‘কলকাতার কড়চা’য় ‘হীরক জয়ন্তী’ (৭-১) শিরোনামে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ের ষাট বছর পূর্তির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি খুব‌ই আনন্দের, কিন্তু প্রথম বাক্যটি একটু বিভ্রান্তিকর। লেখা হয়েছে: ‘‘ষাট বছর পেরোলে মানুষ ‘অশীতিপর’ হয়, প্রতিষ্ঠান নয়।’’ কিন্তু ষাট পেরোলে মানুষ কী করে অশীতিপর হবে? ‘অশীতি’ শব্দের অর্থ অষ্টদশকপরিমিতসংখ্যক। আর অশীতিপর তার‌ও পরবর্তী। ‘অশীতি’শব্দটি অতি প্রাচীন ও সংখ্যা ‍হিসেবে অত্যন্ত‍ গুরুত্বপূর্ণ। গৃৎসমদ ঋষি কোন সেই ঋগ্বেদের কালে ইন্দ্র দেবতাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন অশীতি, নবতি বা শতসংখ্যক অশ্বে বাহিত হয়ে য‌জ্ঞস্থলে সোমরস পান করে যেতে। আবার ত্রিকালজ্ঞ বশিষ্ঠ যে ঋণদান করতেন, তাতে প্রতি মাসে ‘অশীতিভাগং’ অর্থাৎ আশি ভাগের এক ভাগ সুদ হিসেবে গ্রহণ করতেন। এতে সংসার চলে যেত কিন্তু ‘লোভাদিদোষ’ পড়ত না। ঋষি মনু বিধান দিয়েছিলেন, চন্দ্রলোক প্রাপ্তির জন্য এক মাসে ‘তিস্র‌‌ঃ অশীতিঃ’ বা দুশো চল্লিশ গ্রাসের বেশি অন্ন গ্রহণ না করতে। ‘অশীতি’কে ষাটের সঙ্গে মিলিয়ে দিলে ইন্দ্রের সোমরস পান, বশিষ্ঠের সুদের অঙ্ক ও ব্রতকারীর চন্দ্রলোক প্রাপ্তির হিসেব গুলিয়ে যাবে।

কিন্তু কেন এই অ‌র্থবিভ্রান্তি? এর পিছনে সম্ভবত কেন্দ্রীয় সরকারের ‘বরিষ্ঠ নাগরিক’ অভিধা। বরিষ্ঠ শব্দটির স‌ঙ্গে জ্যেষ্ঠ শব্দটি সম্পর্কিত হলেও, ‘অশীতিপর’ বা অতিবৃদ্ধের কোনও যোগ নেই। এমনকী বৃদ্ধাবস্থার‌ও কোনও সম্পর্ক নেই। অভিধানকার হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বৃদ্ধ শব্দের অর্থ বলেছন ‘সপ্ততিবর্ষের ঊর্ধ্ববয়স্ক’। তেরো বা চোদ্দো বছর বয়সের একটি মেয়ে যেমন ষোড়শী হতে পারে না, তেমন‌ই ষাটে অশীতিপর হ‌ওয়া যায় না। ষাট বছরে আয়করের ছাড়ের হিসেব আর জীবনের হিসেব ভিন্ন।

তবে, একটি বিষয়ে করদফতর শাস্ত্রানুসারী। ভগবান বশিষ্ঠের অশীতি বা আশির রীতিতেই সেখানে ছাড়ের হিসেবনিকেশ। যেমন ৮০সি, ৮০সিসিসি, ৮০সিসিডি ইত্যাদি।

রামকুমার মুখোপাধ্যায়

কলকাতা-৬০

 

বদলি ও বদল

শাসকের অপছন্দের কাজ করলে বামফ্রন্ট আমলেও আচমকা বদলি করা হত প্রশাসকদের। তবে সেই বদলি ‘শাস্তিমূলক’ হয়ে দাঁড়াত না। কেবল এক পদ থেকে অন্য পদে সরিয়ে দেওয়া হত। তা ছাড়া জেলা স্তরের নেতারা কোনও কোনও ক্ষেত্রে কর্মচারী-আধিকারিকদের সঙ্গে অশোভন ব্যবহার করলেও, রাজ্যনেতা বা মন্ত্রীরা কখনওই অপমানজনক আচরণ করতেন না। কিন্তু বর্তমান জমানায় পরিবেশটা সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে পড়েছে। 

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, অপছন্দের অফিসারদের জব্দ করার জন্যে ‘কম্পালসরি ওয়েটিং’ নামক সাময়িক একটি প্রশাসনিক পদ্ধতিকে শাস্তির খাঁড়া হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার সঙ্গে বদলি ব্যাপারটাকে এখন ভয়াবহ রূপ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে সঠিক কাজ করে শাসক দলের বিরাগভাজন হলে, কিংবা যথাযথ মাগ্গিভাতার দাবিতে দু’চারটে স্লোগান দিলেও কলকাতা থেকে কামচাটকা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 

আর একটা অভিনব পালা রাজ্যে শুরু হয়েছে: ‘প্রশাসনিক জনসভা’। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কাঁহা কাঁহা মুলুকে এই সব সভা হচ্ছে এবং কাণ্ডটা টিভি চ্যানেলে টাটকা সম্প্রচারিত হচ্ছে। মিটিং আগের জমানাগুলোতেও হত, কিন্তু সে সবই অধিবেশন কক্ষে, এবং টিভি সম্প্রচার কেন, সেখানে সাংবাদিকরাও থাকতেন না। অফিসারদের বকাঝকা অবশ্যই শুনতে হত, কিন্তু এখনকার মতো হাটে হাঁড়ি ভাঙা গোছের তো নয়ই। তখন তো আলোচনা হত, এখন প্রায় পুরোটাই মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা, নির্দেশ প্রদান, প্রচার এবং অবশ্যই মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে বিডিও, ডিজিপি থেকে থানার বড়বাবু এবং দলের নেতা-মন্ত্রীদেরও উপদেশ-তিরস্কার-তর্জন। অনেক সময়ে ওখানেই মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সরকার, জেলাপরিষদ, পঞ্চায়েত, পুরসভার হয়ে একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করে দেন! সরকারি সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী দলের পঞ্চায়েতকে বলেন ‘ওদের পঞ্চায়েত’। ঘরে বা চায়ের দোকানে বসেই ‘উপভোগ’ করা যায় বড়সাহেব বা বাঘানেতা কেমন মুখ চুন করে বসে সব শুনছেন বা তোতলামি করে কিছু বলার চেষ্টা করে আরও বিড়ম্বনায় পড়ছেন।

প্রশাসনিক কর্তাদের এমন কাঁচুমাচু অবস্থার ফল কিন্তু রাজ্যবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। সরকারি কর্মচারীরা কখনওই জনগণের সুনজরে তেমন ছিলেন না, কেবল শিক্ষক এবং ডাক্তাররাই একটু শ্রদ্ধা ও সম্মানের দাবিদার ছিলেন। বামফ্রন্ট আমলে লাল জার্সি পেয়ে সকলেই দূরের মানুষ হয়ে পড়েছিলেন। আর এখন তো সর্বত্রই অরাজক অবস্থা। স্কুল কলেজ হাসপাতাল সব জায়গাতেই ঘেরাও-হামলা-প্রহার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকী উর্দি-শোভিত পুলিশও ঠেঙানি খাচ্ছে।

উন্নয়নের জোয়ার বইছে, কিন্তু খবরের কাগজ বা টিভি খুললেই দুর্নীতির কাহিনি। আমাদের ছাত্রজীবনে টুকলি করে পরীক্ষায় পাশ করতাম, এখন পরীক্ষায় ডামি বসিয়েই চলে যায়। আগে সরকারি কাজ করিয়ে নিতে ঘুষ দিতে হত, এখন নাকি বহু পঞ্চায়েতবাবু আগেই টাকা কেটে নেন। মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে তাঁর অনুগামীরা বিরোধীশূন্য রাজনীতির হুঙ্কার দিচ্ছেন। বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই প্রতিশ্রুতির সফল রূপায়ণও দেখেছি। এক নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। বর্তমান কমিশনার নাকের জলে-চোখের জলে একশা। জেলায় জেলায় শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ‘শুট আউট’ হচ্ছে।

এমন অবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত আমলারা কিন্তু স্পিকটি নট। ইতিহাসে পড়েছি, আইসিএস রমেশ চন্দ্র দত্ত কর্মরত অবস্থাতেই ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় স্বনামে চিঠি লিখে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যর অ্যাশলি ইডেনের শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। সেই বাঙালির হলটা কী!

বলাইচন্দ্র চক্রবর্তী

কলকাতা-৬৪

 

নিমন্ত্রণ আইন

দোলন গঙ্গোপাধ্যায় বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথি আপ্যায়ন বিধি অনুসারে...’’-র প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিখেছেন, হঠাৎ কবে যেন সে সব বন্ধ হয়ে গেল (‘আমাদের এই আদেখলেপনা’, ২২-১২)। ১৯৩৯ সালে সারা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল। তখন ব্রিটিশ সরকার খাদ্যসমস্যার মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ আইন চালু করে। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখা। দ্বিতীয়ত পোড়া মাটি নীতিতে খাদ্যদ্রব্য নষ্ট করা ও তৃতীয়ত প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে প্রভূত ফসলের হানি ঘটায় সারা দেশে যে খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছিল, তার মোকাবিলা করার জন্য সরকার খাদ্যের অপচয় বন্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছিল। ১৯৪২ সালে এই উদ্দেশ্যে ‘ভারত রক্ষা বিধান’ (ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট) চালু হয়। নিমন্ত্রণকর্তা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ৫০ জনের বেশি লোককে আমন্ত্রণ করতে পারতেন না। বর্তমানে এই আইন প্রযোজ্য নেই।

রতন চক্রবর্তী

উত্তর হাবরা, উত্তর ২৪ পরগনা

 

সমাপতন

এখন ভারতীয় দলের ফাস্ট বোলারদের দাপট দেখে নিজের স্কুলজীবনে দেখা ভারতীয় দলকে মনে পড়ছে, যখন দ্রুতগতির বোলিং একান্ত কপিলদেব নির্ভর ছিল। সেই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ও অস্ট্রেলিয়া তো বটেই, পাকিস্তানেও ইমরান ও সরফরাজ নওয়াজ়ের কাছে ভারতীয় ব্যাটিং কচুকাটা হত। তখন কি কোনও বিধাতা এ রকম মনে করেছিলেন— ‘যে দিন ভারতের আক্রমণ ফাস্ট-বোলিং নির্ভর হবে, সে দিন ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন।’ কী আশ্চর্য সমাপতন, তাই না?

সুজয় ঘোষ

খড়্গপুর

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।