কলিকাতার ‘লাইফলাইন’ মেট্রোরেল। যাত্রাপথ সম্প্রসারণের অব্যবহিত পর হইতেই মহানগরীর মেট্রো-নির্ভরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। আশা, সম্প্রসারণের অন্য পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত হইলে এই নির্ভরতা প্রগাঢ়তর হইবে, সড়কপথের যানজট, দূষণ এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার হাত হইতে পরিত্রাণ পাইতে সাধারণ মানুষ আরও বেশি করিয়া পাতালপথ বাছিয়া লইবেন। নির্ভরতা অত্যধিক বলিয়াই মেট্রোর গতিপথ সুষ্ঠু ও অবাধ করিবার প্রয়োজন ছিল সর্বাগ্রে। এই ক্ষেত্রে সামান্যতম বিচ্যুতিও সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করিয়া দিবার পক্ষে যথেষ্ট। দুর্ভাগ্য, কলিকাতা মেট্রোর ক্ষেত্রে সেই বিচ্যুতির ঘটনাই বারংবার ঘটিতেছে। পরিণামে স্তব্ধ হইতেছে কলিকাতা। অতি সম্প্রতি যেমন ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে প্রায় চার ঘণ্টা মেট্রো চলাচল বন্ধ থাকিল। বাড়ি ফিরিবার পথে নাকাল হইলেন নিত্যযাত্রীরা।

মেট্রোয় এমন বিপর্যয় অবশ্য নূতন নহে। বিগত কয়েক বৎসরে বার বারই তাহার সাক্ষী হইয়াছেন যাত্রীরা। কখনও সুড়ঙ্গে ট্রেন আটকাইয়া পড়া, কখনও অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া, কখনও আত্মহত্যার কারণে পরিষেবা বন্ধ— তালিকা দীর্ঘ। সঙ্গে যোগ হইয়াছে দায়িত্ব পালনে মেট্রো কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত গাফিলতি। পরিষেবা বিঘ্নিত হইলেও হামেশাই যাত্রীদের সময়মতো জানানো হয় না। ঘোষণার ব্যবস্থাটিও আদ্যিকালের। সময়ের সঙ্গে স্টেশনের চাকচিক্য বাড়িলেও দুর্বোধ্য স্বরে মাইক্রোফোনে ঘোষণার রেওয়াজটিতে পরিবর্তন আসে নাই। সমস্যা আরও আছে। স্টেশনগুলিতে পর্যাপ্ত চলমান সিঁড়ি নাই। যেগুলিতে আছে, সেগুলিও প্রায়ই দীর্ঘ দিন খারাপ হইয়া পড়িয়া থাকে। প্রাচীন রেকগুলি জরাজীর্ণ হইয়াও চলাচল করে। কারণ নূতন রেকগুলি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে পূর্ণশক্তিতে চলাচলে সক্ষম নহে। সংক্ষেপে, এক সার্বিক জীর্ণতার চিহ্ন কলিকাতার ‘গর্ব’টির শরীরে। বড় কোনও দুর্ঘটনা যে এখনও ঘটে নাই, তাহা নিতান্তই নিত্যযাত্রীদের কপালগুণে।

এই জীর্ণতা শুধুমাত্র মেট্রোর, এমন কথা ভাবিলে ভুল হইবে। বস্তুত, কলিকাতার সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাটিই ধুঁকিতেছে। গণপরিবহণের মানোন্নয়ন লইয়া সরকারের কোনও মাথাব্যথা নাই। জ্বালানির দাম এবং ভাড়া সংক্রান্ত বিবাদে বেশ কিছু কাল যাবৎ বাসের সংখ্যা লক্ষণীয় ভাবে কম। গতিহীনতা এবং সীমিত দূরত্বের কারণে ট্রাম কখনও বাস-মেট্রোর বিকল্প হইয়া উঠিতে পারে নাই। সঙ্গে রহিয়াছে হলুদ ট্যাক্সির প্রত্যাখ্যান এবং বেপরোয়া ভাড়া হাঁকিবার প্রবণতা। সর্বোপরি, রাজনীতির দাপটে গণপরিবহণ ব্যবস্থায় কোনও প্রকার শৃঙ্খলাও আনা যায় নাই। এই কারণেই মেট্রো এত দ্রুত জনপ্রিয় এবং নির্ভরশীল মাধ্যম হইয়া উঠিয়াছে। এবং মেট্রোয় সামান্যতম গোলযোগ দেখা দিলেই সমগ্র যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম হইতেছে। অথচ, গণপরিবহণের গুরুত্ব তো শুধুমাত্র মধ্য ও নিম্নবিত্ত যাত্রীদের সুবিধার্থে নহে। পরিবেশের জন্যও তাহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লিতে দূষণ ঠেকাইতে সরকারি তরফে নাগরিকদের নিজ গাড়ির পরিবর্তে আরও বেশি গণপরিবহণ ব্যবহারের আবেদন করা হয়। কিন্তু এই রাজ্যের টনক নড়ে না। অতঃপর নিজ পদযুগলের উপর ভরসা ভিন্ন আর কী-ই বা উপায় আছে!