‘শেষ আশা ফুরাল নেহরুর মৃত্যুতে’ (রবিবাসরীয়, ৩-৩) পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে, নেহরু আন্তরিক ভাবেই কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তা নয়। দীর্ঘ দিন ধরেই কাশ্মীরের জনতা ১৮৪৬ সালের ‘অমৃতসর চুক্তি’-র মাধ্যমে তাঁদের উপর চেপে বসা স্বৈরাচারী হিন্দু ‘ডোগরা’ শাসন থেকে মুক্তি পেতে লড়াই করছিলেন। পুরোভাগে ছিল শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কনফারেন্স। ১৯৪৪ সালে ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীরের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন সংক্রান্ত একটি দাবিপত্র মহারাজার সরকারের কাছে পেশ করে। এবং একটি ইস্তাহার প্রকাশ করে, ‘নয়া কাশ্মীর’, যার ভিত্তিতেই ১৯৪৫-এ কাশ্মীরের মানুষ ডোগরা শাসনের বিরুদ্ধে নতুন উদ্যমে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলেন। ন্যাশনাল কনফারেন্স ১৯৪৬ সালে জম্মু-কাশ্মীর থেকে ডোগরা শাসনের অপসারণের দাবি জানায় এবং ‘কাশ্মীর ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেয়। 

কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কাক সামরিক শাসন জারি করে আন্দোলনের উপর তীব্র রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনেন। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ১৯৪৬ সালের ২০ মে শেখ আবদুল্লাকে গ্রেফতার করে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খবর শুনে নেহরু কাশ্মীরে ছুটে যান, কিন্তু প্রথম বার তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে কংগ্রেস নেতৃত্ব গাঁধী-পটেল-আজাদ রাজা হরি সিংহকে রাজি করানোয় নেহরু কাশ্মীরে ঢুকতে পারেন। কাশ্মীরে গিয়েই নেহরু নিজের প্রকৃত মনোভাব প্রকাশ করলেন। কাশ্মীরের জঙ্গি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতি রুদ্ধ করে একটি ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধানের পথ তৈরি করলেন। আসফ আলির সঙ্গে যৌথ ভাবে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করে তাতে শেখ আবদুল্লাকে স্বাক্ষর করালেন। বিবৃতিতে শেখ আবদুল্লা ‘ডোগরা শাসক কাশ্মীর ছাড়ো’ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন। যদিও জেল থেকে তিনি মুক্তি পেলেন না। জওহরলাল এক প্রেস বিবৃতিতে স্পষ্ট জানালেন তাঁর ও তাঁর দলের উদ্দেশ্য হল, দেশীয় রাজন্যবর্গ শাসিত রাজ্যগুলিতে পুরনো শাসকের নিয়ন্ত্রণাধীনে প্রতিনিধিত্বমূলক ও দায়িত্বশীল সরকার তৈরি করা, কোনও শাসকের অপসারণ নয়। জাতীয় মুক্তির দাবিতে কাশ্মীরের আন্দোলনের গতিরুদ্ধ হল। স্বাধীন, প্রজাতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাশ্মীরের দাবি, যা ‘নয়া কাশ্মীর’ ইস্তাহারে প্রতিফলিত হয়েছিল, তা সাময়িক ভাবে চাপা পড়ে গেল। 

নিবন্ধকার বলেছেন, নেহরুই ছিলেন কাশ্মীরে ‘গণভোট’ সম্পন্ন করার ব্যাপারে শেষ আবদুল্লার শেষ এবং একমাত্র আশা। আপাত ভাবে ঠিকই। ১৯৪৭ সালের ২ নভেম্বর নেহরু বেতার ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘যে মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং কাশ্মীর ভূখণ্ড আক্রমণকারীদের হাত থেকে মুক্ত হবে, কাশ্মীরের ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি কাশ্মীরের মানুষের গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।’’ ১৯৪৮-এর ১ জানুয়ারি নেহরু কাশ্মীর সংক্রান্ত বিষয়টি রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠান। নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, গণভোটে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ১৯৪৮ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপুঞ্জের গৃহীত প্রস্তাবে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়টি মেনে নিয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ভারতকে জম্মু-কাশ্মীর থেকে সিংহভাগ সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং পাকিস্তান সরকারকে জঙ্গি উপজাতি আক্রমণকারীদের ও কাশ্মীরে উপস্থিত অন্য পাকিস্তানি নাগরিকদের কাশ্মীর থেকে অপসারণ করতে হবে। 

তার পর কী হয়? ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জ কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠিত করার জন্য অন্তত আটটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, কিন্তু দুই রাষ্ট্রের অনিচ্ছা ও অসহযোগিতায় একটি প্রস্তাবও বাস্তবায়িত হয়নি। নেহরুও গণভোটের প্রশ্নে রাষ্ট্রপুঞ্জকে সহযোগিতা করেননি। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সর্বপল্লী গোপাল সম্পাদিত নেহরুর নির্বাচিত রচনাবলির ঊনবিংশ খণ্ডে উল্লিখিত ১৯৫২ সালের ২৫ অগস্টের একটি প্রতিবেদনে নেহরু লিখেছেন ‘‘১৯৪৮ সালের অন্তিম লগ্ন থেকেই আমার মনে হতে শুরু করেছে যে কাশ্মীর সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের সামনে দু’টি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে। এক, সীমিত ভাবে পাকিস্তান বিরোধী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং দুই, তদানীন্তন সামরিক পরিস্থিতি ও অবস্থানের ভিত্তিতে একটি বন্দোবস্ত গ্রহণ করা। আমি গণভোটের কথা বললাম না এই কারণে যে সেখানে গণভোট গ্রহণের পরিস্থিতি আমরা কখনওই পাব না।’’ এর তিন বছর আগেই কাশ্মীরে গণভোট নিয়ে নেহরু 

নিজের অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ আবদুল্লাকে লেখা একটি চিঠিতে নেহরু লিখেছিলেন— গণভোট এখনও পর্যন্ত একটি সুদূর ভবিষ্যতের ব্যাপার এবং গণভোট কোনও দিনই অনুষ্ঠিত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি তাঁর এই বক্তব্য গোপন রাখতে বলেছিলেন, কারণ তা সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হলে তাঁর সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

১৯৫৭ সালের পর থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জ যখনই গণভোট সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েছে, তখনই ভারতের ‘বন্ধু’ সোভিয়েট ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদে ভিটো প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্যোগকে বাধা দিয়েছে। নেহরু এবং ভারত সরকার এর জন্য প্রতি বারই সোভিয়েটের উদ্যোগকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালে নেহরু জম্মুর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী বলরাজ পুরীকে বলেছিলেন, ‘‘আমরা আন্তর্জাতিক স্তরে কাশ্মীরকে নিয়ে জুয়া খেলেছি। এখন আমরা কাশ্মীরকে হারাতে পারি না। নৈতিকতা ও গণতন্ত্র অপেক্ষা করতে পারে।’’ এই বক্তব্য স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে নেহরু কোন চোখে কাশ্মীর তথা কাশ্মীরিদের স্বার্থ দেখেছিলেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত ঘটনাবলি ও নেহরুর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, সাংবিধানিক চাতুরির সাহায্যে কাশ্মীরকে গ্রাস করার প্রক্রিয়ায় স্বয়ং নেহরুই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুতরাং কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের ‘সুবর্ণ সুযোগ’ অথবা ‘শেষ আশা’ হঠাৎ নেহরুর মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায়নি। বরং তার অনেক আগেই সুপরিকল্পিত ভাবে কাশ্মীরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সম্ভাবনাকে শেষ করে দেওয়া হয়। 

শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতীয় প্রতিনিধি মহম্মদ করিম চাগলা সরাসরি ঘোষণা করেন ‘‘আমি আমার সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই, কোনও অবস্থাতেই আমরা কাশ্মীরে গণভোট গ্রহণে রাজি হতে পারব না।’’ নেহরুর জীবৎকালেই ১৯৫৬ সালের ১৭ নভেম্বর গৃহীত জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধানে বলা হয় ‘‘জম্মু-কাশ্মীর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছদ্য অঙ্গ হিসেবে রয়েছে এবং থাকবে’’, যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৫৭-র ২৪ জানুয়ারি স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছিল, এই 

ঘোষণা রাষ্ট্রপুঞ্জ কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাবের পরিপন্থী।

রুদ্র সেন

কলকাতা-২৮

 

বঞ্চনা

আমি গত ১৫-০৭-২০১৪ তারিখে একটি নামী কোম্পানির পিউরিফায়ার কিনেছিলাম। প্রতি বছরে তিন বার করে মোট ন’বার সার্ভিস করার কথা। প্রথম আড়াই বছর ঠিকমতো সার্ভিস করার পর, শেষ সার্ভিসটা ছিল গত বছর, জুলাই ২০১৮-য়। বার বার ফোন করে আসতে বলায়, কোম্পানির কর্মীরা বলেন, আমাকে নতুন মেশিন কিনতে হবে। আমি এক জন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। আমার আর্থিক অবস্থা জানিয়ে বলেছিলাম যে আমি এখনই কিনতে পারছি না নতুন মেশিন। পুজোর পর কিনব। শেষ সার্ভিসটা করে যান। বার বারই তাঁরা ফোনে বলেছেন, নতুন মেশিন না কিনলে সার্ভিস করতে আসব না।

আমার বক্তব্য, নতুন মেশিন না কেনার জন্য পুরনো সার্ভিস না করার কী কারণ? বিখ্যাত কোম্পানির কাছে এই রকম ব্যবহার সত্যিই কি প্রাপ্য?

অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

কলকাতা-৩৪

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।