মেরুনা মুর্মুর লেখা ‘ঠিক সাঁওতালদের মতো’ (৩০-৬) পড়ে কিছু ক্ষণ বসে রইলাম, নির্বাক। ওঁর লেখা চাবুকের মতো আছড়ে পড়েছে আর রক্তাক্ত করেছে। সত্যি, এ আমার, আপনার, সবার পাপ। আমি আমার ছোট্ট পারিবারিক, সামাজিক ঘেরাটোপে বসে ওঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যে সামাজিক বৈষম্যের কথা উনি বলেছেন, তা নিয়ে লিখে ফেলা যায় এক আকাশ। তবে মনে হয়, এই ‘এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই’ সময়ে, বিশেষ কাজে আসবে না সেই প্রয়াস। আমাদের মানসিক গঠনটাই এক বিশেষ প্যাটার্ন নিয়ে নিয়েছে। 

শুধু ‘রায়বাবু’কে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ওই সময়ের লেখকদের কলমও আমাদের ভাবতে শিখিয়েছে, আদিবাসী এলাকায় ঘুরতে যাওয়া মানেই নেশা করা (মহুয়া, হাঁড়িয়া ইত্যাদি) আর সুলভ আদিবাসী নারীমাংস চেটেপুটে খাওয়া। মহাশ্বেতাকে ক’জন মনে রাখেন, যখন হাত বাড়ালেই অরণ্যের অন্য ভাবে চিত্রিত দিনরাত্রি?

বিপ্লব ঘোষ, কলকাতা-৮

 

শ্লেষ ঠিক নয়

 ‘ঠিক সাঁওতালদের মতো’ (৩০-৬) লেখাটিতে, গুনে দেখলাম, ১১টি অনুচ্ছেদ আছে। প্রেশার কুকারের ১১টা সিটির মতো। তীব্র তীক্ষ্ণ শব্দে অনেকখানি ভিতরে জমে থাকা বাষ্প বেরিয়ে গেল। না বেরোলে প্রেশার কুকারটা ফেটে যেত। সোনার চাঁদ , সোনার টুকরো! ছিঃ। উৎকর্ষ কেন্দ্রে উৎকৃষ্টতর বিদ্রুপই বটে! লেখিকার সপক্ষে একশো একটা যুক্তি দেওয়া যায়, কিন্তু দেব না। বরং একটা লাইন নিয়ে তীব্র আপত্তি আছে। ‘‘খুঁটিনাটিতে বিশ্বাস রাখা (সত্যজিৎ) রায়বাবু বোধ হয় ‘সাঁওতাল’ চরিত্র বলেই প্রায় নির্বাক দুলির ভূমিকায় টিকলো নাক, টানা চোখের অভিনেত্রী সিমি গারেওয়ালকে কালো রং মাখিয়েই চরিত্রায়নের দায় সেরেছেন।’’— কথাটার মধ্যে তীব্র শ্লেষ আছে । সত্যজিৎ বোধ হয় এর যোগ্য নন।

শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ সত্যজিৎ কিন্তু, এই লেখাটারই মতো, তথাকথিত শিক্ষিত, সভ্য, প্রগতিশীল নাগরিক সমাজের অন্তরে সযত্নে লালিত নীচতাকে, তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন। ছবিতে তার মুখপাত্র মনমোহন মিত্র (উৎপল দত্ত) স্পষ্ট বলেন, তিনি যে তথাকথিত অ-সভ্য নন, প্রায় গোটা পৃথিবী ঘুরে, জীবনের উপান্তে এসে, সেটা তাঁর পক্ষে ভীষণ পরিতাপের বিষয়। উঁচু জাত-নিচু জাত, আর্টিস্ট-আর্টিজ়ান, শহুরে সংস্কৃতি-প্রান্তিক সংস্কৃতি নিয়ে এক শ্রেণির মানুষের হাস্যকর উন্নাসিকতা— এই সব কিছুকেই সত্যজিৎ তীব্র আক্রমণ করেছেন এই ছবিতে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, জীবনের প্রকৃত শিক্ষা ও সংস্কৃতি অর্জন করতে হয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না।

ছবির শেষে শহুরে মানুষদের থেকে অনেক দূরে বোলপুরের সাঁওতালদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েই তিনি মানসিক শান্তি খুঁজে পান। সাঁওতালদের সঙ্গে সাঁওতালি ভাষাতেই কথা বলেন। বিকেলে একটা নাচের আয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু সেই নৃত্য-গীত-বাদ্যের মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে সুধীন্দ্র বসুর স্ত্রী অনিলা বসু (মমতাশঙ্কর) স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই সাঁওতাল মেয়েদের নাচের ছন্দে পা মেলান।

শঙ্খমণি গোস্বামী, কলকাতা-১২২

 

অন্য ক্ষেত্রেও

সুলিখিত নিবন্ধটির ছত্রে ছত্রে লেখকের ক্ষোভ, রাগ, অভিমান যথার্থ প্রকাশ পেয়েছে। তবে রাজ্যের মানুষের এই মানসিকতা শুধু সাঁওতালদের সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয়। জাতপাতের প্রশ্নে বাঙালিরা যে নিজেদের মধ্যেই নানা ভাবে বিভক্ত, তা পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনে চোখ রাখলেই বুঝতে পারা যায়। শিক্ষিতরাই এই জাতপাত কুসংস্কারের বেড়াজাল এখনও অতিক্রম করতে পারেনি। তাই এই বাঙালিরা (সবাই নয়) যে সাঁওতালদের ভিন্ন চোখে দেখবে তাতে আর আশ্চর্য কী? তবে শিক্ষা এবং মেধা মানুষকে মাথা উঁচু করে চলতে শেখায়। যেটা লেখিকা পেরেছেন এবং তাঁদের প্রতি সংঘটিত এই অবজ্ঞা, উপহাস, অবহেলার প্রতি ধিক্কার জানাতে পেরেছেন, মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন। তবে রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সাঁওতাল নাচের যে ছন্দোময় নান্দনিকতা, তার সমাদর হলে কোনও খেদ থাকার কথা নয়।

অশেষ দাস, কলকাতা-১১০

 

‘বাবু’দের সমস্যা

লেখাটির অনুসরণে আমি তথাকথিত ভদ্র মার্জিত শিক্ষিত মানুষজনকে— যাঁরা ভুলভুলাইয়া ধর্মগ্রন্থের আবেশে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও পচনশীল সমাজব্যবস্থা জিইয়ে রেখে মানুষের মনে জাতপাতের বীজ বপন করছেন— হাজার ধিক্কার জানাই।

‘জাতপাত’, ‘অল্পশিক্ষিত’, ‘অসভ্য’ এবং ‘সংরক্ষণ’ ইত্যাদি কথাগুলি শিক্ষালয়ে ও অফিস-আদালতে চতুরতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, ব্যক্তিবিশেষ বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অপমান করার জন্য। বর্ণবিদ্বেষ শুধু নয়, কথিত ‘বাবু’দের সমস্যা অন্য জায়গায়। সংরক্ষণের বন্দোবস্তটি সেই বাবুদের প্রবল নিরাপত্তাহীনতায় ঠেলে দিচ্ছে, যাঁরা কিনা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করাকে বেদগ্রন্থ-অর্পিত অধিকার ভেবে নিয়েছিলেন। দিন দিন সমাজ ও কর্মস্থলে তাঁদের ‘ম্যানেজারগিরি’ কমে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে সমাজের দুর্বল শ্রেণির জনগণকে বঞ্চিত রেখে সুখী দিন যাপনের স্মৃতি ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। তাঁরা আজ হতাশাগ্রস্ত। তাই সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে আসীন শিক্ষিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে হেনস্থা বা অপমান করতে তাঁদের রুচিতে বাধে না।

ধীরেন্দ্রনাথ মুর্মু, ঢাকিবাদ, পুরুলিয়া

 

সংরক্ষণ নিয়ে

নৈতিক বা রাজনৈতিক যে কোনও আলোচনাতেই কিন্তু সংবিধানে সংরক্ষণের মূল লক্ষ্য, কারণ বা উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করা হয়। এই লেখাটিতেও লেখিকা সন্তর্পণে সংরক্ষণের বিষয়কে অন্য ভাবে পাশ কাটিয়েছেন, যদিও এখন শিক্ষিত সমাজের অনেকেরই জনজাতির উপর আক্রোশটা স্রেফ সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে।

লেখিকা ছাত্রীদের কাছে যেমন শুনেছিলেন ‘ছোট জাত আর মুসলিম পাত্রকে কখনও বিয়ে করবে না তারা’, তেমনই সংরক্ষণের ইসুতে দিনরাত গালমন্দ করা ছাত্রছাত্রীরাও আজ অনেকেই স্কুল বা কলেজে পড়ায়, কেউ কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয়েও।

সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই দেখা যাবে, সংরক্ষণের ইসুতে ঝাঁকে ঝাঁকে তির। ‘ইন্ডিয়া এগেন্সট রিজ়ার্ভেশন’ বা ‘রিজ়ার্ভেশন ফ্রি ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি গ্ৰুপগুলোতে সংরক্ষণ বিষয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের পোস্ট বা শেয়ারগুলোও আদিবাসীদের প্রতি ভয়ঙ্কর রাগ এবং বিদ্বেষ প্রকাশ করে।

যেমন, লেখা হয়, ‘‘জাতের ভিত্তিতে কোটার সুবিধা নিতে বাধে না, আবার জাত তুলে কথা বললেই দোষ!’’ বা যে কোনও বাড়ি, ব্রিজ ইত্যাদি ধসে পড়লে এস সি এস টি-দের দোষ দেওয়া হয়। ট্রেনের ভ্যাকুয়াম পাইপ লাগাতে গিয়ে রেলের ইঞ্জিনিয়ার বগি দু’টির মাঝে লাইনে আছেন, আর সেই অবস্থাতেই ট্রেন চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে— এই ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়াতে, কোনও কিছু না জেনেই সেই ড্রাইভারকে এস সি বা এস টি তকমা দিয়ে দেওয়া হয়! বলা হয়, এস সি এস টি-দের চাকরি দিলে তার ফল এ রকমই হবে।

বিহারের শিশুরা মারা গেলে বলা হয়, ২০০ শিশু কেন, ‘কোটার মাল’দের চাকরি দিলে দু’হাজারেরও বেশি মরবে। এই সব পোস্টে সমাজের যে অসুস্থ মানসিকতা প্রকাশিত হয়, তার সমাধান কী?

পার্শাল কিস্কু, রানিগঞ্জ, পশ্চিম বর্ধমান

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

ভ্রম সংশোধন

‘অসামান্যা নিবেদিতা’ (৫-৭) শীর্ষক চিঠিতে, হর্ষ দত্তের নিবন্ধের নাম লেখা হয়েছে ‘শঙ্খের মাঝে বজ্র’। ওটি হবে ‘পদ্মের মাঝে বজ্র’। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।