তবে কে কোন দলে

যখন পণের জন্য কেউ তার বাড়ির বউয়ের গায়ে আগুন দেয়, কিংবা সম্পত্তির জন্য নিজের বৃদ্ধ বাবা কিংবা মাকে অত্যাচার করে, বা বৃদ্ধা দিদিকে মারধর করে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিবেশীদের মনে তাদের প্রতি অত্যন্ত বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। একটা সময় যখন এই ধরনের অত্যাচার তুঙ্গে ওঠে, বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যায়, তখন থানা-পুলিশ হয়, বা প্রতিবেশীরা সম্মিলিত হয়ে ‘আজ একটা হেস্তনেস্ত দরকার’ বলে প্রতিবাদ করে, তখন এগুলো নিয়ে হইহই করে খবর হয়। টিভি চ্যানেলের ক্যামেরাও ঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়। আমরা দেখি, শুনি আর শিউরে উঠি।

তার সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। প্রতিবেশীরা, বা ওইখানে জড়ো হওয়া লোকেরা, দোষীদের প্রবল পেটাচ্ছে। চুল ধরে টানছে, এনতার কিল-চড়-ঘুসি চালাচ্ছে। অত্যাচারীরা তখন অত্যাচারিতে বদলে গিয়েছে। আর, যারা সুবিচার চায়, যারা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে, তারা অত্যাচার চালাতে শুরু করেছে!  অবাক লাগে। নিশ্চিত ভাবেই, যে লোক নিজের বৃদ্ধা মাকে পেটায় বহু দিন ধরে, সে অমানুষ। যে পণের জন্য এক জনের গায়ে আগুন লাগাতে পারে, সে অমানুষ। সমাজে তার বিরুদ্ধে ক্রোধ জন্মাবে, তার শাস্তির সংগত দাবিও উঠবে। কিন্তু অমানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য, তার ওপর প্রচণ্ড রেগে উঠে, আমি যদি নিজেই প্রায় তার মতোই আচরণ শুরু করি, তবে আমিও কি অমানুষ হলাম না?

তার সঙ্গে দেখা যায় ব্যাপক ভাঙচুরের দৃশ্য। অত্যন্ত উল্লাসের সঙ্গে তাদের বাড়িতে ঢুকে অনেকে মিলে সব কিছু আছড়ে ভাঙা হচ্ছে। চেয়ার, টেবিল, আলমারি, কিচ্ছু বাদ যাচ্ছে না। তখন সহসা ‘ন্যায়-সমর্থক’দের গুন্ডাবাহিনী মনে হয়। অন্যের ক্ষতিতে তাদের এই আনন্দ দেখে মনে হয়, হঠাৎ দল-বদল ঘটে গিয়েছে!

নিখিল সাহা, কলকাতা-৬৮

 

সরহায় উৎসব

বড় বাস্কের লেখা ‘নাচ গান একতার উৎসব’ (১১-১) প্রসঙ্গে বলি, সাঁওতাল আদিবাসীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ‘সরহায়’ (বানান-ভেদে ‘সহরায়’)-এর উপর আলোকপাত করার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। তবে কয়েকটি কথার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। তিনি লিখেছেন, ‘সরহায়’ শব্দটি এসেছে ‘সারহাও’ থেকে, যার অর্থ কৃতজ্ঞতা। সাঁওতালি ভাষায় কার্তিক মাসকে ‘সহরায় চান্দো’ বলা হয়। একটি অংশের মতে, কার্তিক মাসে ফসল তোলার পর এই উৎসব পালন করা হত বলে এই উৎসবকে ‘সহরায়‌’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

উৎসবটির উৎস নিয়ে সাঁওতাল জনমানসে আর একটি মত প্রচলিত আছে। সেটি এই রকম— সাঁওতালদের আদি পিতা-মাতা পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়হির পাঁচ জোড়া যমজ পুত্র-কন্যা ছিল (সূত্র: ‘ঠাকুর গে সারি সারজম’। সোমাই কিস্কু)। পরে তারা আর একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। ছেলেরা বড় হলে, খান্ডেরায় জঙ্গলে শিকারে যেত, অন্য‍দিকে মেয়েরা রোজ সুড়ুকুচ জঙ্গলে শাকসবজি ও পাতা সংগ্রহে বের হত। সেই সময় ওই জঙ্গলে জ্যেষ্ঠা কন্যা সহরায় বাদে বাকি পাঁচ জোড়া নারী পুরুষের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা বিয়ে করে। সহরায় ‍আজীবন অবিবাহিতই থেকে যায়।

পরবর্তী কালে এই ছেলেমেয়েরা হিহিড়ি-পিপিড়িতে বসতি গড়ে তুললে, বড়দিদি সহরায়, গ্রামের শেষ প্রান্তে কুঁড়েঘরে থাকতে শুরু করে। দুখিনি বড়দিকে দেখে ভাইবোনদের মনে কষ্ট জাগে। তাই ঘরে ফসল তোলা হলে তারা বড়দিকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায় পাঁচ দিনের জন্য। ওই কয়েকটা দিন তারা বড়দির সঙ্গে নাচ গান ও আনন্দে মেতে ওঠে। তাদের বড়দিদির আগমনেই নাকি সহরায় উৎসবের সূচনা হয়েছিল সেই কোন আদিকালে। আর এই কারণেই সহরায় উৎসবের আর এক নাম ‘মারাং দৈই’, যার অর্থ বড়দিদি।

দ্বিতীয়ত, লেখক সহরায় উৎসব ও সাকরাত উৎসবকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। সাকরাত সাঁওতালদের একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র উৎসব, যা পৌষ সংক্রান্তির দিনে উদ্‌যাপিত হয়। এটি মূলত একটি শিকার উৎসব। এই উৎসবের সময় যুবকরা তিরন্দাজির বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করে। এই উৎসবের মাধ্যমে ‍সমাজের সমস্ত রকম অশুভ শক্তির বিনাশ সাধনের প্রার্থনা করা হয়।

শিবু সরেন, নীলডাঙা, বীরভূম

 

শিখতে পারবে?

‘নতুন পাঠ্যক্রমের মূল্যায়ন প্রশিক্ষণ’ (২৩-১) শীর্ষক প্রতিবেদন পড়ে, আঠারো বছরের শিক্ষক-জীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতার কথা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছে হল। প্রথমে স্বীকার করে নিচ্ছি, নতুন পাঠ্যক্রমের পঠনপাঠনের বিশ্লেষণী মূল্যায়নের যে উদ্যোগ স্কুল শিক্ষা দফতর শুরু করছে তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে পাঁচটি সূচক নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ১) পড়ুয়াদের অংশগ্রহণ ২) প্রশ্ন করা ও অনুসন্ধানে আগ্রহ, ৩) ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সামর্থ্য, ৪) সহানুভূতি ও সহযোগিতা এবং ৫) নান্দনিকতা ও সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ। শিক্ষাকে ‘অন্তরের অমৃত’ করে তুলতে এ-উদ্যোগ অনেকটা সাহায্য করবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু যে-আধারে এই অমৃত ঢালার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাদের এই অমৃত গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে কি?

আমি একটি মফস্সল স্কুলে পড়াই। শতাব্দীপ্রাচীন এই বিদ্যায়তনটি হিন্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে, তাই ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশের মাতৃভাষা হিন্দি। ফলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা বাংলা ভাষার প্রাথমিক জ্ঞানটুকু থেকে বঞ্চিত। বাংলা বর্ণমালা তাদের কাছে অপরিচিত। মাত্রাহীন বর্ণ, মাত্রাযুক্ত বর্ণ আলাদা করতে পারে না। যুক্তব্যঞ্জনের লিপিরূপ চেনে না। সাধারণ গাণিতিক বোধ তাদের মধ্যে প্রত্যাশা করা বাতুলতামাত্র। ইংরেজি বর্ণমালা তাদের আড়ষ্ট জিভে কোনও মতে উচ্চারিত হলেও, বর্ণগুলো তারা লিখতে অক্ষম। এ-অবস্থায় তারা কী ভাবে পঠিত বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে প্রশ্ন উদ্ভাবন করবে? ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের সামর্থ্য অর্জন করবে?

এ-সমস্যা শুধু হিন্দিভাষীদের নয়। প্রাথমিক স্তর থেকে বাংলাভাষীরাও একই দুর্বল ভিত নিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তা তো অমর্ত্য সেনের প্রতীচী ট্রাস্টের সমীক্ষায় ধরা পড়েছে। পাশ-ফেল না-থাকায় বছরের পর বছর তারা এক শ্রেণি থেকে আর এক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। স্কুল দফতর প্রবর্তিত পাঠ্যক্রমের মধ্যে থেকে শিক্ষার্থীদের গোড়ার গলদ নির্মূল করা সম্ভব নয়। কেঁচে গণ্ডূষ না করলে উপায় নেই।

এই ব্যাধি নিরাময়ের জন্য আমরা সামান্য উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বাংলা, ইংরেজি বর্ণমালা, মাত্রাহীন এবং মাত্রাযুক্ত বর্ণ, যুক্তাক্ষরের লিপিরূপ এবং প্রাথমিক বিষয়গুলোর দৃষ্টিনন্দন ও নির্ভুল চার্ট প্রস্তুত করে শ্রেণিকক্ষে টাঙিয়ে রাখা। সংখ্যা, নামতা, সাধারণ যোগ-বিয়োগের চার্ট ছড়া বা কবিতার আকারে তৈরি করে শ্রেণিকক্ষে রাখা। ছাত্রছাত্রীরা এগুলো দেখবে। শিক্ষকরা চার্ট থেকে প্রশ্ন করবেন। এ-ভাবে ‘কন্টিনিউয়াস কমপ্রিহেনসিভ ইভ্যালুয়েশন’ (সিসিই)-এর দ্বার উন্মুক্ত হবে এবং তার পর নতুন পাঠ্যক্রম ‘পড়ুয়াদের উপর কেমন প্রভাব ফেলেছে’ সেটা বোঝা সম্ভব হবে।

তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা আমাদের বিদ্যালয়ে এই উদ্যোগটা গ্রহণ করে ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতাও পেলেও, পরিচালন সমিতির সক্রিয় প্রতিরোধে সাময়িক ভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছি। জানি না, তাদের শুভবোধ কবে ও কী ভাবে জাগ্রত হবে?

কমলকুমার দাশ, কলকাতা-৭৮