×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১২ মে ২০২১ ই-পেপার

সম্পাদক সমীপেষু: ঐতিহাসিক দলিল

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৫:২৬

মুগ্ধ হলাম অমর্ত্য সেনের বক্তৃতা অবলম্বনে লেখাটি (‘কেন তিনি আজ এত প্রাসঙ্গিক’, ৫-২) পড়ে। বাঙালির জীবন, মূল্যবোধ ও তার ইতিহাসের যে বর্ণনা স্বল্প পরিসরে তিনি দিয়েছেন, তা অতুলনীয়। ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা ও সমতার আদর্শ না থাকলে মজবুত রাষ্ট্র নির্মাণ কখনও সম্ভব নয়। এই আদর্শ ছাড়া যদি কখনও রাষ্ট্র নির্মাণ হয়, তবে তার ভিত্তি দুর্বল হতে বাধ্য, এবং তা হয় ক্ষণিকের সাফল্য। সেটাই হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। দেশভাগের যন্ত্রণা প্রায় প্রত্যেক বাঙালিকে কষ্ট দিয়েছিল। সেই যন্ত্রণার পরিসর ও-পার বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) দ্বিগুণ হয়েছিল ভাষা-সংস্কৃতির উপর রাষ্ট্রের নির্মম আক্রমণে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোদ্ধারা সেই স্বপ্নের নির্মাণ করেছেন রাষ্ট্র গঠনের পরিচ্ছন্ন মৌলিক ভাবনা ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের উপর ভিত্তি করে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন দীর্ঘ কাল ধরে চলে আসা বাঙালির সামাজিক পরম্পরা, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে। এই জন্যই শেখ মুজিব সফল এবং বিশ্বজনীন এক রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ভাষা, সংস্কৃতি ও সংবিধান অন্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ— যাঁদের ভিন্ন সংস্কৃতি, রুচি ও ভিন্ন ব্যবহারিক যাপন— তাঁরা কখনও মেনে নেন না।

তাঁর প্রজ্ঞা ও সঠিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাফল্য নিয়ে আসে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, এবং শেখ মুজিবের আদর্শগত বিশ্বাসের উপর অমর্ত্য সেনের এই নিরপেক্ষ মূল্যায়ন আমাদের কাছে ঐতিহাসিক দলিল।

জ্যোৎস্না মুখোপাধ্যায়, বেলতলা পার্ক, বালুরঘাট

Advertisement

প্রীতিবন্ধন

‘কেন তিনি আজ এত প্রাসঙ্গিক’ নিবন্ধটির প্রসঙ্গে বলতে চাই, সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশে বর্তমান বিশ্বের শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার মুজিবুর রহমান সাম্প্রদায়িকতার বিষ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, মার্শাল টিটো, সুকর্ণ প্রমুখ নেতার তত্ত্বাবধানে ১৯৬১ সালে প্রথম জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলন হয়। ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগে এই সংগঠনটি বিশ্বে শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর, ১৯৭৩ সালে আলজিরিয়াতে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়েছিলেন মুজিবুর রহমান।

এই সম্মেলনে তাঁর বৈঠক হয় লিবিয়ার নেতা গদ্দাফি এবং সৌদি বাদশাহ ফয়সলের সঙ্গে। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে শর্ত দেন, বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করলে তাঁরা এই নবনির্মিত দেশকে স্বীকৃতি দেবেন এবং অন্যান্য সাহায্য করবেন। বঙ্গবন্ধুর যুক্তি ছিল, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হলেও ১ কোটির উপর অমুসলিম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছেন। তাই এটা সম্ভব নয়। এই সম্প্রীতির বন্ধনে তিনি সকলকে আবদ্ধ করেছিলেন বলেই বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।

সৌপ্তিক অধিকারী, সোনারপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

অন্য সাক্ষ্য

অমর্ত্য সেন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান এবং সম্রাট আকবরের উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু, আদর্শের বাস্তব রূপায়ণের বিষয়ে নীরব থেকেছেন। আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা লেখা থাক, আর কফি হাউসের টেবিলে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে তুফান উঠুক— তার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক নেই। শেখ মুজিব চার বছর শাসন করেছিলেন। যে ইসলামিক অ্যাকাডেমিকে তিনি ১৯৭২ সালে নিষিদ্ধ করেছিলেন, তাকেই আবার ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অর্গানাইজ়েশন অব ইসলামিক কনফারেন্স-এর (ওআইসি) সদস্য পদের জন্য আবেদন করেন এবং সেই বছরেই লাহৌরে ওআইসি-র সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে ইসলামিক ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্কের সদস্য পদ নেন। শাসনের শেষ দিকে মুজিব জনসভা এবং ভাষণে বেশি মাত্রায় ইসলামীয় শব্দবন্ধের উল্লেখ করতেন, যেমন, ‘ইনশাল্লাহ’, ‘বিসমিল্লা’, এমনকি তাঁর জনপ্রিয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ ভাষণের শেষে আর উচ্চারণ করতেন না, পরিবর্তে, ‘খুদা হাফিজ’ বলতেন (বাংলাদেশ: আ বেঙ্গলি আব্বাসি লার্কিং সামহোয়্যার, বি রমন)। তা হলে তিনি তো প্রকট ভাবেই ধর্মকে রাজনৈতিক কারণে বা প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন। আর, এগুলি কি ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনের ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কাহিনি’ নয়? বাংলাদেশে অমুসলিম জনসংখ্যা ১৯৭৪ সালে ১৪.৬% থেকে কমে ২০১১ সালে ৯.৬% হওয়ার কারণ কি তাঁর আদর্শের বিচ্যুতি নয়?

আকবর ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে নিলেও, তিনি ছিলেন একনায়কতন্ত্রের প্রতিভূ। সেখানে, ‘সমতা’ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল, কেউ জানে না। তাঁর প্রবর্তিত দিন-ই-ইলাহি তাঁর সভার উচ্চপদস্থ ৫০ জনের মধ্যে বীরবল-সহ মাত্র ১৮ জন গ্রহণ করেছিলেন। মান সিংহ তো গ্রহণ করতেই অস্বীকার করেন। মোগল সাম্রাজ্যের ৫০ বছরের শাসন সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনার জন্য তাঁর যোগ্য প্রশাসকমণ্ডলীর দরকার হয়েছিল নিশ্চয়ই। তিনি অনেক মুসলিম পারিষদকে বিশ্বাস করতেন না। তাই রাজপুতদের প্রতি আস্থাবান ছিলেন। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ কতটা ধর্মীয় সক্ষমতার রূপায়ণের জন্য, আর কতটা সুষ্ঠু শাসন পরিচালনার তাগিদে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। অমুসলিম গুণিজনদের কদর শুধু দরবার বা তাঁর কাছাকাছি পরিসরে সীমিত থাকার কথা ইতিহাস থেকে জানা যায়।

আকবর সম্বন্ধে গাঁধী লিখেছেন, “হিন্দুধর্মই ইসলাম ধর্মকে আকবর উপহার দিয়েছে, যে আকবর অভ্রান্ত অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে ভারতকে শাসন করতে সেই ধর্মের সহনশীলতা স্বীকার করেছেন এবং তা গ্রহণ করেছেন।” ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা নিজস্ব স্থান ও কালের গতিশীল সৃষ্টি, যা ৪০০ বছর আগে ভারতের মাটিতে বা সাম্প্রতিক কালে অন্য কোনও দেশে পুষ্ট আদর্শের ব্যাখ্যা বা প্রতিফলন নয়। তাই সমকালীন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আকবরের উদাহরণ যুক্তিযুক্ত নয়।

পঙ্কজ কুমার চট্টোপাধ্যায়, খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা

প্রকৃত চিত্র

অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের যে ইতিহাস আর রাষ্ট্রধর্মের প্রসঙ্গ এনেছেন, তা আসলে তাঁর স্মৃতিকাতরতা, ইসলামিক বাংলাদেশের সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া বাস্তব চিত্র নয়। সংবাদ প্রবাহ বাংলাদেশের একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা নিরন্তর তুলে ধরছে। হয়তো কোনও দিন শুনব, সোনার বাংলার গণমানস প্রায় ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু আর তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতাকে। তাঁরই কন্যা দেশের সাংবিধানিক প্রধান হয়েও রাজধানীতে বঙ্গবন্ধুর একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করতে পারেন না, দেশের আইনসভায় তীব্র বিরোধিতা হয়। ঝলসে-উঠে নিবে যাওয়া শাহবাগ, নাকি লক্ষ মানুষের ভারতবিরোধী মিছিলে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ঢাকা মহানগরী— কোনটা আজকের প্রকৃত বাংলাদেশ?

সমীরণ ভট্টাচার্য, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া

পাথেয়

মোগল সম্রাট আকবর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, দু’জনেই রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন। দু’জনেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধী। অমর্ত্য সেনের দার্শনিক তথা সামাজিক বোধের শিকড় যে ভারত তথা জন্মভূমি বাংলার গভীরে প্রোথিত, এই ব্যাখ্যা তার সাক্ষী। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় অমর্ত্য সেনের মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেন ভারতে মধ্যযুগে সাধনার ধারা নামক গবেষণামূলক গ্রন্থ লেখেন। সেখানে মেলে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার আন্তরিক অন্বেষণ। আমাদের দেশ, তথা রাজ্যে যে দুর্বিষহ প্রক্রিয়ায় ধর্মের রাজনীতিকরণ চলছে, তার বিরুদ্ধে অমর্ত্য সেনের ভাষণের উপসংহারে যথার্থ বাঙালি মূল্যবোধের অনুশীলনের আহ্বান এই মুহূর্তে অমূল্য পাথেয়।

পার্থসারথি দাশগুপ্ত, রহড়া, উত্তর ২৪ পরগনা

Advertisement