বিজ্ঞানের নামে ভণ্ডামি কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল, গড-পার্টিকল, বা ঈশ্বরকণা নিয়ে। সাম্প্রতিক সংযোজনে এলেন মৎস্য অবতার, কূর্ম-অবতার, বিবর্তনের বার্তা নিয়ে। 

হিগ্‌স-বোসন, দশচক্রে ভূত হওয়ার মতো, হাস্যকর ঈশ্বরকণায় পরিণত হয়েছে। আমেরিকার নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লিয়ো লেডারম্যান জনপ্রিয় বিজ্ঞানভাষণে অদ্বিতীয় ছিলেন। জনপ্রিয় বিজ্ঞানের উপর তাঁর বই প্রকাশিত হল, বইটি পদার্থবিদ্যা ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সহজবোধ্য সমাবেশ। বইটির নাম— ‘গড পার্টিকল: ইফ দি ইউনিভার্স ইজ় দি অ্যানসার, হোয়াট ইজ় দ্য কোশ্চেন?’ এখানে মোটেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব সমর্থন করা হয়নি। 

বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যেখানে জবাব, সেখানে ঈশ্বরের স্থান কোথায়?

লেডারম্যান নিজেই বলেছিলেন প্রকাশককে, যে রহস্যময় কণার সন্ধান পেতে এত ঝঞ্ঝাট, অক্লান্ত পরিশ্রম, তার নাম হোক 'God damn particle'— প্রকাশক শোনেননি, 'damn' শব্দটি বেমালুম বাদ দিলেন। ‘অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ’-র মতো।

মৎস্য, কূর্ম অবতার ইত্যাদি পুরাণকথায় কোনও বিজ্ঞান নেই। সুদর্শন চক্র রিমোট কন্ট্রোলে চলত না, পুষ্পক রথ হেলিকপ্টার নয়। বলা আছে, এ সব দেবতা-দানবেরা চালাতেন তাঁদের অত্যাশ্চর্য ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অবদানে নয়। অহেতুক হিন্দু শাস্ত্রকে ভণ্ড বিজ্ঞানের মোড়কে উপস্থাপিত করার চেষ্টায় শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের ক্ষুব্ধ ও পীড়িত করা হচ্ছে।

এ যাবৎ যত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব উদ্ভাবিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে ডারউইন-এর বিবর্তনবাদ অন্যতম। তা স্কুলপাঠ্য হওয়া উচিত, যাতে কিশোর মনের উপর মৎস্য বা কূর্ম অবতারের অপবৈজ্ঞানিক প্রভাব না পড়ে। পৌরাণিক কল্পকথায় ছদ্মবিজ্ঞানের প্রলেপ দিয়ে এই অপপ্রচার ভারতকে গৌরবান্বিত নয়, হাস্যকর করে তুলছে।

অনিশা দত্ত

কলকাতা-৬৪

 

অবিজ্ঞানের দায়

‘কমরেড, নব যুগ আনলে না?’ (১-১২) লেখাটির জন্য সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে দুয়েকটি কথা সংযোজন করতে চাই। ব্রাহ্মণ্যবাদে প্রভাবিত, ধর্মান্ধতা, জাতপাত ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানচেতনা, বস্তুবাদী চেতনার বিকাশ না ঘটলে মার্ক্সবাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় না— এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টির জন্মলগ্ন থেকেই পার্টি নেতৃত্ব এ কথা মানলেও, তা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। তাঁরা ভেবেছিলেন পার্টির অগ্রবর্তী অংশ (vanguard) সাধারণ শ্রমিক কৃষকের হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের দ্বারা সমাজ পরিবর্তন করবে এবং সেই বিপ্লবে অত্যাচারিত, শোষিত শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণি নেতৃত্বের আজ্ঞাবহ সৈনিক হিসাবে অস্ত্র কাঁধে তুলে নেবে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আপন নিয়মেই সাধারণ মানুষের পশ্চাৎপদতা দূর হয়ে যাবে, ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব বিলোপ হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিপ্লবের পরে মানুষের একসঙ্গে অর্থনৈতিক শোষণ মুক্তি এবং ধর্মান্ধতা, জাতপাত, কুসংস্কার থেকে মুক্তি ঘটবে।

পরবর্তী কালে এ দেশে সমাজ পরিবর্তনের পথ নিয়ে মতপার্থক্যে পার্টি ভেঙেছে দু’বার, কিন্তু কোনও বারই সাধারণ মানুষের বিজ্ঞানচেতনার বিকাশ মতপার্থক্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি। সত্তরের দশকে সারা দেশ জুড়ে বিপ্লবী রাজনীতির উত্তাল ঢেউ স্তিমিত হওয়ার পর, এ দেশের সচেতন মানুষ (অবশ্যই তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশ সত্তরের আন্দোলনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মী)-এর চিন্তা জগতে পরিবর্তন আসে। তাঁদের চিন্তায় প্রাধান্য পায় সাধারণ মানুষের ধর্মান্ধতা, জাতপাত, কুসংস্কার-সহ সমস্ত ধরনের পশ্চাৎপদ মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে বিজ্ঞানচেতনা, বস্তুবাদী চেতনা প্রসারের প্রয়োজনীয়তা।

পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির আঙিনার বাইরে সংগঠিত ভাবে বিজ্ঞান আন্দোলনের সূত্রপাত ১৯৪৮ সালে আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর তৈরি ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’-এর হাত ধরে। সেই সময় থেকে সত্তর দশকের শেষ দিক পর্যন্ত বিজ্ঞান আন্দোলন মূলত ছিল বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ আন্দোলন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহিত করা। পরবর্তী কালে এই আন্দোলনের অংশীদার হয় ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সায়েন্স ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন’-সহ বেশ কিছু সংগঠন।

সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ভাবে বেশ কিছু বিজ্ঞান সংগঠন তৈরি হতে শুরু করে, যাদের সঙ্গে অতীতের বিজ্ঞান সংগঠনগুলির নীতিগত ও কর্মসূচিগত পার্থক্য লক্ষ করা যায়। বিগত ২০০ বছরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে ব্যাপক অগ্রগতি, তারা তা প্রচারের পরিবর্তে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে গড়ে ওঠা প্রযুক্তির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ ও অপবিজ্ঞানের প্রয়োগের দ্বারা বিজ্ঞানকে শোষণের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই সময় থেকে বিজ্ঞান আন্দোলন যে নতুন শব্দবন্ধ পরিচিতি লাভ করে তা হল ‘গণবিজ্ঞান আন্দোলন’।

নকশাল আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ার পর পশ্চিমবঙ্গ-সহ সারা ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল আশির দশকের ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশকে দলীয় রাজনীতি-বিমুখ করে তুলেছিল। বিপরীতে তারা এই নতুন ধারার গণবিজ্ঞান আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে। সেই কারণে আশি এবং নব্বইয়ের দশকে ‘গণবিজ্ঞান আন্দোলন’ ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ঠিক এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের জন্ম। 

সব্যসাচীবাবু সিপিএমের পার্টি চিঠির যে অংশটুকু উল্লেখ করেছেন, ‘‘...এই আন্দোলনে বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মনোভাবাপন্নদেরই প্রাধান্য থেকে গেছে...’’ তা পড়লেই বিজ্ঞানমঞ্চ গঠনের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। যা আরও পরিষ্কার হয় বিজ্ঞান মঞ্চের নদিয়া জেলা কমিটির প্রতিবেদনে উল্লিখিত সদস্য সংখ্যার কোটা পূরণের সাফল্য প্রকাশ থেকে। আর সে কারণেই পার্টির নেতারা বিজ্ঞান মঞ্চেরও নেতার ভূমিকা পালন করেন। ফলত সরকারি কর্মসূচি ও বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মসূচি হাত ধরাধরি করে চলে।

বিজ্ঞান সংগঠন হিসাবে মঞ্চের ভিতরে পার্টির মতামত এবং সিদ্ধান্তের বাইরে কোনও স্বাধীন চিন্তার পরিসর না থাকায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে পার্টির ভাবনা এবং বিজ্ঞান মঞ্চের ভাবনায় কোনও পার্থক্য সূচিত হয় না। মঞ্চের ভিতরে মতাদর্শগত লড়াই না থাকার ফলেই, পরমাণু অস্ত্র ও পরমাণু বিদ্যুৎ সম্পর্কে পার্টির অবস্থান ও মঞ্চের অবস্থান একই থেকে যায়। শুধু বিজ্ঞান মঞ্চ কেন, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে সহমত তৈরি করার জন্য কোনও মতাদর্শগত লড়াই ছিল না। তাই বামফ্রন্টের শরিক আরএসপি পরমাণু বিদ্যুৎ প্রযুক্তি বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও, বামফ্রন্টের রাজত্বকালে দু’দু’বার পশ্চিমবঙ্গে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ করা হয়েছিল। এমনকি পরমাণু অস্ত্র সম্পর্কে সকলে সহমত হওয়া সত্ত্বেও ১৯৯৮ সালের ১১ মে পোখরানে পাঁচটি পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোর পর কলকাতার বুকে দু’টি আলাদা মিছিল হয়েছিল। একটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সিপিএম-এর বিভিন্ন শাখা সংগঠন এবং বিজ্ঞান মঞ্চের উদ্যোগে, অপরটি গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্র-সহ বিভিন্ন গণসংগঠনের যৌথ উদ্যোগে। উল্লেখযোগ্য, আরএসপি-র বিভিন্ন শাখা সংগঠন কিন্তু দ্বিতীয় উদ্যোগে শামিল হয়েছিল।

সংগঠনের অভ্যন্তরেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিক অবস্থান নির্ণয়ের জন্য আলাপ আলোচনা বিতর্কের অনুপস্থিতি এবং প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা না থাকার ফলে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীদের বস্তুবাদী চেতনার প্রসারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, ১৯৮৬ সালে বিজ্ঞান মঞ্চ গঠনের পরেও। তাই আজকে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির এই বাড়বাড়ন্তের দায় তো বামফ্রন্টের উপর বর্তাবেই।

প্রদীপ বসু

নৈহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।