ভগিনী নিবেদিতাকে নিয়ে হর্ষ দত্তের লেখায় (‘শঙ্খের মাঝে বজ্র’, পত্রিকা, ১-৬) উল্লিখিত দু’টি বিষয়ের সূত্রে দু’টি প্রাসঙ্গিক তথ্য সংযোজন। প্রথমটি শিল্প বিষয়ে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের আবহাওয়ায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন করে এঁকেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘ভারতমাতা’ ছবিটি। নিবেদিতাই এর নামকরণ করেছিলেন। ওই সময়ে নিবেদিতাকে আদর্শ করে অবনীন্দ্রনাথ ছবিটি পরিকল্পনা করেছিলেন। কেননা, তিনি ভারতবর্ষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। ত্যাগের আদর্শের অনন্য প্রতিমূর্তি। এই নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের ভূমিকাই শিল্পীকে সেই জাতীয়তাবাদী আবহে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, সমগ্র ভারতবাসীকেও এই মূর্তি স্বদেশি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘নিবেদিতার মতো দুটি মেয়ে আর দেখিনি। অমন আর হয় না।... ভারতবর্ষকে নিবেদিতা যে কতখানি ভালবেসেছিলেন, তা আমি জানি। অন্তরের যোগ ছিল তাঁর ভারতবর্ষের সঙ্গে।’’

সেই ভাব নিবেদিতার করা ছবিটির আলোচনাতেও ‘‘চিত্রপটে পরিব্যক্ত মানসিক আদর্শটি খাঁটি ভারতের জিনিস, আকারপ্রকারও ভারতীয়।... ইহাই প্রথম উৎকৃষ্ট ভারতীয় চিত্র যাহাতে এক জন ভারতীয় শিল্পী যেন মাতৃভূমির অধিষ্ঠাত্রীকে... তাঁহার সন্তানগণের মানসনেত্রে তিনি যে-রূপে প্রতিভাত হন, সেইভাবে অঙ্কিত করিয়াছেন।’’ (প্রবাসী, ১৩১৩ ভাদ্র। উদ্ধৃতিসূত্র, মনোজিৎ বসু, অবনীন্দ্রনাথ)। নিবেদিতা এখানে শিল্পরসিক জাতীয়তাবাদী। ভারতশিল্পের জন্য নিবেদিত।

দ্বিতীয়টি সাহিত্য বিষয়ে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সখ্যের সূত্রে নিবেদিতা তাঁর আমন্ত্রণে শিলাইদহ ভ্রমণে যান ১৯০৪ সালের শেষে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পড়ে শোনান পরিকল্পিত ‘গোরা’ উপন্যাসের একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া। তার সারমর্ম, প্রধান চরিত্র গোরা এক জন আইরিশ বংশোদ্ভূত যুবক। তাই বাঙালি সুচরিতার সঙ্গে তার মিলন ঘটে না, সে প্রত্যাখ্যাত হয়। আপনজনের স্বীকৃতি পায় না।

তিনি তো জন্মসূত্রে আইরিশ, ফলে ক্ষুব্ধ হন নিবেদিতা। সরাসরি রবীন্দ্রনাথকে জানিয়ে দেন খসড়ার এই বক্তব্যে তাঁর তীব্র আপত্তির কথা। তাঁর মনে হয়েছিল, এক মহৎ সাহিত্যসৃষ্টিতে ভারতবর্ষের আদর্শ জাতিভেদ হতে পারে না। তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষও তা ছিল না। পরবর্তী কালে, রবীন্দ্রনাথ এই বিরোধিতার কথা মনে রেখে গোরা উপন্যাসে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন করেন এবং পরিণতিতে গোরা ও সুচরিতার মিলনে এক উদার মানবিকতায় সমৃদ্ধ ভারতবর্ষের নবজাগরণ হয়। সি এফ অ্যান্ড্রুজ়কে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি জানিয়েছিলেন। (দ্র. রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল, ৫ম খণ্ড)। নিবেদিতা এখানে সাহিত্যরসিক জাতীয়তাবাদী। আজকের ভারতের পটভূমিতে নিবেদিতার ভূমিকার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

চঞ্চল বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা-৩০

প্রস্তাব ভাল

সেমন্তী ঘোষের ‘খরচটাই কি আসল বিষয়?’ (২৮-৬) নিবন্ধের সূত্র ধরে বলি, ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ প্রস্তাব কার্যকর হলে যদি ভারতীয় জনতা পার্টি অর্থাৎ কেন্দ্রের শাসক দলই শুধু লাভবান হত, তা হলে লালকৃষ্ণ আডবাণীর মতো অত্যন্ত বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ১৯৯৫ সালে এটির প্রথম প্রস্তাব করতেন না এবং ২০১০ সালে সংসদে এটি পুনরুত্থাপন করতেন না, কারণ ওই দুই সময়ের কোনওটিতেই বিজেপি সরকার কেন্দ্রের ক্ষমতায় ছিল না।

তিনি লিখেছেন, ‘‘এত বড় দেশের স্থানীয় ভোট স্থানীয় বিবেচনায় হবে, কেন্দ্রীয় শাসকদের নির্বাচন করতে অন্য এক ধরনের বিবেচনা লাগবে।’’ দেশে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় শাসনের স্তরটা আলাদা রাখার এই যে মৌলিক নীতি, আমার মনে হয় সেটা এ বারের লোকসভা নির্বাচনেও সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনটি রাজ্যে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে হয়েছে কিন্তু সেখানে অরুণাচল প্রদেশ বাদে বাকি দু’টি রাজ্যেই বিজেপিবিরোধী সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে।

সবশেষে বলি, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের শুধু একটা বিরাট পরিমাণ অর্থেরই সাশ্রয় হবে না, প্রত্যেকটি প্রাদেশিক সরকার উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত তিন থেকে চার মাস সময়ও বেশি পাবে, যা খুব কম গুরুত্বপূর্ণ নয় আজকের দিনে। 

প্রণব কুমার সরকার

নিচুবাঁধগোড়া, বীরভূম

আগে থেকেই

সেমন্তী ঘোষ তাঁর নিবন্ধে বলেছেন, ‘ওয়ান নেশন ওয়ান ভোট’ বিজেপিরই ব্রেনচাইল্ড। তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেই বলতে চাই, বিজেপি নয়, আরএসএস-এর প্রাক্তন প্রধান এম এস গোলওয়ালকর-ই হলেন এই চিন্তার উদ্‌গাতা। ১৯৬৬ সালে তাঁর ‘বাঞ্চ অব থটস’ গ্রন্থে এই স্বপ্নের হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার খরচ তোলার জন্য দু’টি প্রস্তাব দেন। একটি হল বিধানসভাগুলিকে উঠিয়ে দেওয়া, দ্বিতীয়টি হল নেশাবস্তুর উপর নিষেধ তুলে নেওয়া। এই বক্তব্যের সময় ১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধের পরেই। ‘বাঞ্চ অব থটস’ আরএসএস-কর্মীদের কাছে গীতার মতো। বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক দলের যাঁরা মাথা, তাঁরা প্রত্যেকেই আরএসএসের সেবক। তাঁরা যে সেই মতোই চলবেন‌, দেশটাকে অন্য দিকে ঠেলে দেবেন, তাতে আশ্চর্যের কী আছে?

নবকুমার বিশ্বাস

কলকাতা-৩৪

সম্ভব নয়

সেমন্তী ঘোষের বক্তব্যের সূত্র ধরে যোগ করতে চাই, লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন একই সময়ে করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। এ কথা ঠিক, চতুর্থ সাধারণ নির্বাচন (১৯৬৭) পর্যন্ত পূর্বোক্ত নির্বাচন যুগপৎ হয়েছে। তার পর থেকে পরিস্থিতির নানা পরিবর্তন হতে থাকে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রে কংগ্রেস দল সরকার গঠন করতে পারলেও, পশ্চিমবঙ্গ-সহ একাধিক রাজ্যে অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয়। দলত্যাগের কারণে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সেই সব সরকারের পতন ঘটে। ফলে বিভিন্ন রাজ্যে বার বার বিধানসভার নির্বাচন হয়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং ১৯৭২ সালে বিধানসভার নির্বাচন হয়। অন্য দিকে, পঞ্চম লোকসভার নির্বাচন ১৯৭২ সালে হওয়ার কথা থাকলেও, তা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভবের কারণে পরেও আর কেন্দ্র ও রাজ্যের আইনসভার নির্বাচন একসঙ্গে করা সম্ভব হয়নি।

আজও তা সম্ভব কি? মনে হয় না। শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথাই যদি ধরি, দেখা যাবে, এই রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২১ সালে, আর লোকসভার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই কার্যকাল শেষ হবে। যুগপৎ নির্বাচন করতে গেলে হয় বিধানসভার মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হবে, নয় লোকসভার কার্যকাল হ্রাস করতে হবে, যা সাংবিধানিক ভাবে সম্ভব নয়।

তবে কয়েকটি কথা: ১) ১৯৫০ সালের ২৫ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিব সুকুমার সেন মুখ্য নির্বাচন মহাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ২৬ জানুয়ারি সংবিধান চালু হয়। এই সংবিধান অনুসারে যত শীঘ্র সম্ভব, লোকসভা, রাজ্যসভা, বিধানসভা, কয়েকটি রাজ্যে বিধান পরিষদ প্রভৃতির নির্বাচন করার প্রয়োজন অনুভব করা হয়। ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সুতরাং, ‘প্রথম দিকে চূড়ান্ত অপ্রস্তুত অবস্থায় একসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের ভোট করতে হয়েছিল ঠিকই...’ লেখিকার এই মন্তব্য যথার্থ নয় বলে আমার মনে হয়েছে। ২) ফলি নরিম্যান সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী, বিচারপতি নন। ৩) কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রবর্তনের কোনও সুযোগ নেই। মুম্বই মামলায় (১৯৯৪) সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর এখন আর যখন তখন রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন চালু করা যায় না।

অশোককুমার সরকার

কলকাতা-৫৯