অন্য দৃষ্টিকোণ

অর্ঘ্য মান্না লিখিত ‘মেঘনাথ থেকে মেঘনাদ’ (পত্রিকা, ৩-১১) শীর্ষক প্রতিবেদনটি সম্পর্কে কিছু বলার আছে। আমার বাবা মেঘনাদ সাহা বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন ঠিকই, তবে ড. অনন্ত দাশের বাড়িতে যখন অাশ্রিত হিসাবে পড়াশোনা চালিয়েছিলেন, তখন সে রকম কিছু ঘটেনি। ড. দাশ বাবাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। পরবর্তী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, ড. দাশকে আদর্শ রেখে, বাবা নিজের বাড়িতেও অনেক পড়ুয়াকে ঠাঁই দিয়েছিলেন। মা’কে লেখা একটি চিঠিতে এই কথা বলেছেন। ড. দাশের পরিবারে সবাইকেই নিজের বাসন নিজে মাজতে হত, শুধু আশ্রিতদের নয়।
আমরা ইলাহাবাদ থেকে কলকাতায় আসার পর, ড. দাশের ছেলের আমাদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল এবং তিনি আমার দিদিকে বাংলা ভাষার শিক্ষা দিতেন। আসলে এই অতিনাটকীয় (ও বহুচর্চিত) গল্পটি আমার বাবার মৃত্যুর পরে চালু হয় এবং সে সব পড়ে আমার মা খুবই ব্যথিত হতেন।
অর্ঘ্যবাবু যে দৃষ্টিকোণ থেকে বাবাকে দেখেছেন, তার সঙ্গে আমি একমত নই। বাবার সব কাজের পিছনে বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতার চেয়েও বড় কারণ ছিল ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকারের বিরোধিতা। যে কারণে বাবা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগ দেন। ঢাকা অনুশীলন সমিতির সভ্য হয়ে পুলিন দাশের মতো বিপ্লবীর কাছে লাঠিখেলা, ছোরাখেলা শেখেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন ১১০ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের মেসবাড়িতে জ্ঞান ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নীলরতন ধরের সঙ্গে থাকতেন এবং বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের (বাঘা যতীন) সংস্পর্শে এসেছিলেন। পুলিশের খাতায় নাম উঠে যাওয়ায়, বাবাকে ইন্ডিয়ান ফিনানশিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়নি এবং তখনই বিজ্ঞানের আঙিনায় প্রবেশ। এর পর সার্থক গবেষণা করে ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান জগতের সঙ্গে যুদ্ধ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছিলেন। হেনরি নরিস রাসেল-এর সঙ্গে তাঁর পত্রবিনিময়ে এই দ্বন্দ্বের কথা জানা যায়। 
চিত্রা রায় 
কলকাতা-১৯

 

সেই বিতর্ক

মেঘনাদ সাহা বিষয়ক লেখাটির সঙ্গে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় সংযোজন করতে চাই। 
সে সময়ে বহুচর্চিত ড. মেঘনাদ সাহা ও অনিলবরণ রায় বিতর্ক, যার সূত্রপাত ১৯৩৯ সালে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে। 
‘এক নতুন জীবনদর্শন’ শীর্ষক এই প্রবন্ধটিতে অধ্যাপক সাহা ভারতবর্ষের তৎকালীন সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা শিল্পের বিকাশ, বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার ভূমিকা ইত্যাদি নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক রচনা লিখেছিলেন। ভারতের তথা প্রাচ্যের ধর্মমূলক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনার প্রাধান্য কী ভাবে আধুনিক শিল্প স্থাপন ও বিকাশের অন্তরায় হয়েছে, তার কিছু উদাহরণ সেখানে ছিল। অধুনা পুদুচেরির অরবিন্দ আশ্রমের তৎকালীন সম্পাদক অনিলবরণ রায় প্রবন্ধটির সমালোচনা করে একটি রচনা লেখেন, যা ‘ভারতবর্ষ’-এ  প্রকাশিত হয়। সেই সমালোচনায় ড. সাহার বক্তব্যের কিছু উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি, অনিলবরণ ‘‘লব্ধপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ড. মেঘনাদ সাহা’’-র হিন্দু ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মেঘনাদ সাহা এর একটি দীর্ঘ উত্তর দেন, যা ‘সমালোচনার উত্তর’ শিরোনামে মোট চার কিস্তিতে ‘ভারতবর্ষ’-এ প্রকাশিত হয়। সৃষ্টি হয় ‘‘সব ব্যাদে আছে’’ বিতর্ক। যার উত্তর আবার অনিলবরণ রায়ের তরফে এম এম দত্ত দেন; যার সর্বশেষ জবাব মেঘনাদ সাহা ভারতবর্ষের পাতায় প্রকাশিত করেন। ১৯৩৯-৪০ সালে এই বিতর্ক সংক্রান্ত ড. সাহার রচনাগুলি তাঁর অনন্যসাধারণ প্রজ্ঞা, হিন্দুশাস্ত্র ও বৈদিক সাহিত্যে তাঁর প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তির নিদর্শন।
‘সমালোচনার উত্তর’-এর দ্বিতীয় রচনায় অধ্যাপক সাহা বলছেন, “অনেক পাঠক আমার প্রথম প্রবন্ধে ‘সব ব্যাদে আছে’ এইরূপ লিখায় একটু অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। অনেকে ধরিয়া লইয়াছেন যে আমি ‘বেদের’ প্রতি অযথা অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়াছি। কিন্তু এই ধারণা ঠিক নয়। এই বাক্যটির প্রয়োগ সম্বন্ধে একটু ব্যক্তিগত ইতিহাস আছে। প্রায় ১৮ বৎসর পূর্বেকার কথা, আমি তখন প্রথম বিলাত হইতে ফিরিয়াছি। বৈজ্ঞানিক জগতে তখন আমার সামান্য কিছু সুনাম হইয়াছে। ঢাকা শহরনিবাসী (অর্থাৎ আমার স্বদেশবাসী) কোন লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল আমি কি বৈজ্ঞানিক কাজ করিয়াছি জানিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমি প্রথম জীবনের উৎসাহভরে তাঁহাকে আমার তদানীন্তন গবেষণা সম্বন্ধে (অর্থাৎ সূর্য ও নক্ষত্রাদির প্রাকৃতিক অবস্থা যাহা Theory of Ionisation of Elements দিয়া সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায়) সবিশেষ বর্ণনা দেই। তিনি দুই-এক মিনিট পর পরই বলিয়া উঠিতে লাগিলেন, “এ আর নূতন কি হইল, এ সমস্তই ব্যাদে আছে।” আমি দুই-একবার মৃদু আপত্তি করিবার পর বলিলাম, ‘‘মহাশয়, এসব তত্ত্ব বেদের কোন অংশে আছে, অনুগ্রহপূর্বক দেখাইয়া দিবেন কি?’’ তিনি বলিলেন, “আমি তো কখনও ‘ব্যাদ’ পড়ি নাই, কিন্তু আমার বিশ্বাস, তোমরা নূতন বিজ্ঞানে যাহা করিয়াছ বলিয়া দাবী কর সমস্তই ‘ব্যাদে’ আছে।” অথচ এই ভদ্রলোক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন।
বলা বাহুল্য যে, বিগত কুড়ি বৎসরে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদি সমস্ত হিন্দুশাস্ত্র এবং হিন্দু জ্যোতিষ ও অপরাপর বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রাচীন গ্রন্থাদি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া আমি কথাও আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই নাই যে, এই সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থে বর্তমান বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব নিহিত আছে। সকল প্রাচীন সভ্যদেশের পণ্ডিতগণই বিশ্বজগতে পৃথিবীর স্থান, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহাদির গতি, রসায়ন বিদ্যা, প্রাণী বিদ্যা ইত্যাদি সম্বন্ধে নানারূপ কথা বলিয়া গিয়াছেন, 
কিন্তু তাহা সত্ত্বেও বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান বিজ্ঞান গত তিনশত বৎসরের মধ্যে ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের সমবেত গবেষণা, বিচারশক্তি ও অধ্যাবসায় প্রসূত।” 
আজ যখন দেশ জুড়ে হিন্দু ধর্মের মেকি পুনরুত্থানের যুগে ধর্ম, শাস্ত্র, মিথ, ইতিহাস সব কিছুই তথাকথিত বিশ্বাসের অজুহাতে ঘুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তখন ড. সাহার যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া খুবই জরুরি।
অর্ণব সেনগুপ্ত
কলকাতা– ৩২

 

জাতিভেদ

মেঘনাদ সাহা ছেলেবেলায় সরস্বতী পুজোর দিন অঞ্জলি দেবেন বলে খুব ভোরবেলা থেকে লাইনের প্রথমে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পুরোহিত তাঁকে পিছনে সরিয়ে দিয়ে উঁচু বর্ণের ছেলেদের আগে অঞ্জলি দিতে বললেন। অপমানিত মেঘনাদ চোখের জল মুছে সেই যে বেরিয়ে এসেছিলেন, তার পর আর কখনও সরস্বতী দেবীর শরণাপন্ন হননি। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে থাকতে গেলেন হিন্দু হস্টেলে। এখানেও জাতিভেদের হাত থেকে রেহাই পেলেন না। হস্টেলে মেঘনাদ আরও অনেকের সঙ্গে খেতে বসেছেন। কিছু আবাসিক তাঁর সঙ্গে খাওয়ার ঘরে এক সারিতে বসে খেতে রাজি নন। সহপাঠী ও আবাসিক জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ও নীলরতন ধর এমন আচরণের তীব্র আপত্তি করলেন এবং তিন জন হস্টেল ছেড়ে অন্যত্র থাকলেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ ১৩ নভেম্বর শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণে মেঘনাদ এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‘হিন্দুর সৃষ্টিকর্তা এক জন দার্শনিক। তিনি ধ্যানে বসিয়া প্রত্যক্ষ জগৎ, স্থাবর ও জঙ্গম জীব এবং ধর্মশাস্ত্রাদি সমস্তই সৃষ্টি করিয়াছেন। সেই জন্য যাহারা মাথা খাটায়, অলস দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনায় সময় নষ্ট করে এবং নানারূপ রহস্যের কুহেলিকা সৃষ্টি করে, হিন্দু সমাজে তাহাদিগকে খুব বড় স্থান দেওয়া হইয়াছে। শিল্পী, কারিগর ও স্থপতির স্থান এই সমাজের অতি নিম্ন স্তরে এবং হিন্দু সমাজের হস্ত ও মস্তিষ্কের পরস্পর কোন যোগাযোগ নেই।’’
বিমল কুমার শীট
বেলদা, পশ্চিম মেদিনীপুর