উৎপল দত্ত সম্পর্কে সুদেষ্ণা বসুর নিবন্ধ ‘লাল দুর্গের অতন্দ্র প্রহরী নট, নাট্যকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত’ (পত্রিকা, ২৯-৯) প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। এক, লেখকের ভাষায়, ‘তিনি (উৎপল দত্ত) লিখেছেন, ‘‘মহেন্দ্র গুপ্তের পরিচালনায় ...’’ ইত্যাদি। বস্তুত, কথাগুলো উৎপল দত্ত লেখেননি, তিনি বলেছিলেন দু’টি সাক্ষাৎকারে, খানিকটা ‘দেশ’ পত্রিকার ৩০ মার্চ ১৯৯১ সংখ্যায় এবং খানিকটা ‘আজকাল’ পত্রিকার ৩১ মার্চ ১৯৯১ সংখ্যায়— যা লেখক জুড়ে দিয়েছেন। 

দুই, লেখকের মতে, ‘নবান্ন’ নাটক নব নাট্য আন্দোলনের ফসল। ঘটনা হচ্ছে, ১৯৪৪ সালে নবনাট্য আন্দোলনের অস্তিত্ব ছিল না। নাটকটি গণনাট্য আন্দোলনের ফসল।

তিন, লেখা হয়েছে, ‘টিনের তলোয়ার’ নাটকটি ‘‘অশ্লীল ঘোষিত হওয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল’’। সত্য ঘটনা হচ্ছে, তৎকালীন এক শ্ৰেণির বুদ্ধিজীবী নাটকটির কিছু সংলাপের কারণে নাটকটি অশ্লীল বলেছিলেন ঠিকই, নাটকটি নিষিদ্ধ করার চেষ্টাও হয়েছিল, এমনকি গোটা পিএলটি দলকে সাদা পোশাকের পুলিশ দিয়ে রবীন্দ্র সদন থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বহু চেষ্টা করেও নাটকটিকে নিষিদ্ধ করা যায়নি। 

চার, লেখকের মতে ১৯৬৭ সালে উৎপল দত্তকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন তিনি ইসমাইল মার্চেন্টের ‘গুরু’ ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং শুটিং যাতে বন্ধ না হয় সে জন্য ‘‘ইসমাইল মার্চেন্ট সরকারি উচ্চমহলে যোগাযোগ করে অভিনেতার জামিনের ব্যবস্থা করেন। জামিন পাওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁকে (উৎপল দত্তকে) মুচলেকা দিতে হয় যে, তিনি আর কখনও কোনও রকম রাজনৈতিক নাটক লিখবেন না ও করবেন না।’’ এ বিষয়ে এক কালে বহু বিতর্ক হয়েছে। সে সবের মধ্যে না গিয়ে সরাসরি উৎপল দত্তের বক্তব্য তুলে ধরছি : "James Ivory’s unit appealed to the government for my release, pointing out that while the film was shot there was little chance or time of my going around blowing buildings up; the U.S. embassy in Delhi endorsed it and, presto, I was out, flying back to Bombay to shoot— the film, I mean. The government of West Bengal, the same evening, broadcast over the radio that I had signed a paper abjuring politics. It was a white lie of course. I had merely endorsed what the film-company had written." শুধু এটুকুই নয়, উৎপল দত্ত এর পরেই লিখেছেন, "As for the fictitious bond, giving away my right to political theatre, even if it had been true, a guarantee given to the enemy is no guarantee at all. Deceiving the enemy is a fine thing in my ethics." (Utpal Dutt: 'Towards a Revolutionary Theatre', Calcutta,1982, pp.82-83.)

পাঁচ, সুদেষ্ণা বসু উৎপল-কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়াকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, উৎপল নাকি কন্যাকে বলেছিলেন ষাট বছর বয়সের পরে বিপ্লবী আর বিপ্লবী থাকে না, ‘‘প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যায়।’’ প্রকৃতপক্ষে বিষ্ণুপ্রিয়া যা বলেছিলেন তা এই— ‘‘বাবা বলতেন ষাট বছর হলে বিপ্লবী আর বিপ্লবী থাকে না। সে রক্ষণশীল হয়ে যায়।’’ তিনি এ কথা বলেছিলেন ‘আনন্দলোক’ পত্রিকার ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যায়। ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ শব্দটি উৎপল ব্যবহার করেননি। 

পরিশেষে জানাই, ‘মানুষের অধিকার’ নামে কোনও নাটক উৎপল দত্ত লেখেননি। 

যে নাটকটির কথা সম্ভবত লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, সেটির নাম ‘মানুষের অধিকারে’।

শঙ্কর শীল

কলকাতা-৩৭

 

প্রতিবেদকের উত্তর: ১) জুড়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উৎপল দত্তর বক্তব্য যদি বদলে না গিয়ে থাকে, তবে বক্তা তাঁর বক্তব্য মুখে বলে জানিয়েছিলেন না কি লিখিত আকারে, তা নিয়ে আপত্তি কেন? যিনি সেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি নিশ্চয়ই উৎপল দত্তর উক্ত বক্তব্য শুনেই লিখেছিলেন এবং তা লিখিত আকারেই প্রকাশ করেছিলেন বক্তার বক্তব্য হিসেবে।  সংক্ষিপ্ত পরিসরে সীমিত শব্দসংখ্যার মধ্যে লিখতে গিয়ে প্রতিবেদককে মিতব্যয়িতার আশ্রয় নিতে হয়। 

২) গণনাট্য সঙ্ঘের ছত্রচ্ছায়ায় কেবলমাত্র নাটকই হত এমন নয়। এটা ছিল সংস্কৃতির আঙিনায় দাঁড়িয়ে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন। সেই আন্দোলনের প্রেরণায় ‘নবান্ন’ নিশ্চয়ই অভিনীত হয়েছিল। কিন্তু ওই নাটকই পরবর্তী কালে নবনাট্যের ভাবনাকে উস্কে দিয়ে একটি নাট্য আন্দোলনের সূচনা করেছিল। যার উদ্যোগকর্তা ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র। অতএব ‘নবান্ন’ নাটকই যে সেই নতুন ধারার নাটকের জনক, তা নিয়ে বিভ্রান্তির জায়গা থাকার কথা নয়। পরবর্তী কালে যা ‘গ্রুপ থিয়েটার’ হিসেবে জন্ম নেয়। 

৩) ১৯৭২ সালের ১ জুলাই রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহে ‘টিনের তলোয়ার’-এর অভিনয় নিষিদ্ধ হয়েছিল। নাটকটি সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল, তা লেখা হয়নি। 

৪) উৎপল দত্তর মুচলেকা দেওয়ার প্রসঙ্গ। মুশকিল হল, আমাদের দেশে খ্যাতিমান ও মহান ব্যক্তিদের প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থ রচনার তেমন কোনও উদ্যোগ না থাকায় বা তা লেখার ক্ষেত্রে নানান অসুবিধা থাকায়, এই সব মানুষের জীবনের কিছু কিছু অংশের ছবি পরিষ্কার ভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ধরা পড়ে না। উৎপল দত্ত তাঁর মুচলেকায় ঠিক কী লিখেছিলেন বা আদৌ দিয়েছিলেন কি না, তা প্রমাণ করতে পারত সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রামাণ্য নথি। তেমন কোনও নথির সন্ধান না পাওয়ায় উৎপলবাবুর নীতিগত অবস্থানটির কথা উল্লেখ করেছি মাত্র। তাঁকে মুক্ত করতে জেমস আইভরি যদি সরকারি উচ্চমহলে যোগাযোগ করে থাকেন, তবে ভারতের মতো আমলাতান্ত্রিক এক রাষ্ট্র উৎপল দত্তকে কোনও কিছু না লিখিয়েই জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিল, তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না। ঘটনা যা-ই ঘটে থাকুক, পরবর্তী কালে উৎপল দত্ত কখনওই তাঁর বামপন্থী আদর্শ ও বিশ্বাসের ভূমি থেকে বিচ্যুত যে হননি, তা তিনি নিজের নাটক ও লেখার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন। 

৫) ‘রক্ষণশীল’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’— শব্দ দু’টির মধ্যে দূরত্ব কতটুকু? তিনি যে সূত্রের উল্লেখ করেছেন, আমি সেটা ব্যবহার করিনি। ওই ঘটনার কথা বিষ্ণুপ্রিয়া দূরভাষে আমায় জানান দিল্লি থেকে। সেই দূর-সংলাপে বিষ্ণুপ্রিয়া ঠিক যে ভাবে আমায় বলেছিলেন, আমি সে ভাবেই তাঁকে উদ্ধৃত করেছি। 

পথিকৃৎ?

সুদেষ্ণা বসু লিখেছেন, ‘‘উৎপল দত্ত হলেন বাংলা পথনাটকের পথিকৃৎ।’’ বাংলা পথনাটকের পথিকৃৎ হলেন পানু পাল। ১৯৫২ সালে পানু পাল ‘ভোটের ভেট’ লিখে এবং পরিবেশন করে বাংলা নাট্যজগতে পথনাটকের উন্মেষ ঘটান। এই নাটকে অভিনয় করেন উমানাথ ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, ঋত্বিক ঘটক এবং পানু পাল স্বয়ং। ১৯৬১ সালে উৎপল দত্ত প্রথম পথনাটক লেখেন, ‘স্পেশাল ট্রেন’। এটা ঠিক, উৎপল পথনাটকের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন।

লেখক লিখেছেন, ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ অবধি উৎপল দত্ত ছিলেন চিৎপুরের যাত্রাপালার একচ্ছত্র অধিপতি। ‘একচ্ছত্র অধিপতি’ কথাটা বলা মনে হয় সঙ্গত নয়। কারণ সেই সময়ে ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়, শম্ভু বাগ প্রমুখ অসাধারণ যাত্রাপালা লিখেছেন এবং সফল হয়েছেন। উৎপল দত্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, শম্ভু বাগের ‘হিটলার’, ‘লেনিন’, ‘কার্ল মার্ক্স’, ‘রক্তাক্ত তেলেঙ্গানা’, ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একটি পয়সা’, ‘পদধ্বনি’, ‘রক্তে রোয়া ধান’ ইত্যাদি সাড়া-জাগানো রাজনৈতিক পালা। অমর ঘোষও এই সময় যাত্রা উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন আঙ্গিক আনেন। যেমন মঞ্চে প্রবেশ বা প্রস্থানের দু’টি পথের ব্যবহার, স্পটলাইটে বিশেষ মুহূর্ত ধরা, রেকর্ডিং করে নানা শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি। তরুণ অপেরা প্রযোজিত, শান্তিগোপাল অভিনীত এবং অমর ঘোষ পরিচালিত ‘হিটলার’, ‘লেনিন’ যাত্রাজগতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। দীপক বিশ্বাস

ইন্দ্রপ্রস্থ, বহরমপুর