সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় ও নটরাজ মালাকার একটি সময়োপযোগী বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন (‘ভিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য হল অধিকার’, ১৮-১২)। তবে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার উন্মেষ ও আন্দোলনের সূচনা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে নয়, শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের ইউরোপে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য’ বিষয়ে ভাবনার সূত্রপাত হয়েছিল ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট-এর যুগে। স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে পুরনো ধ্যানধারণা কী ভাবে ব্যক্তি থেকে ব্যষ্টিতে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হচ্ছিল তা তাঁদের গবেষণায় লক্ষ করা যাবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাতও ইউরোপে, প্রধানত বাণিজ্য সংক্রান্ত অনুপ্রেরণায়। বিশেষত প্লেগ মহামারি এ বিষয়ে তৎপরতা বাড়িয়ে তুলেছিল। স্বাস্থ্যবিধি বা আমরা যাকে ‘মেডিক্যাল পলিসি’ বলি, তাও মহাদেশীয় স্বৈরতন্ত্রে সুকৌশলে বিস্তৃত হচ্ছিল। 

ইংল্যান্ডে স্বাস্থ্য বিষয়ক নজরদারির সূচনা হয়েছিল প্রথমত এবং প্রধানত সামরিক প্রশাসনে। তার পর তা সম্প্রসারিত হয় জেলখানায় বন্দি অপরাধীদের মধ্যে। ক্রমশ তা বেসামরিক জনসাধারণের মধ্যেও সম্প্রসারণ করতে হয়। কেননা কোনও কোনও সময় রোগব্যাধি, বিশেষত মহামারি, জেলখানা থেকে জনসাধারণের মধ্যেও সংক্রামিত হয়ে পড়ছিল। চিকিৎসকরা লক্ষ করেছিলেন, বেসামরিক জনসাধারণের মধ্যে যাঁরা দরিদ্র, অশিক্ষিত, অভুক্ত এবং যাঁরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যেই রোগের সংক্রমণ হচ্ছিল বেশি। বেসামরিক ডাক্তাররা তাই জোর দিচ্ছিলেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপর, স্বাস্থ্যকর পরিবেশের উপর।

এই প্রেক্ষিত থেকেই ঔপনিবেশিক কিংবা উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলায় জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে কোনও আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। জনস্বাস্থ্যের আলোচনায় এ যাবৎ দুটো মডেল বিবেচিত হয়েছে। প্রথম মডেলটির সূত্রপাত ঘটেছিল ১৮৪০-এর দশকে, এডউইন চ্যাডউইক-এর মাধ্যমে। ওঁর মতো ‘আলট্রা-স্যানিটেরিয়ান’রা বলতেন, মহামারির আঁতুড়ঘর হল নোংরা আবর্জনাময় পরিস্থিতি। শহরে জঞ্জাল সাফাই, ময়লা জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবই রোগব্যাধি ও মহামারি ঘটায়। মহামারি রোধ করতে প্রয়োজন জঞ্জাল, মলমূত্র, ধুলোময়লা বা অস্বাস্থ্যকর জিনিস থেকে মুক্ত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এই প্রতর্কটি নিঃসন্দেহে পরিসর সম্পর্কিত (spatial)। এটি রাজনীতি সম্পর্কিতও, কেননা গ্রাম-শহরের দূরত্ব সম্পর্কিত ব্যবধান, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যহীনতার নৈতিক ব্যবধান, রিক্ত ও অতিরিক্ততার অর্থনৈতিক ব্যবধান তিনি মনে করতেন অবাঞ্ছিত এবং নিবারণযোগ্য। এই মডেলটি সে যুগে এবং এ যুগে যথেষ্ট শক্তিশালী রাজনৈতিক সঞ্চালক বলে বিবেচিত। কেননা এর মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি জরুরি এবং জোরালো আবেদন উচ্চারিত হয়েছিল।

এর একটি বিরুদ্ধ মডেল চালু করেছিলেন সমাজতাত্ত্বিকরা, উনিশ শতকের শেষের দিকে। মডেলটি যতটা না পারিসরিক বা স্থানিক (spatial), তার চেয়ে অনেক বেশি সাময়িক বা কালিক (temporal)। এর মূল কথা হল: অভাব, অনটন ও অনশন। এখানে বলা হয়েছে কৃষির ক্রমাবনতি ও ফসলহানির কথা। ফলত পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যাভাব ও রোগব্যাধির কথা। 

স্বাস্থ্যই যে সম্পদ এ বিষয়ে বোধ হয় কোনও বিতর্ক নেই। কিন্তু সম্পদের অভাব হলেই যে স্বাস্থ্যের হানি হবে— এ প্রস্তাব নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক শুরু হয়েছে। সে বিতর্কটির কী প্রকৃতি তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু একটি কথা বোধ হয় জোর দিয়ে বলা যায়: সম্পদহীনতা বা দারিদ্রও এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধির শিকড় যেখান থেকে শুরু, সেখান থেকেই সাধারণ রোগব্যাধি ও জনস্বাস্থ্যহীনতারও সূচনা। অপুষ্টি, ঘন জনবসতি, দূষিত পানীয় জল ও খাদ্যাখাদ্যের ব্যাপারে অসতর্কতা— এ সবই দারিদ্র আর ব্যাধির কেন্দ্রমূলে। আর এই সব কিছুরই মূলে আছে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও তার সরকার। জনস্বাস্থ্য-দাবি আন্দোলনের বর্শামুখ তাই খারাপ ডাক্তারের বিরুদ্ধে নয়, খারাপ সরকারের বিরুদ্ধেই উত্তোলিত হওয়া উচিত।

অরবিন্দ সামন্ত, কলকাতা-৫৫

পানু পাল

‘পঁচাত্তরে গণনাট্য’  (কলকাতার কড়চা, ১৭-১২) পড়ে জানলাম, আইপিটিএ-র ‘‘পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে দু’দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করেছে গণনাট্য সঙ্ঘের কলকাতা জেলা কমিটি।’’ সাধু উদ্যোগ। উদ্যোক্তারা জ্যোতিরিন্দ্র মিত্র, সলিল চৌধুরী, বিনয় রায়ের গণনাট্যের গান শোনাবার আয়োজন করেছেন, ব্রেখটের নাটকও মঞ্চস্থ হবে। এও আনন্দের কথা। তবে নাটকের কথা জেনে পানু পালের কথা মনে পড়ল। নাট্যজগতের অনেক প্রতিভাবান শিল্পী, যাঁরা সে দিন আইপিটিএ-র মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন, তাঁদের নিয়ে কমবেশি আলোচনা শুনি, কিন্তু পানু পাল প্রায় বিস্মৃত এবং অনালোচিতই থেকে গেলেন। 

পানুদা (এ নামেই পরিচিত) ছিলেন একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক, কোরিয়োগ্রাফার, অভিনেতা এবং নৃত্যশিল্পী। তাঁর নিজের কথায়: ‘‘বোম্বেতে বেঙ্গল স্কোয়াড থেকে ‘হাঙ্গার ডেথ’ আর বিজনবাবুর ‘জবানবন্দী’ নাটক নিয়ে গিয়েছিলাম। বোম্বে ক্রনিকলস্-এ লেখা হয়েছিল: ''For a few moments Panu Paul took the whole audience into the land of death." 

রবিশঙ্কর নাকি বলেছিলেন, পানু পাল বোম্বেতে ব্যালে লাইনে নতুন ধারণা দিয়ে গেলেন। 

ভাবতে অবাক লাগে, এমন প্রতিভাধর শিল্পীকে কিছু কাল দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন সংগঠনের কর্মকর্তারা। অথচ পানুদার কথায়: ‘‘যাঁরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে তাঁদেরই এক জন হঠাৎ আমাকে ভাঙা আইপিটিএ-র হাল ধরতে বললেন। আমি আত্মসমালোচনা করার কথা বললাম। সম্পাদক নির্মল ঘোষ বললেন হবে।’’ ভাঙা আইপিটিএ বলতে পানুদা বুঝিয়েছিলেন আইপিসিএ-র কথা। পার্টি ভাঙার পর এ রাজ্যে আইপিটিএ-তে ভাঙন দেখা দেয়, নাট্যকার দিগিন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ এ রাজ্যে আইপিসিএ গঠন করেন, যা সিপিআই-এর কালচারাল সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আশির দশকে এই আইপিসিএ-রই হাল ধরেছিলেন পানুদা। এ সংগঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুবাদে জানি, নেতৃত্বের তরফে আত্মসমালোচনার কোনও উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। 

সে যা-ই হোক, পানুদা কিন্তু এ পর্বেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। অসচ্ছল জীবন সত্ত্বেও তাঁকে দিনের পর দিন সংগঠনের নির্দেশ মেনে সপুত্রক ব্যালে অনুষ্ঠানে হাজির হতে দেখেছি। বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া দূরে থাক, নিরলস মেজাজেই তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর পরিচালনায় ‘ম্যান অ্যান্ড মেশিন’ ব্যালে সে সময়েও যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছিল। এত কম খরচে, বাহুল্যবর্জিত এমন অনুষ্ঠান করে তিনি সে-দিনও দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছিলেন।

এমন আকর্ষক ব্যালে অনুষ্ঠান হয়তো এ সময় ব্রেখটের নাটকের মতো মঞ্চস্থ করা সম্ভব নয়, কিন্তু পানু পাল ছিলেন এ দেশে পথনাটকের পথপ্রদর্শক— এ কথাটা এ সময়ের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীদের জানাবার প্রয়োজন আছে।

শিবাশিস দত্ত, কলকাতা-৮৪

হাত ও পা

দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতে আমরা ভারতীয়রা, হাতে কিছু নিয়ে, যেমন, ব্যাট, বল, টেনিস র‌্যাকেট, ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট, টেবিল টেনিস ব্যাট বা হকি স্টিক— বেশ ভাল খেলছি। বক্সিং ও কুস্তিতেও অনেক এগিয়েছি। কিন্তু ফুটবলে অনেক পিছিয়ে পড়ছি। হাতের সঙ্গে পায়ের এত পার্থক্য হচ্ছে কেন? বিষয়টা ভাবার!

কল্যাণ দত্ত চৌধুরী,দক্ষিণ ২৪ পরগনা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।