জালিয়ানওয়ালা বাগ গণহত্যার শতবর্ষ পূর্তি স্মরণ করে প্রায় সমস্ত পত্রপত্রিকায় সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে এই বর্বরতাকে ধিক্কার জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে, ওই অপমানের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়লেও, মহাত্মা গাঁধী-সহ কংগ্রেস নেতারা আশ্চর্যজনক ভাবে তেমন জোরালো প্রতিবাদ করলেন না। এমনকি চিত্তরঞ্জন দাশ-সহ বাংলার নেতারা প্রায় চুপ রইলেন। প্রতিবাদ করলেন একা রবীন্দ্রনাথ। পরে ভগৎ সিংহ প্রমুখ বিপ্লবীদের কাছে জালিয়ানওয়ালা বাগ হয়ে উঠেছিল প্রেরণার উৎস।

কিন্তু কী প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছিল আজকের শাসক বিজেপি-আরএসএস’এর পূর্বসূরি পঞ্জাব হিন্দু সভার কাছ থেকে? (এই সংগঠনের পথ বেয়েই ১৯২১ সালে সর্বভারতীয় স্তরে হিন্দু মহাসভা নামক সংগঠন তৈরি হয়। যার ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয় আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি)।

তারা রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহের বিরোধিতা করেছিল। শুধু তা-ই নয়, জালিয়ানওয়ালা বাগ গণহত্যার পর, সত্যাগ্রহের নামে এই ‘অরাজকতা’র নিন্দা করে তারা ব্রিটিশদের প্রতি ‘গভীর আনুগত্যের’ শপথ নিয়েছিল (‘দ্য পঞ্জাব হিন্দুসভা অ্যান্ড কমিউনাল পলিটিকস, ১৯০৫-১৯২৩’, কে এল তুতেজা, ফ্রন্ট লাইন, ১৪ মার্চ ২০০৩)।

এখানেই শেষ নয়, ব্রিটিশদের ভারতে আগমনকে প্রণতি জানিয়ে তারা বলেছিল, ‘‘ঈশ্বরের অসীম কৃপায় আর্যজাতির গুরুত্বপূর্ণ দু’টি শাখা, যা সুদূর অতীতে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, আবার এক হতে পেরেছে। এক জাতি অপরটিকে রাজনৈতিক পথনির্দেশ এবং সুরক্ষা প্রদান করেছে। যে সাম্রাজ্যের সূর্য কখনও অস্ত যায় না, তার প্রজা হিসাবে আমরা গর্বিত এবং এই প্রাপ্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রমাণ করতে আমরা সর্বদা সচেষ্ট।’’ (সূত্র: ‘দ্য পঞ্জাব হিন্দুসভা...)।

ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! সে দিনের সেই ইংরেজভক্ত হিন্দু মহাসভার উত্তরসূরি বিজেপি আজ আমাদের দেশপ্রেমের পাঠ দিতে চাইছে! 

দেবাংশু দাশগুপ্ত

কলকাতা-৩৪

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

ঘরের খেয়ে

‘‘অনেকের বাড়িতে খেয়ে চাকরি করতে অসুবিধা হচ্ছে। তাদের সমস্যার সমাধান হবে।’’— দিনহাটার বিধায়ক উদয়ন গুহর সোশ্যাল মিডিয়ায় এই হুমকি রাজ্য সরকারি কর্মীদের হৃৎকম্পন ঘটিয়েছে। আর যা-ই হোক, সরাসরি ক্ষমতাসীন বিধায়কই বদলির ফরমান দিচ্ছেন। প্রতি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি কর্মীদের ভীতিপ্রদর্শনার্থে তাঁর এই চেতাবনি প্রদানের প্রচেষ্টা। পে-কমিশনহীন ২৯% মহার্ঘভাতাবিহীন কর্মীদের যদি তল্পি গুটিয়ে চাকরি রক্ষা করতে নেপালের বর্ডারে যেতে হয়, তবে ইতিমধ্যে নাভিশ্বাস ওঠা কর্মীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগে বিলম্ব হবে না। রাজ্য সরকার যেখানে বলছে ভোটে নিরাপত্তা দিতে রাজ্য পুলিশই কাফি, সেখানে...। হয় সরকারি সিদ্ধান্ত নীরবে গ্রহণ, নয়তো বদলি— কর্মীদের প্রতি রাজ্য সরকারের সোজাসাপ্টা বার্তা।

আমরা কিন্তু উদয়নবাবুকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁর বিবৃতি আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। অনেকে বলেন, বদলি নিয়ে এত বলাবলি কেন? বদলি তো সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা হওয়া উচিত। তৈরি হওয়া ঘুঘুর বাসাগুলো ভাঙে। সরকারি কর্মীর অপকর্ম আটকাতে অনেক আইন আছে। কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষতার সঙ্গে সঠিক ভাবে সে সব প্রয়োগ করলে কারও কিছু বলার নেই। কিন্তু বদলি কেন? ওটা তো কোনও শাস্তি নয়।

বিষয়টি ভিন্ন। বিগত দিনে কলকাতার ডিরেক্টরেট, সেক্রেটারিয়েটগুলোতে নিয়োগ হত পিএসসি-র মাধ্যমে। কলকাতাবাসীদের কথা ছেড়ে দিলাম, দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে যাঁরা নিযুক্ত হতেন, তাঁরাও পরিবার-সহ সংসার পেতে থিতু হতেন কলকাতায়। জেলাগুলিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল ভিন্ন, কিন্তু নিয়োগ হত কর্মীর বাড়ির কাছের দফতরে। অধিকাংশের ক্ষেত্রে। চাকরিপ্রার্থীদের একটা বড় অংশ অন্যান্য প্রতিপত্তিশীল, উচ্চ বেতনের চাকরির চেয়ে, রাজ্য সরকারি করণিকের নিম্ন বেতনের চাকরিটি পছন্দ করতেন একটি বিশেষ কারণে। এ চাকরিতে বদলি নেই, বা সম্ভাবনা নিতান্ত কম। সরকারের ঘোষিত পদ্ধতির নিরিখে।

গাল পাড়তেই পারেন। বাঙালি ঘরকুনো। উচ্চাকাঙ্ক্ষার এই অভাবই জাতটাকে গোল্লায় দিল। কিন্তু কোনও ব্যক্তি তো উচ্চতর সামাজিক প্রতিষ্ঠা, সচ্ছলতার চেয়ে, বাবা, মা, বন্ধুদের মায়া-মমতা সান্নিধ্যের সুখকে শ্রেয় গণ্য করতেই পারে। এ তো তার জীবনচর্চার বৈশিষ্ট্য, তার সিদ্ধান্ত। সব জীবনকে ইস্তিরি মেরে সমান করতে হবে, এ মাথার দিব্যি দিয়েছে কে?

‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সরকার ক্ষমতায় আসার পর, সরকারি কর্মচারীর পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিল। আদেশ হল, যে কোনও দফতরে কর্মরত যে কোনও কর্মীকে যে কোনও জেলার দফতরে বদলি করা যেতে পারে। অর্থাৎ, ওই বাড়ির খেয়ে চাকরি করাতেই যত আপত্তি, যত উষ্মা। অবশ্য এর কারণ দ্বিবিধ। অবাধ্য, প্রতিবাদী কর্মচারীকে ঠান্ডা করা বদলির ডান্ডায়। দ্বিতীয়ত, বাম আমল থেকেই স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ। সরকার যতই কর্মসংস্থানের আষাঢ়ে গল্প ফাঁদুক না কেন। ফলত, কাজের প্রয়োজনেই বদলি আবশ্যিক। লক্ষ লক্ষ পদ যে শূন্য পড়ে আছে।

তবু নিয়োগের সময় ‘বাড়ির খেয়ে চাকরি’-র শর্তটি ভঙ্গ হচ্ছে না কি? যারা এই শর্তটিকে প্রাধান্য দিয়ে অন্য ‘ভাল’ চাকরির ডাককে বাতিল করে এই চাকরি নিয়েছিল তাদের প্রতি কি সুবিচার হল?

অর্জুন সেনগুপ্ত

যুগ্ম সম্পাদক, ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ় ইউনিয়ন 

(নব পর্যায়)

কেন্দ্রীয় বাহিনী

বাংলার রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং উত্তেজনা যে কোনও নির্বাচনের মুখে আলোচনার মুখ্য বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। সেখানে একটা বিরাট জায়গা জুড়ে আছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার। 

২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবহারে রাজ্য সরকার সম্মতি না দেওয়ায় রাজ্য কমিশনের সঙ্গে সরকারের সেই মতবিরোধ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবহারের পক্ষে রায় দেয় মহামান্য আদালত। 

২০১৮ সালেও রাজ্য পুলিশের উপর ভরসা না রেখে বিরোধী দলগুলি একই দাবি তুলেছিল। 

কিন্তু রাজ্য সরকার তা নাকচ করে দেওয়ায় কমিশন আর এগোয়নি। রাজ্য পুলিশ দিয়েই সেই পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল। ২০১৯-এর লোকসভার দামামা বেজে উঠতেই বিরোধীরা সমস্বরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবিতে সরব। 

যে হেতু সারা দেশে ভোট, তাই ভারতের নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশকে ভোটের কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়, এ রাজ্যের সরকারি কর্মচারীরাও নিরাপত্তার স্বার্থে বুথে বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। সারা রাজ্যের সর্বত্র এই নিয়ে বিক্ষোভ, স্লোগান, মিছিল, ডেপুটেশন হয়েছে। 

বিরোধীদের দাবি এবং কর্মচারীদের দাবিকে কার্যত মান্যতা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ পর্যবেক্ষক অজয় নায়েক বলেছেন, “১০ বছর আগে বিহারে যে পরিস্থিতি ছিল, তা এখন এ রাজ্যে রয়েছে।” এতে বাংলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা এবং রাজ্য পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। 

আরও আশ্চর্যের বিষয়, পরিস্থিতি বিচার করে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ধাপে ধাপে পরবর্তী দফার নির্বাচনগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী বাড়িয়ে প্রায় ১০০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে কমিশন। এটা লজ্জার। তাই রাজনৈতিক দলগুলিকে, বিশেষত শাসক দলকে, এই বদনাম ঘোচানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে।

কৃষ্ণা কারফা

বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া