‘নেহরু ও সুভাষ’ (৮-১২) চিঠিতে শান্তনু রায় আমার চিঠির প্রসঙ্গ (‘পটেল, নেতাজি’, ২৪-১১) উল্লেখ করেছেন। আমি অবশ্য নেহরুর ‘মহানুভবতা’ বিষয়ে কিছু লিখিনি, আমি জানিও না উনি মহানুভব ছিলেন কি না। আমি শুধু এটুকুই লিখেছিলাম যে ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয় বারের জন্যে কংগ্রেস দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পটেল যে ভাবে সুভাষ-বিরোধিতা করেছিলেন, নেহরু সে ভাবে করেননি, সুভাষচন্দ্রের প্রতি জওহরলালের ব্যক্তিগত অপছন্দ ছিল বলেও মনে হয় না। নেহরু একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন বটে, সে বিবৃতিতে সুভাষের প্রচ্ছন্ন সমালোচনা ছিল সে কথাও ঠিক। কিন্তু কারও কাজ বা নীতির সমালোচনা করলেই তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত অপছন্দ প্রমাণ হয় কি না, সে বিষয়ে বিস্তর সংশয় আছে। 

বরং নেহরু যে সে সময়ে সঙ্কট মেটাতে চেয়েছিলেন, তার অনেক প্রমাণ আছে। তিনি সুভাষচন্দ্রের প্রশংসা করে কৃষ্ণ মেননকে চিঠি লিখেছিলেন, মরিয়া হয়ে গাঁধীকে অনুরোধ করেছিলেন সমস্যার সমাধানের জন্যে, শান্তিনিকেতনে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন, আরও পরে সুভাষচন্দ্রের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনার জন্যে গিয়েছিলেন জামাডোবায় (বর্তমান ঝাড়খণ্ডে), সুভাষচন্দ্রকে অনুরোধ করেছিলেন নিজের পছন্দমতো দুই সদস্যকে ওয়ার্কিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন করে ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে, এমনকী অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটিতে তিনি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগপত্র যেন গ্রহণ করা না হয়— এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা মনে হওয়ার সঙ্গত কারণ আছে যে সুভাষচন্দ্রের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অপছন্দ ছিল না। 

এ কথা ঠিক যে, নেহরুর সেই বিবৃতি সুভাষচন্দ্রের মনে প্রবল ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল এবং তিনি নেহরুকে এক চিঠিতে সেই ক্ষোভ জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কালে দুই খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ সুগত বসু (সুভাষচন্দ্রের নাতি) এবং রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায় যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ওই বিবৃতিতে সত্যি এমন কিছুই ছিল না, যা সুভাষচন্দ্রকে এতখানি ক্ষুব্ধ করতে পারে।

ঠিকই, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে নেহরুর তীব্র মতবিরোধ হয়েছিল। কিন্তু মতবিরোধ হলেই তা ব্যক্তিগত অপছন্দের পর্যায়ে পড়বে এমন ব্যাখ্যা হয়তো একটু অতিসরলীকরণ থেকে যায়। তা ছাড়া মনে রাখা উচিত, সুভাষচন্দ্র তাঁর আজ়াদ হিন্দ বাহিনীর একটি ব্রিগেড গঠন করেছিলেন জওহরলাল নেহরুর নামে। অপর পক্ষে, জওহরলালও যে ব্যারিস্টার রূপে আজ়াদ হিন্দ বাহিনীর বন্দিদের হয়ে সওয়াল করেছিলেন, তা সবার জানা। এমনকী পরবর্তী কালে সুভাষচন্দ্রের ভূমিকাকে স্বীকৃতি জানিয়ে খানিকটা অনুশোচনার সুরেই নেহরু বলেছিলেন ১৯৩৯ সালের সঙ্কটের সময়ে তাঁর আরও কিছু করা উচিত ছিল। তাই, নীতির প্রশ্নে বিরোধ থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব ছিল বলে মনে হয় না।

এ কথা অনস্বীকার্য যে গাঁধীর নেতৃত্বের প্রতি জওহরলালের আস্থা অটুট ছিল, কিন্তু তার মানেই কি তিনি সুভাষ-বিদ্বেষী ছিলেন? সে সময়ে গাঁধী ভারতবর্ষের অবিসংবাদী নেতা ছিলেন। বিশেষত ১৯৩৯ সালের সেই সঙ্কটের সময়ে দেখা গিয়েছিল জওহরলাল তো বটেই, এমনকী জাতীয় কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ, যাঁদের ওপর সুভাষচন্দ্র ভরসা করেছিলেন, তাঁরা পর্যন্ত গাঁধীর বিকল্প কাউকে ভাবতে পারেননি, জয়প্রকাশ নারায়ণ ও রামমনোহর লোহিয়ার সমসাময়িক বক্তব্য থেকে তা বোঝা যায়। তাই, এই প্রশ্নেও একা জওহরলালকেই শুধু বিদ্ধ করা যায় কি না, লাখ টাকার প্রশ্ন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জওহরলাল এ কথা বলেছিলেন বটে যে সুভাষচন্দ্র জাপানিদের সঙ্গে এ দেশে প্রবেশ করলে তিনি সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধিতে এ বিবৃতিতে জাপানের প্রতিই ক্রোধ লক্ষ করা যায়, ব্যক্তিগত ভাবে সুভাষচন্দ্রের প্রতি নয়। বিশেষ করে এই বিবৃতিতেই জওহরলাল বলেছিলেন 'Mr Bose acted very wrongly though in good faith' — অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ পরিলক্ষিত হয় না, শুধু তাঁর নীতির বিরোধিতাই চোখে পড়ে। 

হয়তো এ কথা উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না, শান্তনু রায় বাংলার যে-কবির কথা তাঁর চিঠিতে জানিয়েছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এক স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, ভারতবর্ষের উচিত ব্রিটেনের পক্ষে থাকা। সেই যুদ্ধে মিত্রশক্তির জয় কামনা করে অমিয় চক্রবর্তীকে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ এ-ও লিখেছিলেন ‘‘মানব-ইতিহাসে ফ্যাসিজ়মের নাৎসিজ়মের কলঙ্ক প্রলেপ আর সহ্য হয় না।’’ অমর্ত্য সেনও জানিয়েছেন, সুভাষচন্দ্র যখন জাপানের সাহায্য নিয়েছিলেন তখন রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) হয়তো আলাদা পথ গ্রহণ করতেন। তাই, নীতির প্রশ্নে জওহরলাল হয়তো রবীন্দ্রনাথের পথেই ছিলেন।

ইতিহাসের সব ঘটনাকে শুধুমাত্র সাদা-কালোর রঙে বিচার করা সব সময়ে লাভজনক নয়। সুভাষচন্দ্র ও জওহরলাল দু’জনেই নিজেদের বিশ্বাসমতো দেশের কাজে নিজেদের নিয়োগ করেছিলেন। উভয়ের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছিল মানেই সুভাষচন্দ্রের প্রতি জওহরলালের ব্যক্তিগত অপছন্দ ছিল— এমন ব্যাখ্যা ঠিক নাও হতে পারে। 

সন্দীপন সেন

কলকাতা-৫

 

ভণ্ডামি

‘নেতাজি ও সঙ্ঘ’ (১১-১২) চিঠিতে পত্রলেখক আহ্বান জানিয়েছেন, আজ়াদ হিন্দ সরকারের ৭৫তম বর্ষপূর্তিকে স্বীকৃতি জানিয়ে মোদী সরকারের লাল কেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জন্য সব বাঙালি যেন মোদী সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। এই অবকাশে নেতাজির সঙ্গে সঙ্ঘ পরিবারের সম্পর্কটি একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক।

ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল সমগ্র দেশ। দেশবন্ধু, সুভাষ-সহ হাজার হাজার সত্যাগ্রহী ব্রিটিশদের হাতে বন্দি। এই গণসংগ্রামে ডা. হেডগেওয়ার দেখলেন ‘অশুভ শক্তির জয়গান’। তাঁর মতে, ‘‘মহাত্মা গাঁধীর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে অশুভ শক্তিগুলি সমাজ জীবনে বিপজ্জনক ভাবে মাথা চাড়া দিচ্ছিল।’’

স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে আর এস এস-এর পরিচালক গোলওয়ালকরের মন্তব্য ছিল, ‘‘ব্রিটিশ বিরোধিতাকে ভাবা হচ্ছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সমার্থক। এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি দেশের সাধারণ মানুষের উপর বিনাশকারী প্রভাব ফেলেছিল।’’ স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল ভাবার কারণেই আরএসএস দেশকে স্বাধীন করার কোনও কর্মসূচিতেই ছিল না। তা সে ভারত ছাড়ো আন্দোলনই হোক, বা ১৯৪৫ সালে আজ়াদ হিন্দ ফৌজের অফিসারদের বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনই হোক। আর এস এসের এই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ইংরেজদের খুশি করেছিল, বলা বাহুল্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার যখন নতুন সশস্ত্র ব্যাটেলিয়ন তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সাভারকরের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা এই প্রচেষ্টাকে সফল করতে দেশের নানা প্রান্তে সহায়ক কেন্দ্র খুলেছিল, যাতে হিন্দু যুবকেরা সহজেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে পারে।

সুভাষের নেতৃত্বে আজ়াদ হিন্দ ফৌজ যখন তুমুল লড়াই করছে, সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করলেন, ‘‘বঙ্গদেশকে রক্ষা করিবার জন্য একটি গৃহবাহিনী গঠনের অধিকার আমাদের দেওয়া হউক’’ (রমেশ মজুমদারের গ্রন্থে শ্যামাপ্রসাদের পত্র থেকে উদ্ধৃত)। শ্যামাপ্রসাদ সে দিন সুভাষের পাশে না থেকে ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়েছিলেন।

আজ সেই শ্যামাপ্রসাদ, হেডগেওয়ার, সাভারকর, গোলওয়ালকরদেরই উত্তরসূরিরা আজ়াদ হিন্দ ফৌজের ৭৫তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছেন। এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কী হতে পারে?

প্রদীপ নারায়ণ রায়

শক্তিপুর, মুর্শিদাবাদ

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।