সম্পাদকীয় ‘সর্বজনীন?’ (২৩-১০) শীর্ষকে ‘হুইলচেয়ারে আসীন কন্যাকে’ কলকাতার পুজো দেখাতে গিয়ে তার পরিবারের যে অসহায়তা বর্ণিত হয়েছে সেই প্রসঙ্গেই আমি এক অভিজ্ঞতার কথা জানাব। আমার বয়স ৬৪, গত ২২ বছর ধরে স্নায়ুর রোগে ভুগছি, চলতেফিরতে পারি না। ঘাড়ের পেশিগুলো এত দুর্বল যে মাথাও তুলতে পারি না, মাথা সোজা করে তুলে রাখার জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু প্রতি বছরই ঠাকুর দেখতে যাই। এমন মণ্ডপ খুঁজি যেখানে ভিড় হয় না, প্রতিমার সামনেটাও উন্মুক্ত থাকে। গাড়ি করে একদম ঠাকুরের কাছাকাছি পৌঁছনো যায়। এই ভাবেই প্রতি বছর দেখছি। স্থানীয় বাসিন্দারা আমাকে অবাক চোখে পর্যবেক্ষণ করেন, অনেকে হয়তো বিরক্ত হন। এ বছর অন্য রকম অভিজ্ঞতা হল। গল্‌ফ গ্রিনের একটা পুজোতে উদ্যোক্তারা আমাকে স্বাগত অভ্যর্থনা করে বললেন, ওঁদের সব ব্যবস্থা করা আছে, নার্স আছে, হুইলচেয়ার আছে। আমি যেন নেমে ভাল ভাবে ওঁদের ঠাকুর দর্শন করি। এক ভদ্রমহিলা সঙ্গে সঙ্গে হুইলচেয়ার ও এক জন নার্সকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। আমার পক্ষে গাড়ি থেকে নামাওঠা খুব কষ্টসাধ্য তাই ওঁদের অনুরোধ রাখতে পারিনি। কিন্তু এই রকম সহৃদয় সাদর আমন্ত্রণে আমি অভিভূত, কৃতজ্ঞ। সহনাগরিকরা যদি প্রতিবন্ধী ও অসুস্থদের প্রতি এই রকম সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেন তা হলে তাঁদের জীবন অনেকখানি আলোকিত হয়ে উঠবে।

শাশ্বতী নন্দী

কলকাতা-৩৩

 

প্রতিবন্ধী ও রাষ্ট্র

‘হুইলচেয়ারে আসীন কন্যাকে কলিকাতায় পূজা’ দেখানোর ব্যবস্থা না করায় সম্পাদক (২৩-১০) বারোয়ারি পূজাগুলিকে এ ব্যাপারে মানবিক দিকে নজর দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। প্রসঙ্গত সম্পাদক সারা বছর দেশে সর্বত্র বিশেষ করে দৈহিক প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তিরা যে অসুবিধা ভোগ করে চলেছেন তাও ‘সর্বজনীন’ সুবিধার যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন। রাষ্ট্রই উদাসীন তো তিন দিনের বারোয়ারি পূজামণ্ডপ। তবু সম্পাদকের সঙ্গে সহমত হয়ে অভিজ্ঞতায় বলি, পুজো উদ্যোক্তারা বিশ্বশান্তি, দূষণ প্রতিরোধ, ভক্তিবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি কঠিন কঠিন বিষয়ে কত প্রচার করছেন, থিম করছেন, অঞ্জলি দেওয়ার সময় সবাই কত কঠিনতর প্রতিজ্ঞা করছেন। ক’দিনের মণ্ডপে সুযোগ দিতে না পারেন বাকি সর্বত্র প্রতিবন্ধীদের এই সুবিধা দেওয়ার জন্য অন্তত আমাদের হয়ে প্রচারটুকু করুন।

পুজো ছাড়া কিছু অসুবিধার কথা বলি যেখানে এই প্রচার ও দাবি আরও নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি মানুষের টাকার দরকার আর তাকে ব্যাঙ্কে নিয়মিত যেতে হয়। প্রতিটি ব্যাঙ্কে Code of Bank’s Committee to customers, Senior citizen charter demand ইত্যাদি নানা ব্যবস্থা আছে। এই পরিকাঠামোর ব্যবস্থা খাতায় কলমে সাধারণত দেখানো থাকে। ব্যাঙ্কের দৈনন্দিন কাজ বেড়েই চলেছে। এক দিকে স্থায়ী কর্মী ক্রমশ কমিয়ে অন্য দিকে অত্যাধুনিক যন্ত্র-প্রযুক্তি বাড়িয়ে অস্থায়ী কর্মী দিয়ে কাজ করানোর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় হুইলচেয়ার দেখাশোনা ও তার জন্য এক জন লোক আশা করা কষ্টকল্পিত হলেও দাবি থাকবে। অনেক শাখাই দু’তলায় যেখানে সিঁড়ি ভাঙা সাধারণ মানুষের পক্ষে হয়রানির ব্যাপার হয়। কিছু শাখায় র‌্যাম্প আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় এলিভেশন নেই। সব মিলিয়ে ন্যূনতম ব্যবস্থার খুব অভাব।

দ্বিতীয় বিষয় ভারতীয় রেলব্যবস্থা। এই বছরে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ কামরার ব্যবস্থা করা হবে ট্রেনে। খুশি হয়েছি এই কথা ভেবে দেরিতে হলেও যে আমাদের মতো মানুষদের নিয়ে আধুনিক সুবিধার কথা ভাবা হয়েছে। যত দূর শুনেছি এই এলএইচবি প্রযুক্তির এক বড় সুবিধা হল এতে ঝাঁকুনি খুব কম হবে, উল্টে পড়ার সম্ভাবনাও কমবে। ভাল কথা। তবে আরও কিছু এই বিষয়ে জানতে ইচ্ছে করে। এক, প্রতিবন্ধীদের জন্য এক জন সঙ্গী বা এসকর্ট এই কামরায় উঠতে পারবেন কি? দুই, এই দু’জনের জন্য অনলাইনে টিকিট কাটা যাবে কী করে? তিন, বর্তমানে ট্রেনের তল ও স্টেশনের তলের মধ্যে আধ ফুট থেকে এক ফুট অবধি ফাঁক তৈরি হয়েছে। আগে এতটা ছিল না। এতে বিশেষ করে দৈহিক প্রতিবন্ধীদের মারাত্মক অসুবিধা হয়ে চলেছে। শিশু ও প্রবীণ নাগরিকরাও এই অসুবিধা ভোগ করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যার ১৯% প্রতিবন্ধী। ভারতে তা ২.২১%। ভারতে মূকবধির প্রতিবন্ধী ২৮%, চলনজনিত ১৮%। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০% দৃষ্টিজনিত, ০.৬% শ্রবণজনিত কিন্তু ৫৫% চলনজনিত প্রতিবন্ধী। সম্ভবত চলনজনিত প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিটি জায়গায় পার্কিং–এর জন্য বিশেষ জায়গা আছে। অপব্যবহার করলে জরিমানা। দৃষ্টিহীনের জন্যও সুবিধা আছে। এখন সুবিধা নয় এটা অধিকার আর এই অধিকারের অপর নাম accessibility। তাই যানবাহন, হোটেল, পার্ক, রেস্তরাঁ, হোটেল, শিক্ষালয়, বাসস্থান ইত্যাদি প্রায় সর্বত্র খোঁজ নেওয়া হয় অ্যাকসেসিবিলিটি আছে কি না।

দেখা যাচ্ছে, সর্বজনীন নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রে অসরকারি বা সরকারি সংস্থা, কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

‘রাইটস ফর পার্সনস উইথ ডিসঅ্যাবিলিটি অ্যাক্ট, ২০১৬’-এর গুরুত্ব আইনে বাড়ছে। মুশকিল হল, এই আইন কার্যকর হয়ে সব প্রতিবন্ধীর সুফল পেতে এখনও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, এক, ১৯৯৫ সালে পাশ হওয়া ইন্ডিয়ান ডিসঅ্যাবিলিটি অ্যাক্ট দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে সবে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল। কারণ, দুই, সম্পাদক শেষে লিখেছেন, ‘‘...পরিকল্পনায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের প্রয়োজনটিও মাথায় রাখিতে হবে বইকি।’’ ফের আলগা ভাবে ‘বইকি’কেন? মাথায় তো রাখতেই হবে এবং মাথা থেকে কাজে রূপ দিতে হবে।

শুভ্রাংশু কুমার রায়

চন্দননগর, হুগলি

 

র‌্যাম্প জরুরি

‘হুইলচেয়ার নিয়ে বেরিয়ে বুঝলাম, শহর সচেতন নয়’ (২১-১০) প্রসঙ্গে এই চিঠি। 

ইদানীং শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে নানা স্তরে নানান প্রতিযোগিতা তথা পুরস্কারের ঘটা করে আয়োজন হয়ে থাকে। ‘সমাজ সচেতন পুজা মণ্ডপ’ তার মধ্যে অন্যতম। কলকাতার অধিকাংশ বড় পুজোর বাজেট পঞ্চাশ লক্ষ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। মণ্ডপের মূল প্রবেশ দ্বারের দৈর্ঘ্য ন্যূনতম ত্রিশ-চল্লিশ ফুট। থাকে ভিআইপিদের যাতায়াতের জন্যে বিশেষ প্রবেশ পথ। অথচ এ কথা ভাবলে অবাক লাগে যে সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের হুইলচেয়ারে যাতায়াতের জন্যে তিন ফুট মাপের একটা র‌্যাম্প-এর প্রয়োজনীয়তার কথা এত দিন কারও মগজে আসেনি। সত্যি আজ যদি সহৃদয় পুজো উদ্যোক্তারা এত বড় বড় পুজো মণ্ডপের সঙ্গে প্রবেশ পথে এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য র‌্যাম্পের ব্যবস্থা করতেন তা হলে আজকের দেবস্মিতাদের মতো শিশুরা অন্য শিশুদের সঙ্গেই পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে পারত।

সঞ্জয় কুমার সাউ

কালিপুর, ডানকুনি, হুগলি

কসরত

সম্প্রতি প্যারালিসিসে আক্রান্ত এক আত্মীয়কে বহরমপুর স্টেশনে ছাড়তে গিয়েছিলাম। কলকাতার দিকে যাওয়ার ট্রেন দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসে। স্টেশন মাস্টারকে অনুরোধ করাতে হুইলচেয়ার পেলাম, কিন্তু ওই প্ল্যাটফর্মে রোগীকে কী ভাবে নিয়ে যাব তা বুঝতে পারলাম না। অনেক কসরত করে ওঁকে কোনও রকমে ট্রেনে ওঠানো গেল। এখন প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি অফিসে বা যানবাহনে নানা রকম সুবিধার কথা শোনা যায়। স্টেশনে, বিশেষত ফুটব্রিজে, এমন ব্যবস্থা করা কি যায় না, যেখানে অন্তত হুইলচেয়ার গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?

আব্দুর রহমান

গোরাবাজার, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ