কনকদুর্গা ও বিন্দুকে অভিনন্দন! তাঁরা পুলিশ প্রহরায় শবরীমালার মন্দিরে ঢুকেছেন বলে নয়, বরং আয়াপ্পার পুজোর মন্ত্রটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বলে। ‘সচ্চিদানন্দ স্বরূপিনে শরণম্ আয়াপ্পা!’ যিনি সৎ-চিৎ-আনন্দ মানে ব্রহ্মস্বরূপ, ঋতুযোগ্য মেয়েরা মন্দিরে এলে তাঁর কী আসে যায়! গত নভেম্বরে শবরীমালা ‘কাভার’ করতে গিয়ে আয়াপ্পাকে নিয়ে ১০৮ পঙ্‌ক্তির এই মন্ত্রটি জেনেছিলাম। মেয়েদের উদ্দেশে সেখানে আজেবাজে কথা নেই। উল্টে ১০৫ নম্বর পঙ্‌ক্তিতেই সচ্চিদানন্দের কথা! 

বিন্দুরা ঢোকার পর শবরীমালার প্রধান পুরোহিত মন্দিরের শুদ্ধিকরণ করেছিলেন। শবরীমালা যে ‘ত্রিবাঙ্কুর দেবস্বম বোর্ড’-এর আওতায়, তাঁরা প্রত্যাশিত ভাবেই সেই পুরোহিতের থেকে জবাবদিহি চেয়েছেন। পুরোহিত বিনা অনুমতিতে এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকলে, তা অবশ্যই আশ্চর্যের। কিন্তু তার থেকেও আশ্চর্য, জনসমাজের প্রতিক্রিয়া। প্রগতিশীল ও সেকুলাররা সাংবিধানিক অধিকার বজায় রাখার জন্য, নারী-পুরুষ অসাম্যের প্রাচীর ভেঙে দেওয়ার জন্য বিন্দুদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আর হিন্দুত্ববাদীরা বিজয়ন ও সিপিএম নিপাত যাক, ইত্যাদি টুইট করে যাচ্ছেন।

এর দায় প্রগতিশীল ও সেকুলারদেরও নিতে হবে। ধর্মকে সাংবিধানিক ন্যায়বোধ, নারী-পুরুষ সমানাধিকার ইত্যাদি দিয়ে বিচার করতে গেলে বিপক্ষ এ সব উল্টোপাল্টা বকবেই। বঙ্কিমচন্দ্র অনেক দিন আগেই লিখেছিলেন, ‘‘ঈশ্বরোক্ত ধর্ম যে কেবল একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থার পক্ষেই ধর্ম, সমাজের অবস্থান্তরে তারা আর খাটিবে না, এ জন্য সমাজকে পূর্বাবস্থায় রাখিতে হইবে, ইহা কখনও ঈশ্বরাভিপ্রায়সঙ্গত হইতে পারে না। কালক্রমে সামাজিক পরিবর্তনানুসারে ঈশ্বরোক্তির সামাজিক জ্ঞানোপযোগিনী ব্যাখ্যা প্রয়োজনীয়।’’ বঙ্কিম তাঁর গীতাভাষ্যে বা ধর্মতত্ত্ব প্রবন্ধে এই নতুন সামাজিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সেই ধর্মজ্ঞান নেই। ফলে ক্রিকেট পিচে হাডুডু খেলি। ধর্মকে আদালত, সাংবিধানিক সমানাধিকার, উন্নয়নের প্রতর্কে ব্যাখ্যা করি। আর সেই ছিদ্রেই কালসাপ ঢোকে। সব কিছু গুলিয়ে গণেশের শুঁড়ে প্লাস্টিক সার্জারি খোঁজার চেষ্টা হয়। শবরীমালা সেই অভ্যাস থেকে বেরোনোর একটা সুযোগ এনে দিয়েছে, ধর্মকে আজও ধর্মের দৃষ্টিতেই ব্যাখ্যা করা যায়!

বস্তুত শবরীমালার নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী আয়াপ্পাই যে সকলের ঊর্ধ্বে, এটা কে ঠিক করল? ‘স্বামিয়ে শরণম্ আয়াপ্পা’র ওই ১০৮ মন্ত্রে কখনও ব্রহ্মচর্যের জয়গাথা গাওয়া হয়নি। উল্টে বলা হয়েছে, ‘‘আচানকোভিল আর্ষায় শরণম্ আয়াপ্পা।’’ আচানকোভিলও আয়াপ্পা-মন্দির, সেখানে দেবতা পূর্ণা ও পুষ্কলা দুই স্ত্রীকে নিয়ে বিরাজিত। পঞ্চাশের দশকে তৈরি হওয়া আধুনিক মন্দিরটি যতই মেয়েদের সরিয়ে রাখার কথা বলুক না কেন, মন্ত্রে সে রকম নেই!  উল্টে ৫৩ নম্বর পঙ্‌ক্তিতে বলা হচ্ছে, ‘‘করুণা সমুদ্রমে শরণম্ আয়াপ্পা।’’ নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারীর করুণা যে শুধু পুরুষের ওপর বর্ষিত হবে, এমন লাইন নেই। বিন্দুরা ঢোকার পর যাঁরা পাথর ছোড়াছুড়ি করে উন্মত্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন, তাঁরা ওই মন্ত্রের আর একটা লাইন জেনে রাখতে পারেন: ভক্তজনরক্ষণে শরণম্ আয়াপ্পা! 

আয়াপ্পা লোকদেবতা। কেরলে আচানকোভিল বা আরিয়ানকাভুর জঙ্গলে আয়াপ্পা মন্দিরগুলিতে স্থানীয়রাই যান। পঞ্চাশের দশকে, নতুন মন্দির তৈরির পর কেরল থেকে তামিলনাড়ু, অন্ধ্র থেকে মহারাষ্ট্র অবধি ‘আয়াপ্পা-জ্যোতি’ নামে এক মশাল নিয়ে পদযাত্রাই শবরীমালাকে লৌকিক দেবতার থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরে রূপান্তরিত করে।

নতুন গুরুত্ব নানা ভাবে। একমাত্র শবরীমালার আয়াপ্পা মন্দিরেই প্রধান পুরোহিত কন্নড় ব্রাহ্মণ। অন্যান্য আয়াপ্পা মন্দিরে এই নিয়ম নেই। পুরোহিত কেরল বা তামিলনাড়ুর লোকও হতে পারেন। ১৯৫০ সালের আগে শবরীমালার আয়াপ্পা দর্শনে সবাই শুভ্র বস্ত্রে যেতেন। এখন মুখ্যত কালো।

এই কালো হল কাপালিকদের পোশাক। স্থানীয় মত, ১৯৫০ সালে মন্দিরটি তন্ত্রমতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেই কারণেই মেয়েদের ঢোকা বারণ হয়।

কিন্তু এ যুক্তিও ধোপে টেকে না। তন্ত্রমতে মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকলেও সেখানে আগুনে ঘি আর নারকেল অর্পণ করতে হয়। এটি বৈদিক রীতি। শবরীমালা সংক্রান্ত পুরাণে অবশ্য দুই নারীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম জন রামায়ণের বৃদ্ধা তপস্বিনী শবরী। তিনি রামচন্দ্রের অপেক্ষায় রোজ ফলমূল নিয়ে আসতেন, পরে রামচন্দ্র এখানে এসে তাঁকে মুক্তি দেন। মুক্তি পেয়ে শবরী নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন। দ্বিতীয় জন মোহিনী নামে এক অসুর-নারী। আয়াপ্পা তাঁকে বধ করতেই সেই রাক্ষসীর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এক সুন্দরী নারী। পুরুষ নয়, বরং তপস্বিনী ও অসুরী দুই নারীই মুক্তি পেয়েছে শবরীক্ষেত্রে। আদালত ও গণতন্ত্র, সমানাধিকারের বয়ানের বদলে এই কথাগুলি বরং বলা হোক!

আর রজোযোগ্য নারী যে অশুচি, এটি লোকবিশ্বাসমাত্র। ধর্মগ্রন্থে নেই। মনু মেয়েদের সম্পর্কে ‘পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ’ বলেছিলেন, সবাই জানে। কিন্তু পুরো শ্লোকটা? মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের ২৬ নম্বর শ্লোকটি জানাচ্ছে, ‘‘প্রজনার্থং মহাভাগাঃ পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ।’’ মানে, স্ত্রীলোক সন্তান প্রসব ও পালন করে বলেই তারা গৃহের দীপ্তি। বিন্দুদের মন্দিরে ঢোকার প্রতিবাদে যাঁরা রাস্তায় ইট-পাটকেল ছুড়ছেন, তাঁদের মনুবাদী বললে স্বয়ং মনুই অসম্মানিত বোধ করবেন।

জল আর তেল একসঙ্গে মেশালে যা হয়, শবরীমালাতে সেটাই ঘটেছে। মহাভারত বলেছিল, গার্হস্থ শ্রেষ্ঠ আশ্রম। কেরলের সন্তান শঙ্করাচার্য আবার পরে সেটি ঘুরিয়ে দিলেন। বললেন যে কেউ ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য সন্ন্যাস নিতে পারে। শঙ্কর বলছেন, সন্ন্যাসীরাই অধ্যাত্মপথে সব থেকে বেশি দূর এগোতে পারবে। অন্যরা নয়। শঙ্কর নাকি বলেছেন, নারী এবং স্বর্ণ এই দুই বিঘ্ন থেকে দূরে থাকতে হবে। শবরীমালার গর্ভগৃহে পৌঁছনোর ১৮টা সিঁড়ি সোনা, রুপো, তামা ইত্যাদি অষ্টধাতুতে তৈরি। মেয়েদের ঢুকতে না দিয়ে মন্দিরচত্বরটি আধা-উপদেশ মেনেছে, পুরোটা নয়। শঙ্কর অবশ্য মেয়েদের মুখ দেখব না, এমন প্রতিজ্ঞা করেননি। লোকগাথা বলে, তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয়াভারতীর সঙ্গেও তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। নারীর মুখদর্শন না করার নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য শাঙ্কর ঐতিহ্যে নেই, শবরীমালায় আছে।

এই ব্রহ্মচর্য আসলে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার অবদান। ব্রিটিশ তো ‘অপর’, তার আছে বিজ্ঞান। আর ভারতীয়ত্বে আছে ব্রহ্মচর্য। মনোবিজ্ঞানী সুধীর কক্করের নিবন্ধে পড়েছিলাম, ওই সময়েই কবিরাজি ও বিজ্ঞানের অর্ধপক্ব মিশেলে জনজীবনে তৈরি হল ব্রহ্মচর্যের ধারণা। এক ফোঁটা বীর্যপাত মানেই আট ফোঁটা রক্তপাতের সমতুল ইত্যাদি। সন্ন্যাসী থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী পুরো জনজীবন ভেসে গেল সেই আবেগে। বজায় রাখতে হবে ব্রহ্মচর্য! আজকের শবরীমালা সেই নব ঐতিহ্যের বাহক।

শবরীমালা থেকে ফিরে এক নিবন্ধে (আবাপ, ২৪ নভেম্বর) লিখেছিলাম, কোনও মহিলা মন্দিরে ঢুকতেই পারেন। কিন্তু তা রেকর্ড হিসাবেই থাকবে, জনজীবনে প্রভাব পড়বে না। আজও লিখতে লিখতে এক প্রতিবাদী বাঙালির কথা মনে পড়ল। তিনি শুধু বেন্টিঙ্ককে দিয়ে আইনবলে সহমরণ বন্ধ করেননি। শাস্ত্রবচন উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন ‘‘মৃতে ভর্ত্তরি ব্রহ্মচর্যং তদণ্বারোহণং বা।’’ বুঝিয়েছিলেন, ভর্ত্তরির পরে প্রথম পদেই ব্রহ্মচর্য। অতএব, জ্বলন্ত চিতায় সহগমন নয়, ব্রহ্মচর্যই বিধবার শ্রেষ্ঠ বিকল্প। শবরীমালা নিয়ে এমন শাস্ত্রযুক্তি শোনার অপেক্ষায় আছি। হিন্দুত্বের বাড়াবাড়ি ঠেকাতে সেটাই রাস্তা। শুধু বিন্দুদের শুকনো অভিনন্দন জানানো নয়!