শাবাশ দিলীপ ঘোষ! এত দিন ভাবতাম, সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুর পারেন (বলেছেন, গোমূত্র খেয়ে ক্যানসার সেরেছে), উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী টি এন রাওয়াত পারেন (বলেছেন, গরুই একমাত্র প্রাণী যে নিঃশ্বাসে অক্সিজেন ছাড়ে), আমরা কেন পারি না? দিলীপবাবু সবাইকে টেক্কা দিলেন গরুর দুধে সোনা আবিষ্কার করে। ‘আমরা বাঙালি’ বেঁচে থাকলে আর এক বার রাতের দেওয়ালে লেখা হত ‘‘বাঙালি গর্জে ওঠো’’। মাঝে মাঝে ভাবি, পাকিস্তান, চন্দ্রযান এবং গরু না থাকলে, বিজেপির অস্তিত্ব থাকত?

অবশ্য মমতা অনেক দিন আগে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এই গোপ্ৰীতি টের পেয়ে স্বরচিত (এবং বহুল আলোচিত) একটি কবিতার নাম রেখেছিলেন ‘হাম্বা’! এ বার দুধ নিয়ে, মূত্র নিয়ে যত ইচ্ছে বাতেলা ছাড়ো; গরুর ডাকে হাত দিতে গেলেই কিন্তু কপিরাইটের ফাঁদে!

দেবাশিস মিত্র

কলকাতা-৭০

গরুর রচনা

গোধন লইয়া সাম্প্রতিক মাতামাতি, রামগরুড়ের ছানার ন্যায় নিস্তরঙ্গ জীবনে যথেষ্ট আমোদের উদ্রেক করিয়াছে। সংশয় একটিই, গরুর রচনায়, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীগণ গরুর এই গুণগুলির কথা লিখিলে, নম্বর পাইবে তো? ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত সমস্ত কথাই বঙ্গমস্তিষ্ক সত্য জ্ঞান করে কিনা!

শঙ্খ অধিকারী

সাবড়াকোণ, বাঁকুড়া

বেঙ্গল প্যাক্ট

‘উদার জাতীয়তাবাদের দিশারি’ (৫-১১) নিবন্ধে অধ্যাপক সুগত বসু ‘দেশবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধার’ করতে গিয়ে ইতিহাসের যে একমাত্রিক ভাষ্য নির্মাণ করেছেন, সেই প্রসঙ্গেই এই পত্রের অবতারণা।

১৯২৩ সালের ১৬-১৭ ডিসেম্বর কলকাতায় চিত্তরঞ্জনের ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ গৃহীত হয়। প্যাক্টে বলা হয়, প্রাদেশিক আইনসভায় সদস্য, পৃথক নির্বাচন প্রথার মাধ্যমে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এবং স্থানীয় প্রশাসনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব হবে যথাক্রমে ৬০% ও ৪০%। এ ছাড়া সমস্ত সরকারি পদে মুসলমানদের জন্য ৫৫% আসন সংরক্ষিত থাকবে। যদিও ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কোকনদ কংগ্রেসে এই প্যাক্টকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

পরের বছর চিত্তরঞ্জন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন, আর মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক হন ২৭ বছরের সুভাষচন্দ্র। দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল এই পদে কাজ করার জন্য ৫০০ টাকা মাসোহারাতেই রাজি ছিলেন, কিন্তু সুভাষের বেতন নির্ধারিত হয় মাসিক ১৫০০ টাকা। শুধু তা-ই নয়, সুভাষের পদে শাসমলের মতো প্রবীণ মানুষকে বসাতে অনিচ্ছুক চিত্তরঞ্জন তাঁকে ‘মেদিনীপুরের ক্যাওট’ হিসেবে অভিহিত করেন, যাতে দেশবন্ধুর প্রবল জাতিবিদ্বেষ (কায়স্থ-মাহিষ্য) এবং চূড়ান্ত মফস্‌সল-বিরোধিতাই প্রকাশিত হয়।

ধর্মের ভিত্তিতে পদ সংরক্ষণের এই সূচনা শ্রুতিমধুর মনে হলেও, বাস্তবে চিত্তরঞ্জন কর্পোরেশনের মেয়র হয়ে মাত্র ২৫ জন মুসলমানকে নিয়োগ করতে পেরেছিলেন। এমনকি যশোহর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, নদিয়া, মেদিনীপুরের পুরসভা ও জেলা বোর্ডগুলির নির্বাচনে 

স্বরাজ দল সাফল্য পেলেও, প্যাক্টের শর্ত পালনে সেখানকার নির্বাচিত হিন্দু সদস্যরা কোনও উদ্যোগই গ্রহণ করেননি। এই সময়কালেই চিত্তরঞ্জন-সুভাষ জুটি পলতা জল প্রকল্প সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেসার্স কর অ্যান্ড কোম্পানিকে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কাজের বরাত দেওয়ার বিনিময়ে দলীয় ফান্ডে ৭৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন।

১৯২৫-এর জুনে চিত্তরঞ্জন মারা যাওয়ার অব্যবহিত পরে চিত্তরঞ্জনের সমস্ত পদে— প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, কলকাতার মেয়র এবং আইনভায় কংগ্রেস দলনেতা— বসেন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল করেন তিনি। শরৎচন্দ্র বসুও চুক্তি বাতিলের পক্ষেই ছিলেন এবং সুভাষ চুক্তিটিকে আগাগোড়া বাতিল না করে সংশোধনের আর্জি জানিয়েছিলেন মাত্র। প্যাক্টের এ-হেন করুণ পরিণতি দেখে পরিহাসের সুরে নজরুল লেখেন, “মস্‌জিদ পানে ছুটিলেন মিঞা, মন্দির পানে হিন্দু,/ আকাশে উঠিল চির-জিজ্ঞাসা, করুণ চন্দ্রবিন্দু”।

পরবর্তী কালে, সারা দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ যখন গাঁধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন এবং ব্রিটিশের নির্মম অত্যাচারের সম্মুখীন হয়ে দলে দলে কারাবরণ করছেন, তখন বাংলা প্রাদেশিক কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে তেমন উদ্যোগী না হয়ে, নিছক কর্পোরেশনের ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে তীব্র গোষ্ঠীকোন্দলে ব্যস্ত থাকেন। এই প্রেক্ষিতে জওহরলাল তীব্র বিরক্তিতে ১৯৩০ সালের ২৯ মার্চ 'Congress Dispute in Bengal'-এ লেখেন: "It has been an amazing sight— on the one side the country ringing with preparations for civil disobedience; on the other Congressmen spending their time and energy and money in attacking each other for the purpose of gaining admittance to the Calcutta Corporation."

এর প্রায় ১০ বছর পরে, ১৯৪০-এর কর্পোরেশনের নির্বাচনে কংগ্রেস-বহিষ্কৃত সুভাষ, কোনও দীর্ঘপ্রয়াসী ঐক্যের কারণে নয়, কেবলমাত্র মেয়র ও অল্ডারম্যান নির্বাচনের প্রশ্নে নির্বাচনের পূর্বে ও পরে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে বোঝাপড়ার চেষ্টা করেন। সেই আলোচনা ব্যর্থ হলে মুসলিম লিগের সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি। চুক্তি অনুযায়ী কর্পোরেশনের মেয়র হন আবদুর রহমান সিদ্দিকী এবং অল্ডারম্যান সুভাষ। আরও আশ্চর্যের কথা, যে সুভাষ ১৯৩৭ সালে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে অভিযুক্ত করেছিলেন, সেই হকেরই ১৯৪১-এর কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য হন শরৎ।

আসলে যতই হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূত্র হিসেবে এই বেঙ্গল প্যাক্টকে তুলে ধরার চেষ্টা হোক না কেন, এই চুক্তি শেষ অবধি মুসলমানগরিষ্ঠ বাংলায় ক্ষমতায় আসার জন্য মুসলমান নেতাদের সঙ্গে চুক্তি হিসেবে পরিগণিত হতে বাধ্য। চুক্তি অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে কেবলমাত্র শিক্ষিত মুসলমানদের সংরক্ষণের আওতায় এনে তুষ্ট করার চেষ্টা হলেও, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ অশিক্ষিত মুসলমান কৃষকদের অবস্থার উন্নয়নের কথা আদৌ বিবেচিত হয়নি। 

পাশাপাশি, সারা দেশে তখন বিরাজ করছিল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের পরিবেশ। ১৯২৪ সালে বাংলাতেও ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, পাবনা, রংপুর, যশোহর, উলুবেড়িয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক গন্ডগোলের খবর পাওয়া যায়, যা স্বরাজ দলের হিন্দু সদস্যদের সঙ্গে মুসলমানদের দূরত্ব বৃদ্ধির বিষয়টিকেই তুলে ধরে। ইতিহাসবিদ অমলেন্দু দে ‘বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ গ্রন্থে বেঙ্গল প্যাক্টের যথাযথ বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, “স্বভাবতই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর হওয়া সত্ত্বেও স্বরাজ্য পার্টি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে বাংলা দেশের রাজনীতিকে মুক্ত রেখে কোনও নতুন পথ নির্দেশ করতে সক্ষম হয়নি।”

নিছক প্রশাসনিক ক্ষমতা দখলের জন্য মুসলমানদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে বিবেচনা করা, তাঁদের প্রকৃত সমস্যাবলির সমাধানের বিষয়ে উদাসীন ও নিস্পৃহ থাকা, সাম্প্রদায়িক হানাহানি রুখতে ব্যর্থ হওয়া, ব্যবসায়ীদের বরাত পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে দলীয় তহবিলে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেওয়া, তীব্র দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, জাতীয় প্রেক্ষিতকে অবহেলা করে স্থানীয় স্তরে অধিক মনোনিবেশ করা, প্রয়োজনে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আসন বোঝাপড়া— সব কিছুই ১৯২৪ থেকে ১৯৪১ অবধি যা ছিল, ২০১৯ সালেও প্রায় তা-ই আছে।

দেবোত্তম চক্রবর্তী

দণ্ডপাণিতলা, নদিয়া

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।