আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে স্কুলে পড়েছি, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস বা নেতাজির জন্মদিন পালন করতাম বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে। পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ, দেশাত্মবোধক গান ও নাটক সেই দিনের অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। মনে আছে, বেশ কিছু দিন আগে থেকে গলদঘর্ম হয়ে কুচকাওয়াজের মহড়া দেওয়ায় আমাদের উৎসাহের শেষ ছিল না। প্রতি দিন প্রার্থনার সময় দেশাত্মবোধক গান গাওয়া অবশ্যকর্তব্য ছিল। তখন মধ্যবিত্ত সমাজের সন্তানেরা বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুলে পড়তে লজ্জা পেত না। এখনকার মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যম দামি স্কুলে পড়ে। তারা স্কুলে ইংরেজি গান শেখে। স্কুলের খাতায় ‘ইনডিপেনডেন্স ডে’ বা ‘রিপাবলিক ডে’ নিয়ে রচনা লেখে। কিন্তু বাস্তবে স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস তাদের কাছে নিছক একটি ছুটির দিনের থেকে বেশি কিছু গুরুত্ব পায় না।

দোষ তাদের নয়, স্কুলগুলির। কলকাতা শহরের বেশির ভাগ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে এই দিনগুলি উপলক্ষে কোনও অনুষ্ঠান হয় না। গানের ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের দেশাত্মবোধক গান শেখানো হয় না। যে জাতীয় সংগীত আমাদের স্কুলজীবনে প্রত্যহ গেয়েছি, আজকের শিশুদের কাছে তা সিনেমা হল-এ উঠে দাঁড়াবার গান। আমরা বুঝি, গান শেখালেই নব প্রজন্মের মধ্যে দেশের প্রতি ভালবাসা জন্মাবে না। কিন্তু দেশের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা আছে, সেটা শেখার জায়গা যেমন বাড়ি তেমন স্কুলও। স্কুলগুলি এই দায়িত্ব থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে না।

পূজা সেনগুপ্ত  কলকাতা-৮

চোলি সংস্কৃতি

সম্প্রতি চলে গেল বাঙালির বিদ্যাশিক্ষা ও শিল্প-সংস্কৃতির দেবী সরস্বতীর আরাধনার দিন। ওই দিনের এক নিদারুণ চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। রাত ন’টার সময় নাটক দেখে বেরচ্ছি আকাদেমি অব ফাইন আর্টস প্রেক্ষাগৃহ থেকে, গেটের কাছে আসতেই কানে ভেসে এল তারস্বরে বেজে চলেছে ‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ গানটা। বেরিয়ে দেখি বটগাছের সেই উঁচু বেদির উপর সরস্বতী পূজার প্যান্ডেলে বাজছে চোলি সংস্কৃতির থিম সং। প্যান্ডেলের সামনে নৃত্যরত বিভিন্ন বয়সের নরনারী, সকলেই সম্ভবত বঙ্গভাষী। কিন্তু এ কাদের সংস্কৃতি, কারা আমদানি করল? বাঙালির ধর্মাচরণও এখন অন্য সংস্কৃতির দখলে, কয়েক দিন আগেই একটি অল্পবয়স্ক ছেলে রাস্তা আটকে বলল ‘আঙ্কাল, সর্সত্যি পূজা কা চান্দা!’ তবে রবীন্দ্রসদন-নন্দন-আকাদেমি চত্বরটা কিছুটা এই সংস্কৃতির কবল থেকে মুক্ত ছিল, এ বার সে-জায়গাও বলিউডের দখলে!

রুদ্র সেন  কলকাতা-২৮

 

নমামি গঙ্গে

প্রধানমন্ত্রী হয়েই মোদী সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগ উসকে দিতে কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রকের নামের সঙ্গে ‘নমামি গঙ্গে’ শব্দবন্ধ জুড়ে দিয়ে, গঙ্গা পুনরুজ্জীবনের যাবতীয় দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন তৎকালীন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী উমা ভারতীকে। একই সঙ্গে হিন্দু ধর্মীয় আবেগকে নির্বাচনী রাজনীতির হাতিয়ার করার উদ্দেশ্যে, রীতিমত ঘটা করে পাঁচ বছরের ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন কুড়ি হাজার কোটি টাকা। ওই টাকায় ২০১৯ সালে পরবর্তী লোকসভা ভোটের আগে চার হাজার কিলোমিটার নিকাশি নালা বা গঙ্গার জল পরিশোধনের প্রকল্প নির্মাণের লক্ষ্য স্থির হয়েছিল। তা ছাড়াও গঙ্গার দূষণ রোধে কোন সময়ের মধ্যে অত্যাবশ্যক কী কী করতে হবে, তার নির্দেশও জারি হয়েছিল। আর এক ধাপ এগিয়ে, পাঁচ বছরের মধ্যেই ‘নমামি গঙ্গে’র যাবতীয় লক্ষ্যপূরণের অঙ্গীকার সংসদে দাঁড়িয়ে করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিন বছর বাদে সিএজি রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, এত দিনে মাত্র এক হাজার কিলোমিটার নিকাশি নালা নির্মাণের কাজ সমাধা হয়েছে। বাকি দু’বছরে অবশিষ্ট তিন হাজার কিলোমিটার নির্মাণের কাজ সমাধা হওয়া এক কথায় অসম্ভব ব্যাপার। তা ছাড়াও ব্যাংকে পড়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সিএজি রিপোর্টে এই ব্যর্থতার জন্য সরাসরি মোদী সরকারকেই দায়ী করা হয়েছে।

বেশ বোঝা যাচ্ছে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কল্যাণসাধন নয়, মোদীর তাগিদ উগ্র হিন্দুত্বকে খুঁচিয়ে তুলে দিল্লির মসনদ দখলে রাখা। উল্লেখ্য, বত্রিশ বছর আগে আদালতে দায়ের হওয়া মোকদ্দমার সূত্র ধরে কয়েক মাস আগে জাতীয় পরিবেশ আদালত গঙ্গাকে কলুষমুক্ত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি নির্দেশ জারি করেছিল। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, পরবর্তী দু’বছর সময়ের মধ্যেই উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার থেকে উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলা অবধি ৫৪৩ কিলোমিটার জুড়ে গঙ্গায় নিকাশি ব্যবস্থা থেকে মলমূত্র তথা বর্জ্য পদার্থ এসে না-মেশা নিশ্চিত করতে হবে। প্রসঙ্গত, বিগত তিন দশক ধরে গঙ্গাদূষণ নিয়ে বিভিন্ন নামে একাধিক সরকারি প্রকল্প চলার পাশাপাশি, আদালতে অনেক মামলাও সমানে চলেছে। আদালত ও প্রশাসন দু’তরফ থেকেই নানা সময়ে প্রাদেশিক আধিকারিকদের উপর নানা নির্দেশ এসেছে। তবু কাজের কাজ প্রায় কিছুই হয়নি। গঙ্গার তীরবর্তী শহরগুলিতে সগৌরবে বিরাজমান রয়েছে দূষণ-সৃষ্টিকারী চর্মশিল্প। চর্মজ শোধনে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক-যুক্ত জল পরিশোধনে অত্যাবশ্যক শিল্প এখনও তৈরি হয়নি। কিছু শৌচাগার অবশ্যই নির্মিত হয়েছে। কিন্তু আনুষঙ্গিক রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতা, শবদেহ সৎকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, এমনকী নিকাশি নালা নির্মাণেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

মানসকুমার রায়চৌধুরী  কলকাতা-২৬

 

জলসম্পদ

শিক্ষারত্ন অরূপ চৌধুরীর লেখা ‘আদরের নদীর হাল ফেরাতে চাই সহানুভূতি’ (৩-১২) শীর্ষক লেখাটি খুবই সময়োপযোগী। খড়ি নদীর মতো সমস্ত নদী, কাঁদরের হাল ফেরানো যায়, যদি জলসম্পদ উন্নয়ন দফতর একটু ভাবনাচিন্তা করে। আমাদের জলসম্পদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এখন কৃষিকাজে, শহরে-গ্রামে জল সরবরাহে ভূগর্ভের জলই বেশি ব্যবহার হচ্ছে। মিনারেল ওয়াটার এবং নরম পানীয়ের কোম্পানিগুলি প্রতি দিন বহু গ্যালন জল ভূগর্ভ থেকে তুলে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করছে। অপর দিকে জলাশয় বুজিয়ে ঘর-বাড়ি, উপনগরী, নতুন শহর গড়ে উঠছে। বহু মাইল কংক্রিটের রাস্তা বানানোর ফলে মাটির আয়তন কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভূগর্ভের জলের উৎস দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। কিন্তু তার চাহিদা বেড়েই চলেছে। তাই ধীরে ধীরে ভূগর্ভের প্রথম স্তর এবং দ্বিতীয় স্তর পর্যন্ত জলশূন্য হয়ে গিয়েছে। তাই নদীগুলি ডিসেম্বরের পরেই জলশূন্য হয়ে যায়।

এখনও আমাদের দেশে ২০০ সেন্টিমিন্টার বৃষ্টি হয়। ফলে এক বর্গমিটার জায়গায় সারা বছর যে বৃষ্টি পড়ে, তার পরিমাণ প্রায় ২০০০ লিটার। জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরের পরিকল্পনার অভাবে প্রতি বছর ওই জল বন্যা সৃষ্টি করে জনগণের চরম দুর্গতি ঘটিয়ে নোনা জলে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গে এখনও ছোট-বড় মিলিয়ে ১২ লক্ষ জলাশয় আছে; যদি সেগুলি ১০-১৫ ফুট গভীর করে কাটানো যায়, তা হলে বৃষ্টির জলের অনেকটা ধরে রাখা যায়। প্রতিটি নদী এবং কাঁদরের গর্ভে ১০০০ মিটার অংশ ৩-৪ মিটার গভীর করে কেটে কৃত্রিম দহ তৈরি করতে হবে। তার পর ১০০-২০০ মিটার বাদ রেখে আবার ১০০০-২০০০ মিটার অংশ ৩-৪ মিটার গভীর করে কাটতে হবে। যদি এই ‘মই’ পদ্ধতিতে সমস্ত নদী এবং কাঁদরগুলিতে হাজার হাজার কৃত্রিম দহ তৈরি করা যায়, তবে এটা বহুমুখী পরিকল্পনা হবে। না-কাটা ১০০-২০০ মিটার অংশটি বাঁধের কাজ করবে। এই পরিকল্পনার ফলে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভের জলের উৎস, মৎস্য চাষ, জলসেচনের মতো কাজগুলি ভাল ভাবে হবে।

গুরুচরণ পাল  প্রাক্তন শিক্ষক, সিতাহাটি হাই স্কুল

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়