন্য সরকারি স্তরে উপযুক্ত প্রকল্প গ্রহণ করাটা একান্ত জরুরি। এ রকম কয়েকটি প্রকল্পের উদাহরণ হতে পারে মহিলাদের আরও বেশি কর্মোপযোগী করে তোলার জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সংরক্ষণ, ইত্যাদি। এ রকম কিছু প্রকল্প ইতিমধ্যেই গৃহীত হয়েছে, কিন্তু সেগুলির ব্যাপক সম্প্রসারণের প্রয়োজন। পাশাপাশি, মহিলাদের কর্ম সংক্রান্ত আদ্যিকালের আইনগুলি বদলানো জরুরি।

কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সুরক্ষা জোরদার করাও অত্যন্ত জরুরি। সারা বিশ্বে মহিলারা দৈনিক কর্মক্ষেত্রে যে কী ভীষণ লাঞ্ছনার স্বীকার হন, #মি টু আন্দোলনের সূত্র ধরে সে সম্পর্কে আমরা নতুন করে ওয়াকিবহাল হয়েছি। আমাদের দেশে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদানের হার যদি বৃদ্ধি করতেই হয়, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের সুরক্ষা বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের উচিত কঠোর আইন প্রণয়ন করা।

অবশ্য, এ সবই জরুরি হলেও যথেষ্ট হবে কি না, বলা শক্ত। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করেছন এমন বহু মহিলাই পারিবারিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে শ্রমশক্তি থেকে অন্তর্হিত হয়েছেন। তাই পরিবারে মহিলাদের ভূমিকা ও মহিলাদের শ্রমশক্তিতে যোগদান সম্পর্কিত সামাজিক ধ্যানধারণার পরিবর্তন হওয়াটাও প্রয়োজন। ‘মহানগর’-এর সময়কাল তো আমরা কবেই পেরিয়ে এসেছি! এখনও ‘আরতি’দের বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করা নিয়ে যদি আমাদের ছুতমার্গ থাকে, তা হলে এই ২০১৯-এ দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে আমাদের নিজেদের লজ্জা করবে না তো?

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, ইনদওর-এ অর্থনীতির শিক্ষক

Labour Force India Women
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy