ইংরেজির দাস

‘ছি!’(৬-৫) শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে এই পত্র। নাম না করে শ্রদ্ধেয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে বিদ্রুপ করে মার্ক্সবাদী বা ‘খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ’-এর নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র নিজের নাক-উঁচু ‘এলিটিস্ট’ মনোভাবেরই পরিচয় দিলেন! অবশ্য এই ‘ইংরেজি উন্নাসিকতা’ (‘জাতীয়তাবাদী’ বাঙালি এখন অবশ্য ‘হিন্দি উন্নাসিক’ও হয়ে উঠেছে, ‘রাজভাষা’ বলে কথা!) বাঙালির বহু যুগের ব্যাধি, আর দিনের শেষে মিশ্রবাবুও তো সেই পরকে অনুকরণ করা ‘বাঙালি’ জাতিরই একনিষ্ঠ সদস্য!

যে হেতু বাঙালিরা নিজেদের বাঙালিত্ব সম্বন্ধে অতিশয় লজ্জিত, সে কারণেই নিজেদের মাতৃভাষা বাংলাকে তারা নিকৃষ্ট জ্ঞান করে, আর অতি গর্বের সঙ্গে ইংরেজি ও হিন্দির দাসত্ব করে ধন্য হয়ে থাকে! সে কারণেই যারা শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলে, কিংবা সামান্য বিকৃত উচ্চারণে ইংরেজি/হিন্দি বলে; তাদের স্বজাতি বাঙালি ‘গেঁয়ো অশিক্ষিত’ রূপে গণ্য করে!

বাঙালি শুধুমাত্র তাদের ‘আধুনিক শিক্ষিত’ আখ্যায় ভূষিত করে, যারা Queen's English বা Bhaiya's Hindi-তে এক্কেবারে চোস্ত! সে কারণেই বাঙালি হয়েও ও বাংলারই ঘাটাল থেকে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েও, কী অনায়াসেই বিজেপির ভারতী প্রতিদ্বন্দ্বী দেব-কে ছি-ছি করেন, সংসদ ভবনে বিহার বা ব্রিটেনের ভাষা ব্যবহার না করে ‘তুচ্ছ’ বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার অপরাধে!

মিশ্রবাবুর টুইটটিকে সেই আত্মঘাতী বাঙালির আলো দিয়েই বিচার করতে হবে! কেন মমতা দেবী ‘রানি’র মতোs ইংরেজি বলবেন না! তাতে তো নিঃসন্দেহেই প্রমাণিত হয়ে যায় যে তিনি ‘অশিক্ষিত’। আর ‘কসমোপলিটান’ ‘West Bengal’-এর মুখ্যমন্ত্রী বা বৈচিত্রময় ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী রূপে কাজ করার যোগ্যতা তাঁর নেই!

মজার কথা, নরেন্দ্র মোদীরা যখন পশ্চিমবঙ্গ, তামাম ভারতবর্ষ বা সমগ্র বিশ্বে বুক ফুলিয়ে বিহার-উত্তর প্রদেশের ভাষায় বক্তৃতা দেন, বা নিখুঁত ব্রিটিশ উচ্চারণের পরিবর্তে হিন্দি/গুজরাতি উচ্চারণে বিকৃত ইংরেজি বলেন; তখন কিন্তু মিশ্রবাবু বা শ্রীমতী ঘোষদের ক্ষমতা হয় না তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে!

কিংবা বাংলা না জানা, বা বিকৃত উচ্চারণে বাংলা বলা কোনও হিন্দি/ইংরেজিভাষীকে উপহাস করার স্পর্ধা কেউ প্রদর্শন করতে পারেন না! 

মিশ্রবাবুরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, বাঙালি জাতি কী ভাবে স্বেচ্ছায় হিন্দি/ইংরেজির দাসে পরিণত হয়েছে!

কাজল চট্টোপাধ্যায়

সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

 

লোকসংস্কৃতি

 লোকসংস্কৃতি লোকজনের সংস্কৃতি, সাধারণের সংস্কৃতি। আমাদের রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ‘লোকসংস্কৃতি’ বিষয়টির প্রবেশ ১৯৯০ সালে। তৎকালীন যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায়, রাজ্যে একমাত্র কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকসংস্কৃতি বিষয়ে স্বতন্ত্র বিভাগ চালু হয়। এখানে লোকসংস্কৃতি বিষয়ে এমএ, এম ফিল, পিএইচ ডি এবং ডি লিট করার সুযোগ আছে। ইউজিসি এই বিভাগকে অনন্য (‘ইউনিক’) বলেও চিহ্নিত করেছে। স্কুল সার্ভিস কমিশন, বাংলা অনার্স পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের লোকসংস্কৃতিতে এমএ থাকলে, সেই ডিগ্রিকে বাংলায় এমএ ডিগ্রির সমতুল্য বলে মেনে নিয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশেষ পত্র হিসাবে লোকসংস্কৃতি পড়ায়। সম্প্রতি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘ইকুইভ্যালেন্স কমিটি’ গড়ে লোকসংস্কৃতি বিভাগে যে সব ছাত্রছাত্রী এম ফিল ও পিএইচ ডি করবেন, তাঁদের কলা বিভাগের অন্য বিষয়ের মতোই সমমর্যাদা দান করেছে। কিন্তু এই বিভাগের ইউজিসি নেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও, বিষয়টি কলেজে না থাকায় তাঁদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। ফলে বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে পড়ার চাহিদা নেই বললেই চলে। বিষয়টিকে স্কুলে আবশ্যিক বিষয় হিসাবে, কলেজে অনার্স ও পাস কোর্সে চালু করা প্রয়োজনীয়। বাংলা, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা হলেও, এই রাজ্যে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে স্বতন্ত্র বিভাগ নেই। ফলে এই বিভাগের পড়ুয়া অন্য রাজ্যের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে লোকসংস্কৃতির কদর অনেক বেশি। এমনকি কেবলমাত্র লোকসংস্কৃতি বিষয়ে কর্নাটকের হাভেরি জেলায় জনপদ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। লোকসংস্কৃতি থেকেই নবীন প্রজন্ম অতীতের শিকড়কে চিনে নিজের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। পশ্চিমবঙ্গে লোকসংস্কৃতির অন্তর্গত লোকশিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় সরকার তার পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছে। তাই এ রাজ্যে লোকসংস্কৃতি বিষয়ে চর্চার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কেও সরকারের চিন্তা করা দরকার।

সন্দীপন বিশ্বাস

প্রাক্তন ছাত্র, লোকসংস্কৃতি বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, নদিয়া

হ্যাঁ, ভাল হচ্ছে

‘এটা কি ভাল হচ্ছে’ (২-৫) শীর্ষক চিঠির প্রেক্ষিতে বলি, পরের পর ছক্কা মারতে শুধু গায়ের জোর নয়, ‘হ্যান্ড আই কো-অর্ডিনেশন’ বা চোখ ও হাতের বোঝাপড়া লাগে, যা আন্দ্রে রাসেলের মতো ব্যাটসম্যানদের একটা বিশেষ গুণ। এই ক্ষমতা সবার থাকে না। বেয়ারস্টো, বাটলার, ডিভিলিয়ার্স, এঁরা এই গুণের অধিকারী। ভারতীয় ক্রিকেটে সহবাগের হাত ধরে এই হাঁকড়ানোর ধারা খ্যাতি পেয়েছিল, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রিকেট-অবস্থানকে অবশ্যই পোক্ত করেছে। তাতেই আজ ফিনিশিং টাচ দিচ্ছেন ধোনিরা। এখন বহু ‘অক্রিকেটীয়’ শট প্রশংসিত, কারণ এগুলো মারতে কিছু কম প্রতিভা ও দক্ষতা লাগে না। প্রচুর অনুশীলন, অধ্যবসায় আর অভিনব কৌশলের মিশেলে এগুলি তৈরি। 

দ্বিতীয়ত, যে প্লেয়াররা প্রচণ্ড মারকুটে হন, তাঁরা ধ্রুপদী ক্রিকেট খেলতে পারেন না, তা নয়। ক্ষেত্রবিশেষে খেলার ধরন পাল্টে ফেলতে হয়, তাতে সনাতনী ধারার অবলুপ্তি ঘটে না। আর টি-টোয়েন্টিতে সর্বদাই অল্প ওভারে বেশি রান করার তাড়া থাকে, তাই ধ্রুপদী ধৈর্য রাখা যায় না। পেশিসর্বস্বতাই যদি সব হত, তা হলে যে কোনও কুস্তিগির, বডি বিল্ডারদেরই প্যাড, হেলমেট, ব্যাট দিয়ে নামালে তাঁরাও পর পর ছক্কা মারতে পারতেন। 

অরিত্র মুখোপাধ্যায়

চাতরা, হুগলি

কেন এমন?

‘হেলমেট নিয়ে গল্প লিখে বিতর্কে সার্জেন্ট’ (২৯-৪) শীর্ষক প্রতিবেদন পড়ে আশ্চর্য হলাম। শুধু পেশায় পুলিশ হওয়ার জন্য কারও মৌলিক চিন্তার ফসলের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে? কাহিনিভিত্তিক মৌলিক রচনায় লেখকের যে স্বাধীনতা প্রয়োজন, তার মূলে এই আঘাত। সৃষ্টির সময় এক গল্পকারের পরিচয় শুধু স্রষ্টা হিসেবে। পেশাগত পরিচয় সেখানে আসে কী ভাবে? আর পুলিশ কর্মচারীদের নিজস্ব পত্রিকায় লেখা নিয়ে যদি কথা ওঠে, সম্পাদক মৌলিক গল্পের বিভাগ রেখেছেন কেন তবে? কেবল জনচেতনামূলক নীতিমালা জাতীয় কিছু বিভাগ রাখলেই হত! 

এই দেশে শিল্পী-জনপ্রতিনিধিদের চলচ্চিত্রের নানা কাজ ‘চরিত্রের প্রয়োজনে’ ছাড় পেয়ে যায়, কলেজশিক্ষক-রাজনৈতিক নেতাদের দলীয় আন্দোলন বা উস্কানিমূলক কথাবার্তা ‘গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা’ হিসেবে অনুমোদিত হয়; আর এক গল্পকার কেবল পেশায় পুলিশ বলে তাঁর মৌলিক চিন্তাকে রুলের ঘায়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হবে? 

প্রিয়ম মজুমদার

শ্রীরামপুর, হুগলি