Advertisement
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Kazi Nazrul Islam

সম্পাদক সমীপেষু: কাব্যরসের বিপরীতে

কবি নজরুল নিজে যেমন গীতিকার, তেমনই মহান সুরকারও। তাঁর সুর-করা গানগুলো এত কাল কোটি কোটি শ্রোতার ভাল লেগেছে, তাঁদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। নজরুলের গান বাঙালির অমূল্য আবেগের সম্পদ।

An image of Kazi Nazrul Islam

কাজী নজরুল ইসলাম। —ফাইল চিত্র।

শেষ আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৪:২৭
Share: Save:

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘একেই তছনছ করা বলে’ (১৪-১১) সময়োপযোগী। এ আর রহমানের নতুন করে সুর দেওয়া নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বাঙালি সমাজে। এঁদের মধ্যে আছেন নজরুলের পরিবারের সদস্য, বাংলার বিশিষ্ট সুরকার ও শিল্পী আর সাধারণ মানুষ। নতুন ভাবে সুর করা গানটি অনেকেরই ভাল লাগেনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চাইতেন, তাঁর গান যেন তাঁর গান বলেই মনে হয়। তিনি নিজেই ছিলেন গীতিকার ও সুরকার। ‘তাঁর গান’ বলতে তিনি যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা তিনি তাঁর একাধিক লেখায় বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়েছেন। তাঁর গানে কী কী না থাকা বাঞ্ছনীয়, তা-ও নানা ভাবে উল্লেখ করেছেন। নজরুল ইসলাম হয়তো তেমন ভাবে কিছু বলেননি। তবে কয়েকটি কথা মনে রাখা দরকার।

প্রথমত, কবি নজরুল নিজে যেমন গীতিকার, তেমনই মহান সুরকারও। তাঁর সুর-করা গানগুলো এত কাল কোটি কোটি শ্রোতার ভাল লেগেছে, তাঁদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। নজরুলের গান বাঙালির অমূল্য আবেগের সম্পদ। ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি কালজয়ী। গানটির কথা ও সুর মর্মস্পর্শী, মূল ভাব ও সুরের চলন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে। একে অপরের পরিপূরক। হঠাৎ রহমান কেন সম্পূর্ণ এক গানকে নতুন করে বাঁধতে গেলেন, বলা কঠিন। তা ছাড়া, নতুন সুরটি গানের কথার অনুসারী হয়ে ওঠেনি মোটেই। ভাষার পার্থক্য এবং রচনার ইতিহাস না বোঝার জন্য এমনটা ঘটে গিয়েছে বলে মনে হয়। চলচ্চিত্রের প্রয়োজন থাকলেও এই সুরারোপ সমর্থনের যোগ্য নয়।

নজরুলের মতো এমন এক জন মানুষের সৃষ্টিকে কাব্যরসের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে গিয়ে পরিবেশন করা যায় কি না, তা ভাবার সময় এসেছে। আরও একটা কথা— যে-হেতু একটি বিশেষ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করার জন্য ওই গানে সুরারোপ করা হয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে রহমানের সম্পূর্ণ একার দায় বলেই বা ধরা হবে কেন? কোনও কোনও মহল থেকে রহমানের সুর করা ‘বন্দে মাতরম্’ প্রসঙ্গও এসেছে। ওই গানটির রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তবে তিনি নিজে গানটিতে সুর দিয়ে যাননি। অন্য সুরকারেরা বিভিন্ন সময়ে গানটিকে সুরে বেঁধেছেন। কোনও সময়েই বন্দে মাতরম্-এর সুর (রহমানের দেওয়া সুরটিও) রহমানের সুরারোপিত ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর মতো অসঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।

তনুজ প্রামাণিক, হাওড়া

সুপ্রযুক্ত সুর

‘একেই তছনছ করা বলে’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে ১৯৪৯ সালে রেকর্ড করা গিরিন চক্রবর্তীর গাওয়া নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটির নতুন সুরারোপিত সংস্করণটি সম্পর্কে লেখক মন্তব্য করেছেন, “কিছু হয়নি।” কথাটি আমাকে কিছুটা বিস্মিত ও হতাশ করেছে। অস্কারজয়ী এ আর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় নবনির্মিত এই গানটি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের নভেম্বরে গরিবপুরের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমস্ত বাধাবিপত্তির বিরুদ্ধে গর্জে-ওঠা নজরুলের এই গীতিকবিতা (১৯২১ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের কারাবরণের সময়ে রচিত) পঞ্চাশ বছর পরে, অনেকটা একই পরিবেশে, তেমনই বজ্রনির্ঘোষে পরিবেশিত হওয়া হয়তো অনেকের কাছে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে। তবে এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, ভারতের স্বাধীনতা লাভের ৭৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আগের মতো সেই গর্জে-ওঠা বিপ্লবী জঙ্গি ভাবটা বজায় রাখার প্রয়োজন না-ও হতে পারে। তাই হয়তো নজরুলের গানে সেই বিদ্রোহী ঝাঁঝের তুলনায় রহমানের অপেক্ষাকৃত স্তিমিত, কিছুটা নরম সুর দেওয়া হয়েছে। এ গানটিতে যেন পরঞ্জয়ের আনন্দোৎসবে শামিল হতে শ্রোতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গানের মাঝে “তেল-ছিটকে-ওঠা ও-ও-ও-ও-ও” অংশটি নিয়ে প্রবন্ধকার প্রশ্ন করেছেন, “কোন ঘটের কাঁটালি কলা?” আমার কিন্তু তাকে সুপ্রযুক্ত, এবং সম্পূর্ণ গানটির সেরা অংশ বলেই মনে হয়েছে।

মনোজ ঘোষ, কলকাতা-৬১

রাজধর্ম

‘হিন্দুশৌর্যের প্রতীক?’ (৫-১১) শীর্ষক বিশ্বজিৎ রায়ের প্রবন্ধটি সম্পর্কে কয়েকটি কথা। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার লিখেছেন, “মোটা দক্ষিণার লোভে সকলেই শিবাজীর ক্ষত্রিয়ত্ব স্বীকার করিল।” আবার তিনিই লিখেছেন, “ফলত শিবাজী হিন্দু জাতির সর্বশেষ মৌলিক গঠন-কর্তা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মবীর।” শিবাজি ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু। গোঁড়া হিন্দু নন। যদুনাথ সরকারকে অনুসরণ করে বলা যায়, শিবাজির শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে মরাঠাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা, তাদেরকে একসূত্রে গেঁথে ‘নেশন’-সৃষ্টির সূচনা। যদুনাথ সরকার আরও বলেছেন, এমন কাজ জগতের ইতিহাসে প্রায়শই নতুন ধর্মপ্রবর্তকেরাই করে থাকেন, কখনও কখনও কোনও কোনও দেশে এক জন মহাপুরুষ নেতা, বা অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভাশালী পুরুষও তা করতে পারেন। শিবাজি এই শ্রেণির ‘মহাপুরুষ’ ছিলেন, তাই তাঁকে আজও মহারাষ্ট্রে এবং অন্যান্য প্রদেশের অধিবাসীদের মধ্যে দেবতার মতো পুজো করা হয়।

যদুনাথ বলেছেন, কোনও কোনও মরাঠি লেখক বলেন, শিবাজির উদ্দেশ্য ছিল হিন্দবী স্বরাজ স্থাপন করা। এ কথা বললে ইতিহাসের সত্যের বিরুদ্ধে যাওয়া হয়। তিনি হিন্দবী স্বরাজ চাননি, চেয়েছিলেন ‘সুরাজ’— অর্থাৎ সর্ববিধ প্রজার হিতে নিজেকে উৎসর্গ করে রাজপদকে ঈশ্বরের বা গুরু রামদাসের তহবিলদারি মনে করে সুখ-সম্ভোগ, দম্ভ দমন করে এক মনে ন্যায়ের জয়, অন্যায়ের দমনে জীবন ব্যয় করতে। সে অন্যায় কে করছে, হিন্দু না মুসলমান, এটা বিবেচ্য নয়। কারণ হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, সকলেই তাঁর রাজ্যে ধর্ম ও পদ সম্বন্ধে সমান সুবিধা পেতেন। তিনি মুসলমান সাধকদের, ও কোরানকে কম শ্রদ্ধা করতেন না। তাঁর দান সন্ন্যাসী ও দরবেশকে সমভাবে আশ্রয় দিত। নারী তাঁর রাজ্যে অনাচারীর হাত থেকে রক্ষা পেত। অসংখ্য মুসলমান উচ্চপদ লাভ করেছিলেন।

নিষ্ঠাবান হিন্দু রাজা হিসাবে শিবাজি সর্ব ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতি, উপাসনালয় ও শাস্ত্রগ্ৰন্থকে সম্মান করতেন। তাঁর আদর্শকে ভুলে যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে নরহত্যা ও গৃহদাহ করে, তারাই শিবাজিকে ছোট করে। শিবাজি অবশ্যই হিন্দু শৌর্য ও বীর্যের প্রতীক, কিন্তু সেই হিন্দুধর্ম বেদান্তের ধর্ম, সহনশীলতার ধর্ম। এই ধর্ম সকলকে গ্ৰহণ করতে শেখায়, বর্জন করতে নয়। উনিশ শতকে যে ধর্মের কথা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে তুলে ধরেছিলেন। এই দিক থেকে বিবেচনা করে সর্বজনপূজ্য স্বামী রামদাস যথার্থই বলেছিলেন— শিবাজিকে স্মরণ রাখবে।

সন্দীপ সিংহ, হরিপাল, হুগলি

প্রেক্ষাপট

১৯২১ সালের ডিসেম্বর। মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে শামিল হওয়া একের পর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী কারারুদ্ধ হচ্ছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে হুগলির জেলে আটকে রাখে ব্রিটিশ সরকার। সেই সময় কবি নজরুল ইসলাম বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা থেকে কলকাতায় সদ্য ফিরেছেন। চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী দ্বারস্থ হলেন ২২ বছর বয়সি কাজী নজরুল ইসলামের। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়েই ২০ জুন, ১৯২২ সালে নজরুল লিখলেন ‘ভাঙার গান’— “কারার ঐ লৌহকপাট”। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট না বুঝেই ছবিতে ব্যবহৃত গানের সুরের সঙ্গে মূল গানের কথার গাম্ভীর্য, তাল, পঙ্‌ক্তির উচ্চারণ কালের কোনও সামঞ্জস্য না থাকায় সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ। স্রষ্টার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে নিয়ে গিয়ে ‘রি-মেক’ পরিবেশন করা যায় কি না, তা ভাবার সময় হয়েছে।

অমিয় বিশ্বাস, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE