‘বহিরাগত’ নিবন্ধের (রবিবাসরীয়, ২৭-৫) শুরুতে যে ‘আর্য’দের কথা বলা হয়েছে তাঁরা ছিলেন বৈদিক আর্য। ‘আর্য’ শব্দটিতে একটি জাতি না বুঝিয়ে, বিশেষ ভাষাভাষী গোষ্ঠীসমূহ বোঝানোই সমীচীন। কারণ আর্যভাষীদের মধ্যে ‘নর্ডিক’, ‘আল্পীয়’, ‘দিনারিক’ প্রভৃতি নরগোষ্ঠীর লোক দেখতে পাওয়া যায়। একদা ‘নর্ডিক’ ও ‘আল্পীয়’ এই দুই গোষ্ঠীর আর্যরা একই অঞ্চলে বসবাস করতেন (উরাল পর্বতের দক্ষিণে)। নর্ডিকদের জীবিকা ছিল পশুপালন। প্রকৃতির বিভিন্ন রূপের উপাসক ছিলেন তাঁরা। উপাস্যদের বলতেন ‘দেব’। আল্পীয়দের জীবিকা ছিল কৃষিনির্ভর। উৎপাদনশক্তি-রূপ দেবতাদের পূজা করতেন তাঁরা। উপাস্যদের বলতেন ‘অসুর’। নর্ডিক আর্যরাই বৈদিক আর্য। মনে করা হয়, এঁরা পঞ্চনদে আসার আগেই আল্পীয়রা ভারতে প্রবেশ করেন। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের কারণেই ক্রমে বাংলাদেশে উপস্থিত হন তাঁরা (বাংলার সামাজিক ইতিহাস, অতুল সুর)। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প-এ  বাংলাদেশের আর্যভাষী লোকেদের অসুর জাতিভুক্ত বলা হয়েছে।

ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ বঙ্গবাসীদের ‘বয়াংসি’ বা পক্ষীজাতীয় বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চতুর্বর্ণের ভেদ ছিল না এবং সেই জন্যই বৈদিক আর্যরা তাঁদের ঘৃণার চোখে দেখতেন। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে তাঁদের আর্যাবর্তের বাইরের লোক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত— বললেই যে প্রশ্ন ওঠে: বাংলার প্রকৃত আদিবাসী কারা? প্রাক-দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোকেরা। তাঁদের ভাষা ছিল ‘অস্ট্রিক’। তাঁদের পর আসেন দ্রাবিড়ভাষীরা, যাঁরা ক্রমশ অস্ট্রিকভাষীদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। তার পর আসেন আর্যভাষীরা, যাঁরা ইউরোপের ‘আল্পাইন’ নরগোষ্ঠীর সমতুল্য।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, কুলজি গ্রন্থগুলির দাবি অনুসারে, রাজা বল্লালসেন বাংলার ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বল্লালসেন কৌলীন্য প্রথার প্রবর্তন করেছিলেন— এর প্রমাণ কোথাও নেই। তাঁর দানসাগর ও অদ্ভুতসাগর-এ এই বিষয়ে কিছু লেখা নেই। পুত্র লক্ষ্মণসেনের রাজসভার পণ্ডিতবর্গও কোথাও এই বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেননি। তাই অনেকে মনে করেন, পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে বাঙালি কুলপঞ্জিকারগণ ব্রাহ্মণসমাজে এই প্রথা চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। রাজারাজড়ার নাম জড়িত হলে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব ও মান্যতা পাবে, এই উদ্দেশ্যেই তাঁরা এই প্রথার প্রবর্তক হিসেবে বল্লালসেনের নাম প্রচার করেন।

বাংলার রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের ৫৯টি গাঞীর কথা নিবন্ধে বলা হয়েছে। অনেকের মতে সংখ্যাটি ৫৫ কিংবা ৫২। কিন্তু কিংবদন্তি হিসাবে বল্লালসেন মাত্র পাঁচটি গাঞীকে কুলীন বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন: লাহিড়ি, বাগচি, মৈত্র, সান্যাল ও ভাদুড়ি। আসলে গুপ্তযুগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে ব্রাহ্মণরা বাংলাদেশে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন, তাঁদের বসতি-গ্রামগুলির নামই ‘গাঞী’ বলে পরিচিত। পরে এই গাঞীর নামগুলিই তাঁদের উপাধি হয়। যেমন: ভট্ট, চট্ট, বন্দ্যো ইত্যাদি। ব্রাহ্মণসমাজে ন’টি লক্ষণ দেখে কুলীনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল: আচরণ, শালীনতা, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থভ্রমণ, নিষ্ঠা, আবৃত্তি, তপস্যা ও দান। পরে এই মর্যাদাটা বংশপরম্পরায় পর্যবসিত হয়ে যায়।

রাহুল বড়ুয়া কলকাতা-৭৪

‘গেঁয়ো যোগী...’

বঙ্গজ রুদ্রজ ব্রাহ্মণদের পৃথক ইতিহাস রয়েছে। যাঁরা আজ ‘ওবিসি’ বলে গণ্য। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুযায়ী, বিধাতার মানস হতে ব্রহ্মতেজোময় চারটি পঞ্চবর্ষীয় শিশুতুল্য পুত্র: সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার আবির্ভূত হন। এর পর বিধাতার মুখ হতে স্বায়ম্ভূব মনু ও পত্নী শতরূপা আবির্ভূত হন। বিধাতা প্রত্যেককে সৃষ্টিকাজে রত হতে বললে মনু ব্যতীত অপর চার পুত্র তা অগ্রাহ্য করেন, ফলে ক্রোধোন্মত্ত পিতার ব্রহ্মতেজ ললাট থেকে নির্গত হয় এবং তা থেকেই একাদশ রুদ্রের আবির্ভাব। এর মধ্যে প্রধান মহানরুদ্র বা মহারুদ্র থেকে রুদ্রজ ব্রাহ্মণগণের উৎপত্তি। ‘আগম-সংহিতা’র বক্তব্য, মহান রুদ্রের পুত্র বিন্দুনাথ। এঁর সঙ্গে বিবাহ হয় কশ্যপকন্যা কৃষ্ণার। জন্ম নেন আদিনাথ (আইনাথ)। ইনিই রুদ্রকুলের প্রকাশক। আবার চন্দ্রাদিত্যপরমাগমের ব্যাখ্যা, সত্যযুগে সুধন্য রাজার কন্যা সূর্যবতী মহাদেবকে পতিরূপে কামনা করলে তাঁর গর্ভে যোগনাথ জন্ম নেন। এ থেকেই ‘যোগী’ কথার উৎপত্তি। তিনি মহাদেবের নিকট যোগধর্মে দীক্ষিত হন। কশ্যপের সুরতী নামক কন্যাকে বিবাহ করেন যোগনাথ এবং ষোলোটি পুত্র জন্মে: আদিনাথ, মীননাথ, কপিলনাথ ইত্যাদি।

গোপাল ভট্টের বল্লাল চরিত থেকে জানা যায়, পিতৃশ্রাদ্ধে দানগ্রহণের জন্য বল্লাল যোগীদের অনুরোধ করেন, কিন্তু যোগীরা ধর্মহানির ভয়ে সে দান গ্রহণ করেননি। বল্লাল প্রতিজ্ঞা করেন, তিনি যদি যোগীদের বিনাশ না করেন, তবে যেন তাঁর গো-ব্রাহ্মণ-স্ত্রী হত্যাজনিত পাপ বর্তায়। তিনি যোগীদের পৌরোহিত্য, যজন-যাজন এবং যজ্ঞোপবীত ধারণের অসারতা প্রমাণের জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করেন। পরে কিছুটা নিজস্ব অজ্ঞানতা ও সামাজিক ও কুলীনদের প্রভাবে এঁরা সমাজে ‘হীন’ বলে আখ্যায়িত হন। শিক্ষা ও পেশার দিক থেকে অনগ্রসর বলেই এঁরা আজকে ‘ওবিসি’। কৌলীন্যের বাড়বাড়ন্তে সে দিন রুদ্রজদের সঙ্গে বঙ্গজ বহু ব্রাহ্মণই সম্মান হারিয়েছিলেন। রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বহিরাগতের স্থান সমাজে বহু গুণ বৃদ্ধি পায়, আর স্থানীয়রা পড়ে থাকেন রসাতলে!

অঙ্কুশ দেবনাথ  কলকাতা-৮১

 

প্রতিরোধ

বহিরাগত আর্য আক্রমণ প্রতিরোধের কথা ১৮৯১ সালে বাংলার জনগণনা রিপোর্টে পাই। আইসিএস অফিসার সি জে ও’ডনেল এক সাঙ্কেতিক উক্তি করেছেন, "...it is certain that the tall, large-limbed Chandal... was the active and successful enemy of the Aryan invader... The Brahmans used the name of Chandal to express everything that was vilest..." বহিরাগতদের আক্রমণ ব্যর্থ করে তাঁরা আর্য, বিশেষ করে ব্রাহ্মণের ঘৃণার পাত্র হয়েছিলেন। বিদেশি শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা উজ্জ্বলতম দেশপ্রেম; কিন্ত দেশের জন্য সংগ্রাম ও জীবনবলিদান করেও চণ্ডালের পরিচিতি: vilest! চণ্ডালনিন্দা উন্মত্ততার স্তরে না পৌঁছলে হিন্দুদের শাস্ত্রচর্চা অপূর্ণ।

সমুদ্রগর্ভ থেকে যখন খুলনা জেলা জেগে উঠেছিল, সেই নতুন ভূভাগের প্রথম অভিযাত্রী ও অধিবাসী ছিলেন পোদ ও নমঃশূদ্র। এ তথ্য জানিয়ে বঙ্গীয় সরকারের আইসিএস অফিসার আর ফকাস খুলনা জেলার সার্ভে এবং সেট্লমেন্ট রিপোর্টে লেখেন: "As the deltaic area which is now Khulna district rose out of the sea, the first persons to penetrate its swampy forests were undoubtedly the pre-Aryan hunters and fishers... These tribes are now represented by the Pods and Namasudras... The term Namasudra is an euphemism for the detested Chandals who were held in lowest estimation of all the aboriginal tribes of Bengal by the invading Aryans..." চণ্ডাল ও পোদদের নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের কীর্তি কিন্তু ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে।

নোয়াখালি জেলাও সমুদ্রবক্ষ থেকে উত্থিত হলে সেখানকার প্রথম অভিযাত্রী ছিলেন নমঃশূদ্র। এ তথ্য বঙ্গীয় সরকারের আর এক আইসিএস অফিসারের লেখায় পাই। জে ই ওয়েবস্টারস লিখেছিলেন, "Youngest among all the districts in the Ganges delta Noakhali has really no ancient history. ... there are no records to tell us who and what manner of men they were who first settled in it and reclaimed the jungles. Possibly they were the progenitors of the present Namasudras or Chandals, a Lohitik or Mongoloid race..." অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাস

অবসরপ্রাপ্ত আইএএস ও প্রাক্তন উপাচার্য, মুজফ্‌ফরপুর, বিহার

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়