সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদক সমীপেষু: পদবির কী দরকার

surname
প্রতীকী ছবি।

সোনালী দত্তের ‘কেমন হবে পদবি-মুক্ত জীবন’ (১২-৮) নাড়া দিয়ে গেল। আজ থেকে ২৬ বছর আগে আমরা কোর্টে হলফনামা দিয়ে পদবি বর্জন করে সমস্ত রকম পরিচয়পত্রে স্ব-নামে পরিচিত হয়েছি। ভারতীয় হিসেবে আমরা গর্বিত— ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স, কোনও সরকারি পরিচয়পত্রের ক্ষেত্রেই পদবি আবশ্যক নয় বলে। বাবা-মায়ের পদবি না থাকার জন্য আমাদের ছেলে অরণ্যের বার্থ সার্টিফিকেটেও পদবির লেজুড় নেই। সে এখন কলেজে পড়ছে। পদবি-হীনতা এখনও পর্যন্ত কোনও সমস্যা সৃষ্টি করেনি।

তবুও খুব হতাশ লাগে যখন চার পাশে তাকিয়ে দেখি, পদবির আড়ম্বর ক্রমশ বেড়েই চলেছে। অনেক আধুনিকমনস্ক মহিলা বিয়ের পর দু’বাড়ির পদবিই রাখছেন। তাঁদের মনে থাকছে না যে, বাপের বাড়ির পদবিটাও পুরুষতান্ত্রিকতার চিহ্নই বহন করছে। জাতিভেদ ও পুরুষতান্ত্রিকতার স্মারক পদবিকে বর্জন করে সুস্থ সমাজের যে স্বপ্ন আমরা ২৬ বছর আগে দেখেছিলাম, সেটা এই আধুনিক নেট যুগেও ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্রে পদবি আবশ্যক না হলেও, ব্যাঙ্ক এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পদবি আবশ্যক হওয়ায় ফর্ম পূরণের সময় অসুবিধেয় পড়তে হয়। এই নিবন্ধটি পড়ে আবার সেই দিনের স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করছে, যখন কোথাও পদবি আবশ্যক থাকবে না।

প্রান্তিকা, আন্দুল-মৌড়ি, হাওড়া

 

অর্থহীন

পদবিমুক্ত সমাজ এই সময়ে খুব জরুরি। যত সময় যাচ্ছে, ততই ব্যক্তি-মানুষকে ছেড়ে তাঁর ধর্ম ভাবনা, ধর্ম পরিচয়ের গভীরে ঢুকে পড়ছে। অথচ এ রকমটা হওয়ার কথা ছিল না। যত সময় যাবে, তত এক জন ব্যক্তি তাঁর মানুষ পরিচয়েই সমাজে বেঁচে থাকবেন, এটাই কাম্য ছিল। তা হয়নি। আজও আমাদের সমাজে এক জন মানুষ আগে ধর্ম পরিচয় ও তার পর জাতগত পরিচয়ে বড় হন। যেন এটাই স্বাভাবিক।

মানুষের প্রাথমিক পরিচয় তাঁর নামে। এই নাম দিয়েই বুঝে নেওয়ার চেষ্টা হয় তিনি কোন ধর্মের, কোন জাতের। আর নামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা পদবির দাবি এতটাই বেশি যে, একটু এ দিক-ও দিক হলেই ‘গেল গেল’ রব ওঠে। অথচ লেজুড় হিসেবে সেঁটে-থাকা পদবি অর্থহীন শব্দমাত্র। পদবির উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, ইতিহাস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই বিষয়টি জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। লোকেশ্বর বসুর আমাদের পদবির ইতিহাস, খগেন্দ্রনাথ ভৌমিকের পদবির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস তা-ই বলে। পদবি ছেঁটে ফেলার উদ্যোগ বাংলায় নতুন নয়। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞান আন্দোলন, যুক্তিবাদী ভাবনার পথ ধরে অনেকেই পদবি পরিত্যাগ করার পথে হেঁটেছেন। তবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড ইত্যাদির বেড়াজালে ফেঁসে গিয়ে ইচ্ছে থাকলেও আর নিজেদের পদবি বদলের সাহস হয়নি।

আমাদের কন্যার জন্ম হয় ২০১০ সালে। মেয়ের নাম দেওয়া হয় রিমঝিম বৃষ্টি। বিপত্তি বাধল বালি মিউনিসিপ্যালিটিতে মেয়ের বার্থ সার্টিফিকেট তুলতে গিয়ে। ফর্ম ফিল-আপ করার পর কেরানি বললেন, সন্তানের বার্থ সার্টিফিকেটে বাবার পদবি থাকবে, সেটাই কাম্য। বললাম, এ রকম কোনও লিখিত নির্দেশ দেখাতে পারেন? আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে তিনি ফিরে এসে বেশ বিরক্ত মুখেই বললেন, ‘‘হ্যাঁ, শুধু বৃষ্টি নয়, এর পর আকাশ-ঝড়-জল-রোদ যা যা আপনি চাইবেন সবই দিয়ে দেওয়া যাবে।’’ সেই থেকেই আমাদের মেয়ের পদবি-হীন, অথচ অর্থযুক্ত নামে সরকারি শিলমোহর পড়ল। এর পর স্কুলে ভর্তি হওয়া নিয়ে কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। আমরা চাই, রিমঝিম বৃষ্টি এই অর্থবোধক নাম নিয়েই বড় হয়ে উঠুক। কেন ওর নাম অন্যদের থেকে আলাদা, তা বুঝুক। পছন্দ না হলে বড় হয়ে পাল্টে নেওয়ার সুযোগ তো রইলই।

সমীর ঘোষ, শ্রীরামপুর, হুগলি

 

বেদে নেই

একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চাকরি করার সময় দেখেছিলাম বিহার থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদের অনেকে পদবি ব্যবহার করত না। কারণ পদবি জাতকে চিহ্নিত করে। বিহারে জাতপাতের সমস্যা প্রবল।

বেদ, পুরাণ, জাতক বা কথাসরিৎসাগর তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও পদবির চিহ্নমাত্র পাওয়া যাবে না। উপনিষদে কোনও কোনও নামে অবশ্য দু’টি অংশ লক্ষ করা যায়। যেমন, উদ্দালক আরণি, সত্যকাম জাবালি। এখানে নামের সঙ্গে যুক্ত পিতা বা মাতার পরিচয়। দু’টি মহাকাব্যে কোনও পদবির সন্ধান মেলে না। ইতিহাসে কালিদাস, বাণভট্ট, হর্ষবর্ধন, কনিষ্ক, বরাহমিহির, আর্যভট্ট, মৈত্রেয়ী, খনা, অপালা প্রমুখও পদবি-হীন। মধ্যযুগে সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থার ফলে ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমান্তরালে বাঙালির পদবির বিকাশ ঘটেছে বলে মনে করা হয়। ব্যক্তির নামের শেষে উপাধি, উপনাম কিংবা পেশাগত, বংশসূচক নামকে সাধারণ ভাবে পদবি বলা হয়।

এক জন মানুষ তাঁর কর্মগুণে স্বীকৃতি লাভ করবেন, এটাই প্রত্যাশা। এখন আর চাষির ছেলে চাষি হন না, তাঁতির ছেলে তাঁতি হন না। তাঁরা উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করে নানা রকম পেশায় চলে যাচ্ছেন। পেশাভিত্তিক বা বংশগত পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে সামাজিক অবস্থান এখন আর নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নামের পদবী’ (১৯৩১) প্রবন্ধে বলেছেন, “…মেয়েরই হোক, পুরুষেরই হোক পদবী মাত্রই বর্জন করবার আমি পক্ষপাতী। ভারতবর্ষে অন্য প্রদেশে তার নজীর আছে…।’’ এই প্রবন্ধেই তিনি মহিলাদের বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্ৰহণ করার বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘‘বিবাহিতা স্ত্রীর নামকে স্বামীর পরিচয়ভুক্ত করা ভারতবর্ষে কোন কালেই প্রচলিত ছিল না।’’

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

 

কঠিন যুদ্ধ

প্রথম সন্তানের নামের সঙ্গে পদবি দিতে চাইলাম না। সালটা ২০১৫। যুদ্ধ বেশ কঠিন ছিল। আধিকারিক পদবি ছাড়া কোনও মতেই বার্থ সার্টিফিকেট দিতে চাইছিলেন না। বার বার পুরসভায় চক্কর কাটতে কাটতে অবশেষে আদালতে যাওয়ার কথা বলতেই উনি পদবি ছাড়া বার্থ সার্টিফিকেট তৈরি করে দিলেন। মনে মনে বললাম,  ‘‘অজাতশত্রু, তুমি বামুন, মাহাত, এইসব চক্করে না পড়ে মানুষ হও।’’ ২০১৯ সেপ্টেম্বর, দ্বিতীয় সন্তান। এ বারে আর খুব একটা অসুবিধা হয়নি সার্টিফিকেট পেতে। এই প্রাবন্ধিকও নিজের পদবি অন্তত তাঁর লেখার ক্ষেত্রে বাদ দিতেই পারতেন। বাদ দিলেন না।

অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিম মেদিনীপুর

 

গোপাল, রাখাল

সোনালী দত্ত বলেছেন, “লিঙ্গ, ধর্ম, জাত এই সব ভোটের ময়দানে বড় খেলোয়াড়।” শুধু ভোট কেন, সঙ্কীর্ণ রাজনীতিতে জায়গা করে দিতে, একটা পরিসরে গ্রহণযোগ্য করাতে, পদবি হয়ে যায় একটা মোক্ষম হাতিয়ার। মানুষে মানুষে সম্পর্ক, পারস্পরিক মেলামেশাও বহু ক্ষেত্রেই পদবি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই স্নেহার মতো যাঁরা মুক্তমনা, ‘ধর্মহীন নাগরিক’ হওয়ার চেষ্টায় আছেন, তাঁরা পদবিকে বোঝা হিসেবে মনে করবেন, এটাই স্বাভাবিক।

শিশু মনে সামাজিক মননের সঙ্গে জারিত পদবি ছাপ রেখে যায় বলেই হয়তো বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয়-এর দ্বিতীয় ভাগে যে নামগুলি ব্যবহার করেছেন, যেমন, গোপাল, রাখাল, নবীন, গিরিশ, ভুবন— তাদের পদবি উল্লেখ করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, জাতপাত, ধর্মে-বর্ণে দীর্ণ সমাজে পদবি ভেদাভেদের দেওয়ালকে শক্ত হতে সাহায্য করে। তিনি হয়তো চাননি, শৈশব থেকেই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বর্ণ, জাত, ইত্যাদিকে ভিত্তি করে প্রাচীর তৈরি হোক। এ সবই তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার ফসল।

গৌরীশঙ্কর দাস, সাঁজোয়াল, পশ্চিম মেদিনীপুর

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন