কলকাতার কড়চায় ‘পরশুরামের রত্নভাণ্ডার’ (৬-৫) প্রসঙ্গে এই চিঠি। রাজশেখর বসুর অনবদ্য হস্তাক্ষর এবং ‘সামরিক শৃঙ্খলা’ বোধের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়ে প্রকাশক সুধীরচন্দ্র সরকার (এম সি সরকার অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী) লিখেছেন, ‘‘পরশুরামের লেখা পাণ্ডুলিপি যাঁরা দেখবার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা তার নির্ভুলতা ও পরিচ্ছন্নতা দেখে বিস্মিত হয়েছেন। খুব পরিষ্কার হাতের লেখায় রবীন্দ্রনাথ বোধ হয় প্রথম পথপ্রদর্শক, শরৎচন্দ্রের লেখা খুব ছোট ছোট হলেও বেশ পরিষ্কার। পরশুরামের লেখা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতার হিসাবে আদর্শ হাতের লেখা বলে গণ্য করা চলে। তাঁর একখানা বইয়ের সমস্ত পাণ্ডুলিপির মধ্যে কাটছাঁট, পরিবর্তন বা পরিবর্জন একেবারেই দেখা যায় না। হয়তো সামান্য কোথাও একটা কথা কাটা হয়েছে, তাও আমরা সাধারণ ভাবে যেমন করে কাটি তা নয়। সে শব্দের উপর একটা ছোট কাগজ লাগিয়ে নতুন কথাটি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক পাণ্ডুলিপির শেষে লেখা আছে সমস্ত পাণ্ডুলিপির শব্দসংখ্যা। তার পর সমস্ত শব্দসংখ্যা, প্রতি লাইনের মাপ, প্রত্যেক পাতার লাইন-সংখ্যা, প্রত্যেক লাইনের মধ্যে ফাঁকের মাপ— ইত্যাদি গুনেগেঁথে পরশুরাম এমন ভাবে নিজের কল্পিত নিখুঁত হিসাব করে দেন যে, বই ছাপা হয়ে গেলে দেখা যায় তাঁর বই তাঁর হিসাবের চেয়ে এক লাইন কম বেশি হয়নি। এ বিষয়ে তাঁর নিজের হিসাব-প্রণালী কতটা সূক্ষ্ম ও অভিনব তা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। সমস্ত বইয়ের কত খরচ তিনি এমন চমৎকার ভাবে প্রস্তুত করেন যে পুস্তক প্রকাশের পর দেখা যায় যে অনেক সময় টাকা আনা পাই পর্যন্ত সঠিক হয়েছে।’’

বাইরে থেকে রাজশেখর বসু ছিলেন অত্যন্ত রাশভারী ও গম্ভীর। যখন তিনি ‘চলন্তিকা’র সৃষ্টিতে ব্যস্ত, তাঁর স্ত্রী অনুযোগ করেছেন, কোনও প্রশ্ন করলে উত্তর না দিয়ে একটি কাগজ এগিয়ে দিতেন। সে সব কাগজে স্ত্রীর সম্ভাব্য সব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে লেখা। 

এক বার পেনসিল কাটতে গিয়ে আঙুলে একটু আঘাত লাগে। ওষুধ দিয়ে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়েছেন। যিনিই আসেন, প্রশ্ন করেন, কী হয়েছে? অযথা প্রশ্ন ও তার উত্তর এড়াবার জন্য একটা পিচবোর্ডে লিখে রেখে দিলেন, ‘‘পেনসিল কাটতে গিয়ে আঙুলে সামান্য কেটেছে, উদ্বেগের কারণ নেই।’’ 

অথচ ইনিই আড্ডায় অন্য মানুষ। আড্ডাটি বসত রাজশেখর বসুর পৈতৃক বাসভবন ১৪নং পার্শিবাগান রোডে। আড্ডার নাম ছিল, উৎকেন্দ্র সমিতি। এই নামটিও দেন রাজশেখর। আড্ডা রোজই বসত, তবে জমজমাট হত রবিবার। চা, দাবা ও তাসের সঙ্গে চলত মনস্তত্ত্ব, বিজ্ঞান, শিল্প, কাব্য, পুরাণ, ইতিহাস, আরও নানা প্রসঙ্গের আলোচনা। 

এক দিন আড্ডায় পুরাণের আলোচনা চলছে, এক আড্ডাধারী জিজ্ঞেস করলেন, পুরাণের আদিত্যগণ বুঝলুম, কিন্তু বসুগণ কারা? রাজশেখর বসুর চটজলদি উত্তর, ‘‘কেন আমরা!’’ অর্থাৎ শশিশেখর, রাজশেখর, কৃষ্ণশেখর ও গিরীন্দ্রশেখর বসুরা (এঁরা রাজশেখর বসুর ভাই)। 

রাজশেখর বসু যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল বলে এক জন প্রশ্ন করেছিলেন, আচ্ছা, দাড়ি কামাবার পর ব্লেডগুলো যে ফেলে দিই, ওতে কোনও কাজ হয় না? রাজশেখর এ বারও দ্রুত জবাব দিলেন, ‘‘পুঁতে দিলে গোলাপ গাছ হয়।’’

এক বার একটি বাচ্চা মেয়ের অটোগ্রাফ খাতায় রাজশেখর বসু কবিতা লেখেন— ‘‘এই যে তোমার আছে অটোগ্রাফ বই,/ হরেক রকম যাতে লেখা আর সই,/ লাগবে না কোনো কাজে, একেবারে ফাঁকি/ ছিঁড়ে ফেল পাতাগুলো। থাক শুধু বাকি/ সাদা পাতা আছে যত। 

সেই নোট বুকে/ এর পরে বড় হয়ে রেখো তুমি টুকে/ ধোবার হিসাব, দুধ, মাছ, তরকারি।/ এ সব হিসাব রাখা বড় দরকারি।’’

(গ্রন্থসূত্র: কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর, সবিতেন্দ্রনাথ রায়)

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা-৫৯

দক্ষতা ও আমলা

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার, সরকারি ও বেসরকারি এই দুই ক্ষেত্র থেকে ন’জনকে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে যুগ্মসচিব পদে নির্বাচিত করে নিয়োগ মঞ্জুর করেছে। সংখ্যাটি যথেষ্ট কম হলেও, শুরু হিসেবে এই ধরনের বাইরের পেশাদারদের সুযোগ দেওয়া দেরিতে হলেও একটি ভাল পদক্ষেপ। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে এত বেশি সংখ্যক প্রতিভাধর পেশাদার রয়েছেন, এটা মানতে হবে, দক্ষতা ও প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অনেক পেশাদার সরকারের মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা (আমলা ব্যবস্থা) থেকে বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ পাচ্ছেন না। এই প্রথম সরকার নীতিগত ভাবে দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে থাকা বিষয়টিকে মান্যতা দিল।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারে সত্তর দশক নাগাদ, প্রশাসনিক দফতর ব্যতীত অন্য দফতরগুলি থেকে প্রতিভা খুঁজে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আধিকারিককে সচিব পর্যায়ের অনুমোদন দেওয়া হত। এতে তথাকথিত টেকনোক্র্যাটরাও সুযোগ পেতেন তাঁদের প্রতিভা তুলে ধরার। জানি না, কী কারণে এটি তুলে দেওয়া হয়েছিল। 

লক্ষ করার বিষয়, সরকার কিন্তু বিশেষ ১০টি ক্ষেত্রে এই সব দক্ষ ও অসামান্য প্রতিভাধর লোকদের চেয়েছেন অভিজ্ঞতার নিরিখে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলিতে এ রকম লোকের অভাব হওয়ার কথা নয়, তাই দেখা যাচ্ছে ১০টি শূন্য পদের জন্য ছ’হাজারের বেশি আবেদন পড়েছে। এই পরিসংখ্যানটি সগর্বে ঘোষণা করছে যে আরও বেশি পদ তাঁদের জন্য খুলে দেওয়া জরুরি। 

মৃণাল মুখোপাধ্যায়

কলকাতা-৪২

অক্ষয় বিপ্লব

‘কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারশয্যায় চিরঘুমে কুন্তল আর বিপ্লব’ (১৭-৫) সংবাদ প্রসঙ্গে এই চিঠি। প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘‘আপনি এভারেস্টে উঠতে চান কেন?” উত্তরে সেই কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া উত্তর এসেছিল, ‘বিকজ় ইট ইজ় দেয়ার’। ব্যস! এটুকুই। আর কিচ্ছু নয়, সমৃদ্ধি নয়, স্বজনের ভালবাসা নয়, নায়ক সাজার অভীপ্সা নয়; স্রেফ জীবনকে বাজি রেখে, মৃত্যুকে ট্রাফিক সিগন্যালে থমকে রেখে দেওয়ার মতো অনায়াস কাণ্ড যাঁরা পারেন, তাঁরাই পারেন। আমরা তো সেই গ্যালাক্সির বাসিন্দাই হতে পারব না কখনও; আটপৌরে অস্তিত্ব, রক্ষণশীলতার চলমান কারাগার সব সময় এবং সর্বত্র অনুসরণ করে চলে আমাদের।

কিন্তু আমাদের হিন্দু স্কুলের সহপাঠী বিপ্লব (বৈদ্য) এমন বাঁচতে চায়নি। এই বিস্বাদ দৈনন্দিনতার ঊর্ধ্বে উঠে, আটহাজারি শৃঙ্গ জয়ের তুষার স্বপ্ন নিয়ে সব সময় মেতে থাকত বিপ্লব। কাঞ্চনজঙ্ঘা জয় করে বেসক্যাম্পে ফেরার পথে গত ১৫ মে হিমালয়ের কোলেই মাথা রাখল। আমরা যারা স্কুলে ওর সহপাঠী ছিলাম, তাদের অনেক অহঙ্কার ছিল ওকে ঘিরে, ওর প্রাপ্তিকে ঘিরে। ২০১৪-তে এভারেস্ট জিতেছিল। খবরটা পাওয়ার পর চূড়ান্ত অবিশ্বাস আমাদের। এ আবার হতে পারে নাকি? আমাদের ছাপোষা মধ্যবিত্ত জীবনে এই অদম্য প্রাণশক্তি, সঙ্কল্প, মৃত্যুকে করতলে মুঠোফোনের মতো ধরে উপরে উঠে চলার সাহস কোথা থেকে আসে? এ আমাদেরই বিপ্লব তো? যখন জানলাম ও আমাদেরই বিপ্লব, আমাদের একান্ত নিজস্ব বিপ্লব, তখন ওর সহপাঠী হওয়ার সৌভাগ্যকে অবিশ্বাস্য মনে হত। 

আবার ম্যালোরিকে মনে পড়ছে। বলছেন, "People ask me 'What is the use of climbing Mount Everest?' And my answer must be at once be, 'It is of no use.' There is not the slightest prospect of any gain whatsoever... We do not live to eat and make money. We eat and make money to be able to live. That is what life means and what life is for."

বিপ্লব জীবনের সেই বৃহত্তর সম্ভাবনাকে গোগ্রাসে গিলেছিল। মৃত্যু তার পার্থিব অস্তিত্বকে গিলে নিয়েছে। কিন্তু যে মৃত্যুঞ্জয়ী বিজয়পতাকা ওই আটহাজারি শৃঙ্গে গেঁথে এসেছে বিপ্লব, তার কোনও ক্ষয় নেই।

শান্তনু মুখোপাধ্যায়

কলকাতা-৯১

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।