নাসিরুদ্দিন শাহ বুলন্দশহরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর ধর্মবোধহীন ভাবে বড় হয়ে ওঠা সন্তানদের জন্য দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন, কারণ উন্মত্ত জনতা তাদের ঘিরে ধরে তারা হিন্দু না মুসলিম জিজ্ঞাসা করলে তারা কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু ভারতীয়রা সাধারণত ধর্ম-ঔদাসীন্যকে অপরাধ বা পাপ বলে মনে করেন না। ভারতে চিরকালই নাস্তিক্যবাদ চর্চার একটি ধারা বহমান। নাস্তিক চার্বাকদের সনাতন ভা‌রত কখনও বর্জন করেনি, বরং ঋষির মর্যাদা দান করেছিল। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান গৌতম বুদ্ধ প্রচ্ছন্ন ভাবে নাস্তিকতার চর্চা করতেন। ‘‘ঈশ্বর আছেন কি না?’’ শিষ্যদের এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি নীরব থাকতেন। ‘‘হ্যাঁ’’ কিংবা ‘‘না’’ কিছুই বলতেন না। বাহ্মণ্যবাদীরা তাঁর বেদ-ব্রাহ্মণ বিরোধিতাকে আক্রমণ করতেন, তাঁর নাস্তিকতাকে নয়। পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দিহান বুদ্ধদেবকে অবতার বলে মেনে নিতে বৈদিকদের কোনও অসুবিধা হয়নি। তীর্থঙ্কর মহাবীর প্রায় নাস্তিক ‘অজ্ঞেয়বাদী’ ছিলেন। তীর্থঙ্করগণ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে মানুষের জ্ঞানের অতীত বলে মনে করতেন। চার্বাক, বুদ্ধ বা মহাবীর কাউকেই ভারত ব্রাত্য করে দেয়নি। পরিবর্তে আপন করে নিয়েছে। আধুনিক ভারতে নাস্তিকতার চর্চা অব্যাহত। তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধি ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন। তাঁর অসংখ্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, কিন্তু নাস্তিকতার কারণে তাঁকে কেউ ভয় দেখাননি, আক্রমণও করেননি। বামপন্থী জ্যোতি বসু থেকে আজকের সূর্যকান্ত মিশ্র পর্যন্ত সবাই ধর্ম-উদাসীন। ধর্ম ঔদাসীন্যের কারণে এঁদের কাউকেই কখনও আক্রান্ত হতে হয়নি। ভারতে কখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। সনাতন ধর্ম এ ধরনের ঘটনা ঘটায় না। এ ঘটনা বরং ঘটে অন্য দেশে, অন্য ধর্মে। নাসিরুদ্দিন আপাতত সন্তানদের ধর্মহীনতাজনিত আতঙ্ক ত্যাগ করতে পারেন। 

সনাতন পাঠক

ইমেল মারফত

 

বিদ্রোহী যাজক

‘বিদ্রোহী ধর্মযাজক’ (রবিবাসরীয়, ১৬-১২) প্রসঙ্গে এই চিঠি। জেবেজ় সান্ডারল্যান্ডের মতোই ইংল্যান্ডে ছিলেন আরও এক জন বিদ্রোহী ধর্মযাজক, যিনি সাম্রাজ্যবাদের কঠোর সমালোচক। তাঁর নাম হিউলেট জনসন, ডিন অব ক্যান্টারবেরি। কিন্তু সোভিয়েট ইউনিয়ন তথা স্তালিন জমানার সরব সমর্থক হিসাবে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘রেড ডিন অব ক্যান্টারবেরি’ নামে। এক জন ‘খ্রিস্টান কমিউনিস্ট’ হিসাবে তিনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন, জিশু খ্রিস্টের কল্পিত স্বর্গরাজ্য পৃথিবীতে স্থাপন সম্ভব সাম্যবাদী দর্শনের ফলিত প্রয়োগের মাধ্যমেই। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, জিশু নিছক ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এক আপসহীন বিপ্লবী (দ্রষ্টব্য: রেজ়া আসলানের লেখা গ্রন্থ ‘জ়িলট: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব জেসাস অব নাজ়ারেথ)।

জনসন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি এসসি ডিগ্রি লাভ করে, ওয়্যাডহ্যাম কলেজে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯০৪-এ যাজক হন। ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থা এম-ফিফটিন তাঁর উপর কড়া নজরদারি শুরু করে। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য না হলেও, তিনি পার্টির মুখপত্র ‘দ্য ডেলি ওয়ার্কার’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত ছিলেন।

১৯৩০ সালে মহামন্দায় আক্রান্ত ইংল্যান্ডের অর্থনীতির সঙ্গে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাধীন সোভিয়েট ইউনিয়নের অর্থনীতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ তাঁকে প্রাদপ্রদীপের আলোয় আনে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৭ তিনি সোভিয়েট ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে লেখেন তাঁর মহাগ্রন্থ ‘দ্য সোসালিস্ট সিক্সথ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’।

১৯৩৯ সালে মলোটড রিবেনট্রপ চুক্তির পরে জনসন যুদ্ধের বিরোধিতা করেন। এম-ফিফটিন রিপোর্ট দেয়, সৈন্যবাহিনীর সামনে ডিন অব ক্যান্টারবেরির বক্তৃতা বাঞ্ছনীয় নয়। রাসেলের সঙ্গে একযোগে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করেন। সমালোচনার উত্তরে জনসন জানান, তিনি ধর্ম এবং রাজনীতির তফাত বোঝেন। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর আনুগত্যের কারণ, পুঁজিবাদের কোনও নৈতিক ভিত্তি নেই। তিনি ‘অর্ডার অব দ্য রেড ব্যানার’ এবং ‘স্তালিন ইন্টারন্যাশনাল পিস প্রাইজ়’ সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী— ‘সার্চিং ফর লাইট’।

শিবাজী ভাদুড়ী

সাঁতরাগাছি, হাওড়া

 

সিঙ্গুর

‘সিঙ্গুর নিয়ে ভাবনা’ (২৯-১২) শীর্ষক চিঠিটি সুচিন্তিত সন্দেহ নেই। কিন্তু যে পদ্ধতিতে উনি সিঙ্গুরে শিল্প গড়ার কথা বলেছেন তা চারটি কারণে সম্ভব নয়। এক, ল্যান্ডবন্ড জিনিসটা কী— খায় না গায়ে মাখে, তা-ই অধিকাংশ কৃষক জানেন না। যদিও বা সরকারের তরফে তাঁদের বোঝানো হয়, তাঁরা হুট করতে রাজি হবেন না, কারণ হঠাৎ টাকার দরকার পড়লে জমিই তাঁদের ভরসা। কেননা তাঁরা জানেন, যে-সরকার মাসে দু’হাজার টাকা নিয়মিত দিতে পারে না, তারা এককালীন বন্ড বন্ধক বা বিক্রির টাকা সময়মতো দিতে পারবে না। কৃষকদের এ কথা অজানা নয় যে, সরকারের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। দুই, যে সিঙ্গুর-আন্দোলনকে পাথেয় করে তৃণমূল সরকার প্রতিষ্ঠিত, সেই সিঙ্গুরে এই সরকার কখনও শিল্পের জন্য উৎসাহ দেখাবে না। তিন, সরকার রাজি হলেও রাজ্যের বিরোধী দলগুলি রাতারাতি কৃষকদের ভোট পাওয়ার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলবে। সবার আগে কৃষকদরদি সেজে এগিয়ে আসবে সিপিএম, যে দল এ রাজ্যে জমি ফিরে পেতে মরিয়া। চার, টাটাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এ রাজ্যে কোনও শিল্পপতি বিতর্কিত জমিতে শিল্প গড়তে আর আসবেন না। কেননা শিল্পপতিরা ব্যবসা করতে আগ্রহী, তাঁরা কৃষকদের সঙ্গে সরকারের জমি-কোন্দলে মাথা গলাবেন না।

কমল চৌধুরী

কলকাতা-১৪০ 

 

শ্রমিক তহবিল

গৃহ এবং অন্যান্য নির্মাণকাজে ঠিকাদারদের অধীনে নিযুক্ত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষায় ভারত সরকার ‘লেবার ওয়েলফেয়ার’ শুল্ক (সেস) বলবৎ করেছে, যা সমস্ত রাজ্য সরকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই আদেশবলে সব রাজ্য তাদের অধীনে নির্মাণকাজে নিযুক্ত ঠিকাদারদের নির্মাণ বাবদ অর্জিত অর্থ (বিল) থেকে এক শতাংশ হারে অর্থ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট তহবিল গঠন করবে। আদেশনামায় ঠিকাদারকে এমপ্লয়ার আর সরকারি অফিসারকে সেস সংগ্রহকারী বলা হয়েছে। এমপ্লয়ারের কাজের মূল্য (বিল) থেকে সংগ্রহকারী এই সেস সংগ্রহ করবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে পূর্ত, সেচ প্রভৃতি দফতরে ঠিকাদারদের নির্মাণকাজের প্রকৃত মূল্যের সঙ্গে ওই মূল্যের এক শতাংশ অর্থ সেস হিসাবে পৃথক ভাবে দেওয়া হচ্ছে, অর্থাৎ এই অতিরিক্ত অর্থ ঠিকাদারদের নির্মাণকাজের মূল্য হিসাবে প্রাপ্য নয়। নির্মাণকাজের প্রকৃত মূল্য যদি ১০০০০০ টাকা হয়, তবে ঠিকাদার পাচ্ছেন ১০১০০০ টাকা। এই অতিরিক্ত ১০০০ টাকা ওই ঠিকাদারের বিল থেকে সংগ্রহ করে ৯৯০ টাকার ‘লেবার ওয়েলফেয়ার’ তহবিল গঠন হচ্ছে এবং ১০ টাকা সংশ্লিষ্ট দফতর তাদের আয় হিসাবে পাচ্ছে। অথচ এই অতিরিক্ত ১০০০ টাকা পুরোটাই সরকারি অর্থ, কাজের মূল্য নয়। শ্রমিকদের সুরক্ষায় মালিকদের অর্থাৎ ঠিকাদারদের সামান্য হলেও দায়বদ্ধতা থাকে। সেই উদ্দেশ্যে ঠিকাদারদের অর্জিত অর্থে এই তহবিল গঠন হওয়া চাই। প্রকল্প বা কাজের মূল্য বাড়িয়ে নয়। শ্রমিকদের সুরক্ষায় তহবিল গঠন ঠিকাদারদের অর্জিত অর্থের সেস বা শুল্ক থেকেই হওয়ার কথা। অথচ পূর্ত, সেচ দফতরগুলো সেই তহবিলে যে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যবহার করছে তা সঠিক নয়।

সুব্রত সরকার

কলকাতা-১২৯

 

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।