রাহুল গাঁধী প্রধানমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করিয়া যাহা বলিলেন, তাহার অর্থ দাঁড়ায়, মোদী রাফাল বিতর্ক হইতে বাঁচিতে শেষমেশ এক মহিলার পিছনে গিয়া লুকাইলেন! যেন, মহিলার শরণ লইবার মধ্যে পুরুষের চূড়ান্ত পরাজয় ও দীনতা স্ফুট হয়। ইহাতে অনেকেই চটিয়াছেন, জাতীয় মহিলা কমিশন তো ব্যাখ্যা চাহিয়া রাহুলকে নোটিস ধরাইয়া দিয়াছেন। প্রথমেই বলিয়া লওয়া আবশ্যক, রাহুলের বাক্যটির মূল উদ্দেশ্য মোদীকে ব্যঙ্গ করা, নারীজাতিকে ব্যঙ্গ করা নহে। এই দেশে অহরহ এমন বহু মন্তব্য বড় বড় মানুষের মুখ হইতে নিঃসৃত হইতেছে, যেগুলিকে বিশ্লেষণ করিলে নারীবিরোধ বা নারীবিদ্বেষ বাহির হইয়া আসিবে। নারীনিগ্রহের ঘটনা তো দেশ জুড়িয়া ঘটিতেছেই। সেই সকল ক্ষেত্রে জাতীয় মহিলা কমিশনের নির্বিকার হইয়া হাত গুটাইয়া বসিয়া থাকা যত বিস্ময়কর, এই উক্তিটির ক্ষেত্রে অতিশয় তৎপর হইয়া নোটিস প্রেরণ ততোধিক বিস্ময়ের। মোদী যখন রেণুকা চৌধুরিকে ‘শূর্পণখা’ বলিয়া বিদ্রুপ করিয়াছিলেন তখন এই দ্রুতি দেখা যায় নাই। রাহুলের কথাটির মূল সুর হইল, এক জন প্রধানমন্ত্রী নিজের কাজের পক্ষে উত্তর প্রদান বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সামান্য সাহসটুকু দেখাইতে পারিতেছেন না, অন্য লোককে দায়িত্ব দিয়া সরিয়া পড়িতেছেন। সেই পলায়নী মনোবৃত্তিটিকে বিদ্রুপ করিতে গিয়া তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর লিঙ্গগত পরিচয়টিকেও টানিয়া অানিয়াছেন। ইহাকে— মোদীর কথা অনুযায়ী— সমগ্র ভারতীয় নারীজাতির অপমান হিসাবে অভিহিত করিতে হইলে, বাক্যটির প্রধান উদ্দেশ্যটিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে উপেক্ষা করিতে হয় ও অপ্রধান অংশ লইয়া শোরগোল তুলিতে হয়।

কিন্তু তাহা বলিয়া রাহুলের মন্তব্যটির নিহিত নারীবিদ্বেষকে খেয়াল না করিলে চলিবে না। বস্তুত, উহার প্রতি বিশেষ নজর প্রদান বিধেয়। বিশেষত ইহার পরেই মোদীর প্রতি তাঁহার উপদেশ: কাঁপুনি থামাইয়া ‘পুরুষমানুষ’-এর ন্যায় কথার উত্তর প্রদান করুন— ইহাতে রাহুলের মনোভঙ্গির অধিক পরিচয় মিলে। নারী স্বভাবত পুরুষের তুলনায় দুর্বল, ভীরু, প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ কার্যে অক্ষম— এই ধারণা ভারতীয় সমাজে অতিপ্রচলিত। পুরুষের কাজ সংগ্রাম আর নারীর কাজ তাহাকে প্রেরণা ও জয়মাল্য প্রদান এবং অবশ্যই বীর ও ব্যস্ত পুরুষের যথোপযুক্ত সেবা— ইহা বলিয়া ও নারীর এই ভূমিকাকে মহিমা প্রদান করিয়া কত যে বিশাল কাব্য ও গাথা এই ভূখণ্ডে রচিত হইয়াছে, তাহার অবধি নাই। পুরুষতন্ত্র এমন নিপুণ ভাবে তাহার বহুস্তর শিকড় বিছাইয়াছে যে, বহু মানুুষের নিকট, এমনকি বহু নারীর নিকটও ইহা স্বতঃসিদ্ধ বলিয়াই প্রতিভাত হয়। অসংখ্য দেবীকে পূজা করিবার প্রথা ও অভ্যাস সত্ত্বেও দেশের এই মনোবৃত্তি ক্ষয় পায় না। এই পরিবেশে, রাহুল গাঁধী, যিনি নিজের দুর্বল ভাবমূর্তি কাটাইয়া প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসাবে উঠিয়া আসিয়াছেন ও এত দিন মোদীর বিরুদ্ধে কথা বলিতে গিয়া সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করেন নাই, এই বার তাঁহার লিঙ্গবৈষম্য-সমর্থনকারী মনোভাবটির পরিচয়, সম্ভবত কিছুটা অচেতন ভাবেই দিয়া ফেলিলেন। ইহা দুর্ভাগ্যজনক।

লক্ষণীয়, কিছু দিনের মধ্যেই ‘মণিকর্ণিকা’ ছবিটি মুক্তি পাইবে, ঝাঁসির রানির অসামান্য পরাক্রম ও পর্দায় তাহার উপস্থাপনা লইয়া দেশ সরগরম হইবে। কিন্তু সম্মুখে যে উজ্জ্বল উদাহরণের সমাবেশই থাকুক না কেন, রাহুলের আত্মীয়া এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হইয়া যত প্রবল প্রতাপে দেশ চালাইয়া থাকুন না কেন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মনোভাব কিছুতেই যথাযথ শিক্ষায় ধৌত হইতেছে না। রাহুলের আচরণে তথাকথিত পৌরুষের আস্ফালন নাই, ছাতির মাপ লইয়া গর্ব করিবার কুরুচি নাই। তথাপি দেখা যাইতেছে, পুংতন্ত্রের মৌল ধারণা তাঁহার মধ্যে প্রোথিত। তীব্র ও প্রকাশ্য নারীবিদ্বেষের সহিত তবু লড়াই সহজ, কারণ তাহা চিহ্নিত করা অনায়াস ও তাহার অন্তর্নিহিত অশিক্ষাও প্রকট। কিন্তু শীলিত মানুষের কথাবার্তার মধ্যে লুক্কায়িত সূক্ষ্ম নারী-অশ্রদ্ধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম কঠিন। কারণ তাহা চিনিতে পারাই দুরূহ, তাহার পর তো শুদ্ধির প্রয়াস। এই সমস্যার মোকাবিলায় নারীবাদীদের ও প্রকৃত সচেতন মানুষকে নিরন্তর সংগ্রাম তো করিতে হইবেই, অধিক দায়িত্বের সহিত করিতে হইবে রাহুলকে স্বয়ং। নিজের নিকট তাঁহাকে কৈফিয়ত চাহিতে হইবে। এবং তাহা করিতে গিয়া পুরুষতন্ত্রের ‘ইহা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নহে’ নামক অজুহাতের আড়ালে লুকাইলে চলিবে না।

যৎকিঞ্চিৎ

এক ধনকুবেরের বিবাহবিচ্ছেদ হবে, বিচ্ছিন্না স্ত্রী খোরপোশ পাবেন চার লক্ষ কোটি টাকারও বেশি! খোরপোশ হিসাবে ধনীরা কেউ স্ত্রীকে দিয়েছেন ৭০ কোটি টাকা, কেউ ৮০। দুর্জনে বলবে: বড়লোক পুরুষকে বিয়ের মজা প্রবল, ডিভোর্সের মজা প্রবলতর— দাম্পত্যও পুরনো হয়ে এসেছে, প্রকাণ্ড পয়সা নিয়ে এ বার নতুন জীবন শুরু। কুরসিক কূট প্রতিপ্রশ্ন তুলবে: এই ধনী ও বিচ্ছিন্না নারীর সঙ্গে যে পুরুষের সম্পর্ক হবে, সে বিচ্ছেদোত্তর খোরপোশের অঙ্কটা সারা ক্ষণ কষছে না তো!