×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৭ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

সম্পাদক সমীপেষু: ব্রহ্মানন্দ ও পরমহংস

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৪:৫৮

‘বিস্মৃত এক বাঙালি ধর্মসংস্কারক’ (পত্রিকা, ৬-২) তথ্যসমৃদ্ধ। তবে কেশবচন্দ্র সেনের জীবন-আলোচনায় এক বারও শ্রীরামকৃষ্ণের কথা বা প্রসঙ্গ উল্লিখিত হল না, সেটা আশ্চর্যের। কারণ, কেশবচন্দ্র-শ্রীরামকৃষ্ণ সংযোগ ও সম্পর্ক ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছিল। ১৮৭৫ সালেই ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকায় কেশবচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে লিখেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মুক্তচিন্তায় আকৃষ্ট হয়ে তিনি সবন্ধু-পারিষদ বেশ কয়েক বার দক্ষিণেশ্বরে এসেছিলেন; কখনও শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে স্টিমারে গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণ করেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণও একাধিক বার কেশবের কমল-কুটিরে (লিলি কটেজ) এসেছেন। এখানেই ১৮৭৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দণ্ডায়মান অবস্থায় সমাধিস্থ শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি তোলা হয়।

কেশবচন্দ্রকে নিয়ে মাতামাতিতে কেউ সমালোচনা করলে শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, “(কেশব) ঈশ্বরচিন্তা করে, হরিনাম করে।” অন্য দিকে শ্রীরামকৃষ্ণের উপস্থিতিতে কেউ কেশবের উপদেশ চাইলে তিনি বলতেন, “এখানে কথা কওয়া কামারের নিকট ছুঁচ বিক্রি করতে আসা।” অসুস্থ কেশবকে দেখতে ১৮৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণ কমল কুটিরে যান। কেশব দেওয়াল ধরে ধরে এসে তাঁকে প্রণাম করে ভাবের ঘোরে বলতে থাকেন, “আমি এসেছি, আমি এসেছি”, শ্রীরামকৃষ্ণের বাঁ হাত নিজের হাতে ধরে হাত বোলাতে থাকেন। এ-ই তাঁদের শেষ সাক্ষাৎ। কেশবচন্দ্রের দেহত্যাগ ১৮৮৪ সালের ৮ জানুয়ারি। বিভিন্ন সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ তিনি সবিনয়ে গ্রহণ করেছেন। বাঙালি বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দকে যে ভাবে মনে রাখে, কেশবচন্দ্র সেনকে সে ভাবে নয়। হয়তো, অসাম্প্রদায়িক শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের জোয়ারে ব্রাহ্ম সমাজের ধর্ম সংস্কার ভেসে যাওয়া, ক্ষয়িষ্ণু হয়ে ওঠাও তার কারণ।

রমাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, কলকাতা-২৬

Advertisement

ধর্ম সংগঠক

বিস্মৃত মনীষী কেশবচন্দ্র সেনের ধর্ম সংস্কারক সত্তার সমন্বয়ী রূপটি তুলে ধরেছেন সুদেষ্ণা বসু। কিন্তু আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় স্মর্তব্য। কেশব তাঁর অনুগামীদের বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র আলোচনায় নিরত করে ভারতীয় ধর্মালোচনার দিগন্ত প্রসারিত করেন। তাঁর পরামর্শমতো উপাধ্যায় গৌরগোবিন্দ রায় হিন্দু, গিরিশচন্দ্র সেন ইসলাম, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার খ্রিস্ট, অঘোরনাথ গুপ্ত বৌদ্ধ, মহেন্দ্রনাথ বসু শিখ শাস্ত্রচর্চায় পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন। বাংলায় প্রথম কোরানের অনুবাদক হিসেবে গিরিশচন্দ্র সেনের খ্যাতি আছে। বাকিরাও তাঁদের নিজের নিজের ক্ষেত্রে কৃতবিদ্য। তাই বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম-সংগঠকরূপেও তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। ধর্মচর্চার যে ধারার প্রবর্তন করেছিলেন কেশবচন্দ্র, পরবর্তী কালে সেই ধারার সার্থক উত্তরসূরি মহেশচন্দ্র ঘোষ কেশবচন্দ্রকে ‘আমাদের পিতা’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রসঙ্গত জানাই, ২২ অগস্ট, ১৮৬৯ সালে নবনির্মিত ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ শুধু তার দ্বারোদ্ঘাটনই করেননি, অনুষ্ঠানে আচার্যের কাজও করেছিলেন। দেবেন্দ্রনাথের কার্যপদ্ধতির সঙ্গে তাঁর মতের অমিল হলেও দেবেন্দ্রনাথকে কেশব চিরকাল তাঁর আচার্যের আসনেই অধিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছেন। তাই এই বিষয়ে আমন্ত্রণ-পত্রের সঙ্গে চিঠিতে লিখেছিলেন: “ইহাতে যে কেবল আমাদের মঙ্গল হইবে তাহা নহে, ব্রাহ্মসমাজের মঙ্গল, দেশের মঙ্গল হইবার সম্ভাবনা। এই ব্রাহ্মমন্দির যাহাতে আদি সমাজের বিরোধী বলিয়া পরিগণিত না হয়, তাহার উপায় করুন।”

লেখক মূলত প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের লেখনীর সূত্রে মন্তব্য করেছেন, কোচবিহার-বিবাহ পর্বের পর দেশে-বিদেশে সমালোচনার বন্যায় কেশবচন্দ্র মানসিক ভারসাম্য হারান। কিন্তু কেশব-অনুগামী তথা আচার্য কেশবচন্দ্র-এর লেখক গৌরগোবিন্দ উপাধ্যায়ের বর্ণনায় এই সময় অভূতপূর্ব সংযমী, আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ কেশবচন্দ্র সেনকে দেখতে পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় সম্পর্কের বন্ধন এই পর্বেই। এই দুই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদান বাঙালির অধ্যাত্ম-চর্চায় নিঃসন্দেহে চিরকালীন সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।

পরিশেষে, একটি তথ্যপ্রমাদ চোখে পড়ল। ১৫ মে, ১৮৭৮ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ নয়, তৈরি হয় সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ। ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা হয় ১১ নভেম্বর, ১৮৬৬ সালে।

অর্ণব নাগ, কলকাতা-১৫৭

আঘাত

সুদেষ্ণা বসু কেশবচন্দ্রের অনেক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেছেন, কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ পড়ে গিয়েছে। ১৮৫৪ সাল। মেট্রোপলিটন কলেজ ছেড়ে কেশবচন্দ্র ভর্তি হলেন হিন্দু কলেজে। ১৮৫৬ সালে তিনি সিনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বসেছিলেন। ছোট থেকেই তিনি পড়াশোনাতে অত্যন্ত মেধাবী। স্বভাবেও তিনি শান্ত, নম্র। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, সে দিন পরীক্ষা হলে কর্তব্যরত অধ্যাপকের নজরে পড়ল, কেশব নকল করছেন। অধ্যাপক ভয়ানক রেগে গেলেন। তিনি কেশবচন্দ্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করলেন। জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প নবজাগরণ বইটিতে এই ঘটনার কথা পাওয়া যায়।

এই অপমান তাঁকে প্রচণ্ড আঘাত করে। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, “তিনি সমবয়স্কদের সঙ্গ পরিত্যাগ করেন” (রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ)। অপমানে কেশবচন্দ্র ঘরবন্দি এবং প্রায় বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু দেখা গেল, এই ঘোর বিষাদের মধ্যেই তাঁর মনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। মনে মনে তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেন। সৌভাগ্যের কথা, এই বছরেই তিনি আমেরিকান ইউনিটেরিয়ান মিশনারি ড্যাল সাহেব ও সুবিখ্যাত পাদ্রি লং সাহেবের সান্নিধ্যে আসেন। এই ১৮৫৬ সালেই কেশবের বিয়ে হয়। সুদেষ্ণা বসু উল্লেখ করেছেন, “এ সময় এক অদ্ভুত বৈরাগ্য ওঁকে পেয়ে বসে...।” আসলে তখন কেশবচন্দ্র জীবনটাকে বিশেষ ভাবে কাজে লাগাতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন।

প্রবীর চক্রবর্তী, জয়নগর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

বিবাহ-বিতর্ক

‘বিস্মৃত এক বাঙালি ধর্মসংস্কারক’ শীর্ষক প্রবন্ধে যেটি উল্লিখিত নেই তা হল, ৬ মার্চ ১৮৭৮ সালে বিয়ের দিন পাত্রী সুনীতি দেবী ও পাত্র নৃপেন্দ্রনারায়ণ দু’জনেই ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক। সুনীতি দেবীর বয়স ছিল ১৩ বছর ৫ মাস ও নৃপেন্দ্রনারায়ণের ১৫ বছর ৫ মাস। কিন্তু কেশবচন্দ্র-প্রবর্তিত ১৮৭২ সালের ‘বিশেষ বিবাহ-বিধি’ মেয়েদের ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর ও ছেলেদের ১৮ বছর নির্ধারণ করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ আগ্রহে বাংলার এই ঐতিহাসিক বিয়ে, কেশবচন্দ্রের উপস্থিতিতে ব্রাহ্মবিধান অনুসারে কোচবিহারের পুরাতন রাজপ্রাসাদে সম্পন্ন হয়। বিশেষ বিবাহ-বিধি অনুযায়ী যে হেতু পাত্র-পাত্রী অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাই কেশবচন্দ্র শর্ত আরোপ করেছিলেন যে, এই বিবাহকে বাগদানের মতো গ্রহণ করতে হবে। শর্তানুসারে, দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত পৃথক ভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সুনীতি দেবী কলকাতায় ফিরে আসেন। নৃপেন্দ্রনাথও বিয়ের কয়েক দিন পরে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেত যাত্রা করেন। ১৮৭৯ সালে নৃপেন্দ্রনারায়ণ দেশে ফিরে আসেন এবং সুনীতি দেবী ও নৃপেন্দ্রনারায়ণ, উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর, ১৮৮০ সালে কলকাতার ভারতীয় ব্রাহ্মমন্দিরে তাঁদের বিবাহ-পরিপূরক অনুষ্ঠানকার্য সম্পন্ন হয়।

যিনি আইনের প্রবক্তা তিনিই আইনভঙ্গ করেছেন, এই অভিযোগ করেন কেশবচন্দ্রের অনুগামীরা। তাঁরা কেশবচন্দ্রের উপর ভয়ানক চটেছিলেন এবং বলেন যে, ব্যক্তিস্বার্থের কারণে তিনি জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন।

প্রসন্নকুমার কোলে, শ্রীরামপুর, হুগলি

Advertisement