সম্প্রতি অমর্ত্য সেনের একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপি নেতা রাহুল সিন্হা জানিয়েছেন, অমর্ত্য সেনের কোনও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। কুয়োর ব্যাঙের মতো দলীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে আবদ্ধ রাহুলবাবুর সম্ভবত সেই কথাটি স্মরণে নেই: স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। এই বঙ্গে সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা মুষ্টিমেয় দলীয় সহকর্মীর বাইরে রাহুলবাবুর গ্রহণযোগ্যতা কতখানি ঠিক জানা নেই, তবে সুবিশাল এই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রকৃত শিক্ষিত এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা অমর্ত্য সেনের বিভিন্ন রচনা পড়ে তাঁর জ্ঞানের আলোকে নিজেদের আলোকিত করার চেষ্টা করেন। তাঁর ভাষণ শোনার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকেন। তাঁর সভায় প্রবেশের সুযোগ না পেলে হতাশ হন। সবচেয়ে বড় কথা, 

অমর্ত্য সেনের মতো মানুষদের চিন্তাধারা বেশ কিছু মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। মনে রাখতে হবে, তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।

সমীর কুমার ঘোষ

কলকাতা-৬৫

জোর কেন?

অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘হয়নি মানে হবে না?’ (১০-৭) শীর্ষক চিঠি প্রসঙ্গে বলতেই হয়, অধ্যাপক সেন যা বলতে চাইছেন, তা বোধ হয় পত্রলেখকের বোধগম্য হয়নি। অমর্ত্য সেনের আসল আপত্তি তো ‘জয় শ্রীরাম’ বাণীটা জোর করে গিলিয়ে দেওয়া নিয়ে। এখন যা ঘটছে তা তো রামের নামগান নয়, তাঁর নাম করে লোক পেটানো। পত্রলেখক ‘নিউ ইয়ার্স ডে’ ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ ‘ক্রিসমাস ডে’ ইত্যাদি সম্পর্কে বলেছেন, এ সব বাংলার সংস্কৃতির উৎসব না হওয়া সত্ত্বেও আজ উৎসবের মেজাজেই পালিত হচ্ছে বাংলায়। ঠিকই তো! বাংলা তথা ভারতের এটাই তো বিশেষত্ব! কিন্তু এগুলির কোনওটাই কি কেউ জোর করে, সন্ত্রাস করে গিলিয়ে দিয়েছে আমাদের? এগুলি কি কোনও কালেই কোনও নির্দিষ্ট দলের অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, না আছে? এই উৎসবগুলি তো মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার। মানুষ নিজে থেকেই এই উৎসবগুলি পালন করে আসছেন। আবার সবাই যে সব উৎসব পালন করেন, এমনটাও নয়। রামকে যদি ভগবান রূপেই পূজা করা হয়, তবে ভগবানের নামে মানুষের উপর সন্ত্রাস বা জোর-জবরদস্তি করার অধিকার কি কারও আছে? এর আগে তো বাংলায় কোনও কালে ‘জয় মা কালী’, ‘জয় শিব’, ‘জয় দুর্গা’ ইত্যাদি বলতে বাধ্য করার ব্যাপার হয়নি! এখন কেন হচ্ছে? রামের নামে এই ধরনের গুন্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলাকেই কি পত্রলেখক ‘ঔদার্যহীনতার পরিচায়ক’ বলছেন? 

সৌমিক মুখোপাধ্যায়  

কলকাতা–৪৭ 

আগেই ছিল

‘মুড়ি ও মিছরি’ (সম্পাদকীয়, ১১-৭) পড়লাম। ঠিক, বাক্‌স্বাধীনতা আছে বলেই অমর্ত্য সেনের মতো নোবেলজয়ী, দার্শনিক তথা জগদ্বিখ্যাত সমাজকল্যাণ চিন্তককে যা খুশি বলা যায় না, তাঁর কথার উত্তর দিতে গেলে ‘‘যুক্তি, ভাবনা ও রুচির প্রয়োজন।’’ কিন্তু অমর্ত্যবাবুরও কি উচিত নয়, তাঁর মতটা বাস্তবের সঙ্গে কতটা মিলছে, সেটা দেখা? ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি ও রামনবমী বাংলায় সদ্য আসেনি। আমার ৭৯ বছর বয়স, গ্রামবাংলায় (জঙ্গলমহল) ছোট থেকে এই শব্দগুলির সঙ্গে আমি পরিচিত। রামকৃষ্ণ মিশনে প্রতি একাদশীতে রামনাম কীর্তন হয়, ‘জয় শ্রীরাম’ও বহুব্যবহৃত, রামনবমীও বহু জায়গায় মহাসমারোহে পালিত হয়। অমর্ত্য সেন অর্থনীতির গুরু, তাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অর্থনীতি ও শিল্পবাণিজ্যের সঙ্কট নিয়ে কথা বলাই যুক্তিযুক্ত হত, নোংরা রাজনীতিতে তাঁর জড়ানো কি উচিত? যদি তা-ই করতে চান, শাসকদের তুচ্ছ দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে রাজধর্ম ও মানবধর্ম পালনের উপদেশ দিন। সংবিধানকে মর্যাদা দিয়ে জাতপাত, ধর্ম, ভোটের রাজনীতি ছেড়ে, কাটমানি ছেড়ে, দেশের উন্নতির কাজ করতে বলুন। ভ্যালেন্টাইন’স ডে বাংলায় এল, ছট পুজোর বহুল প্রোৎসাহন ঘটল, মা দুর্গাকে বিজয়ার পর র‌্যাম্পে তোলা হল— এগুলো অমর্ত্যবাবুর নজরে পড়েনি কেন? 

গোপাল দেব শর্মা

কলকাতা-৮৪

তখন ও এখন

সেমন্তী ঘোষের ‘চুপ করে থাকব না’ (১২-৭) শীর্ষক নিবন্ধ সম্পর্কে এই চিঠি। নব্বই দশকের গোড়ায় অযোধ্যায় রামমন্দির আন্দোলনের সূচনায় ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি করসেবকরা পরস্পরকে সম্ভাষণ করতে প্রচলন করেছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় থেকে এই ধ্বনি স্লোগানে রূপান্তরিত হয়। যে প্রেক্ষাপটে এটি স্লোগানে পরিণত হয়েছে, যে ভাবে সর্বোচ্চ মহল থেকে এই ধ্বনির পরিচর্যা হয়ে চলেছে, বুঝতে বাকি থাকে না, একটি ব্যাপক পরিবর্তনের লক্ষ্যে তা ঘটছে। যেমনটি বলা যায় ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি সম্পর্কে। এই ধ্বনিটিও স্বাধীনতার আগে দেশের মুক্তির লক্ষ্যে বিপ্লবীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হত। তাঁদের অনুপ্রাণিত করত। জনশ্রুতি, ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি শুনে তখন ব্রিটিশ পুলিশের মাথা গরম হত। এখন যেমনটি ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি শুনে অনেকের হচ্ছে। তবে ফারাক আছে। তখন যাঁরা বন্দে মাতরম্ ধ্বনি দিতেন, তাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন না। এখন এমন একটি দলের সদস্য সমর্থকরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে আন্দোলন করে চলেছেন, যাঁরা দেশে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আছেন। তাঁদের হাতে অহিংস উপায়ে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক সহায়তায় রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ আছে। 

অশেষ দাস

কলকাতা-১১০

সে দিন বাসে

জুম্মাবার। বি টি রোড দিয়ে বাসে যাচ্ছি। একটা স্টপ থেকে কয়েকটি বাচ্চা ছেলে উঠল, যারা দৃশ্যত মুসলিম। পাজামা, পাঞ্জাবি, মাথায় ফেজ, চোখে সুর্মা। ওরা বসেওনি, নিজেদের মধ্যেই গল্পে মশগুল ছিল। দুটো স্টপ পরে নেমে গেল। সামনের সিটের (ভদ্র)লোক পাশের জনকে বললেন, ‘‘দেখলেন তো, ভাড়া নিল না। স্বজাতি না!’’ কন্ডাক্টর প্যান্ট-শার্ট পরা। এক ‘মুসলমানদের মতো’ দাড়ি ছাড়া, তাঁর ধর্ম-পরিচয় বোঝা সম্ভব নয়। মুসলিম হতে পারেন, আবার না-ও পারেন। লাদেনের দাড়ির সঙ্গে এক বাস কন্ডাক্টরের দাড়ির ফারাক কিছু মানুষ করতে না চাইলেও, এ দেশ তো ছাপোষা মুসলিমদেরও। যাঁকে উদ্দেশ করে কথাটা বলা, তপ্ত লৌহশলাকার মতো কথাগুলো তাঁর কানে না যাওয়ার কোনও কারণ ছিল না। এটাই এখন সাংস্কৃতিক রাজধানীর নিত্যদিনের চিত্র। ঠিক এই কারণেই অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকারের ‘‘দাঙ্গার থেকে মারাত্মক আরও বেশি কিছু আছে, তেমনটা বলতে পারছি না’’ বক্তব্যের সঙ্গে (‘তাঁরা কি তবে ভয় পেয়েই...’, ১৩-৭) পুরোপুরি একমত হতে পারলাম না। এই ধরনের ব্যবহার শুধু অ-মানবিক বললে কম বলা হবে। এই সময়ের এই প্রবণতা দাঙ্গার চেয়েও ভয়ঙ্কর। এক বারে শিরশ্ছেদ করা নয়, তিলে তিলে মারা। এবং সঙ্গত কারণেই বিরূপ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে উস্কানি দেওয়া। ঠিক আমেরিকার শরণার্থী শিবিরগুলোর মতো। অবাঞ্ছিত, তবু দয়া করে প্রাণে মারলাম না, কিন্তু ডিটেনশন সেন্টারগুলিতে এমন অসহনীয় পরিবেশে রাখলাম, যাতে তাঁরা অশেষ কষ্ট পান। আর যাঁদের মন-শরীর বিদ্রোহ করবে, মুখ ফুটবে, তাঁদেরকে সোজা বলে দেওয়া— তা এখানে এতই যখন অসুবিধা, তখন যেখানে খুব ভাল ছিলে, সেখানেই ফেরত যাও না, বাপু! 
ওই বাস কন্ডাক্টরের মনও হয়তো কোনও দিন বিদ্রোহ করবে। সবারই ধৈর্যের সীমা আছে। আমরা অনেকেই খুব ভয় পাচ্ছি। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার ভয়। বারুদের স্তূপের ওপর বসে থাকার ভয়। প্রতি দিন, প্রতি মুহূর্তে। পুরোদস্তুর দাঙ্গার চাইতেও, যে কোনও সময় দাঙ্গা বাধতে পারে, এই ভয়ে থাকা অনেক বেশি মর্মান্তিক। 

শঙ্খমণি গোস্বামী 

কলকাতা-১২২