কয়েক দিন আগের কথা। পুরুলিয়া শহরের একটা চায়ের দোকানে বসে। এমন সময় কানে এল, পাশের এক ভদ্রলোক অন্য জনকে শুধাচ্ছেন, ‘দাদা, জঙ্গলমহল কাকে বলে?’ ভদ্রলোক স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জবাব দিলেন, ‘আরে, জঙ্গলমহল জানো না? ওই তো মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রামের যেসব অঞ্চলে জঙ্গল রয়েছে, তা নিয়েই হল গিয়ে জঙ্গলমহল। প্রশ্নকর্তাও যেন সব বুঝে গেলেন। হাসি মুখে বললেন, ‘অঃ।’

অবাক না হয়ে পারলাম না। জঙ্গলমহলে বাস করেন অথচ তার ইতিহাস জানেন না, তা কী করে হয়? আজ জঙ্গলমহল বলে কোনও প্রদেশ বা জেলা না থাকলেও একটা সময়ে নির্দিষ্ট জেলা হিসেবেই তার অস্তিত্ব ছিল।

বাংলার পশ্চিম দিকে বিস্তীর্ণ অরণ্য অঞ্চল ছোটনাগপুরের মানভূম জুড়ে বিস্তৃত। ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বাধীনচেতা ভাব ও স্বাতন্ত্র্যরক্ষার অভিলাষ মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দিত। এঁরা ছিলেন দৃঢ়, সাহসী, ছোট ছোট এলাকায় সর্দার দ্বারা শাসিত। বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ অঞ্চলের দুর্গম পরিবেশে যে ছোট ছোট অসংখ্য স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল, এ অঞ্চল ছিল তারই প্রতিচ্ছবি।

১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে। পরে এনসাইন জন ফার্গুসনের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান হয় ১৭৬৭-এর জানুয়ারিতে। অভিযানের মেয়াদ ছিল প্রায় তেত্রিশ বছর। এর মধ্যে কোম্পানির ভেতরেও বিভিন্ন পদে যেমন রদবদল ঘটেছিল, পরিবর্তন হয়েছিল স্থানীয় সর্দারদের ক্ষেত্রেও। যদিও অভিযান বা প্রতিরোধ, কোনও ক্ষেত্রেই দাঁড়ি পড়েনি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জঙ্গল সর্দারদের আয়ত্তে আনতে পারেননি। বাধ্য হয়েই ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোটা অরণ্যকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘Regulation XVIII, 1805’ নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে। ওই আইন অনুসারে ২৩টি পরগনা নিয়ে গঠিত হয় জঙ্গলমহল জেলা। ২৩টি পরগনার মধ্যে পাঁচেট-সহ ১৫টি নেওয়া হয় বীরভূম আর তিনটি বর্ধমান থেকে। বাকি পাঁচটির মধ্যে ছিল ছাতনা, বরাভূম, মানভূম, সুপুর-অম্বিকানগর, সিমলাপাল-ভালাইডিহা। নতুন জেলার জন্য নিয়োজিত হয় প্রশাসক বা ম্যাজিস্ট্রেট। জেলার সদর দফতর ছিল বাঁকুড়া।

জঙ্গলমহল জেলা গঠনের আগে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল বেশ ঢিলেঢালা। প্রধানত পাঁচেট রাজাদের সঙ্গেই কোম্পানির রাজস্ব নিয়ে বোঝাপড়া চলত। রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি তদারকি হত বীরভূম থেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দু’টি সামরিক শিবিরও তৈরি হয়েছিল—একটি ঝালদা আর অন্যটি রঘুনাথপুরে। নতুন আইনে জঙ্গল সর্দার ও জমিদারদের হাতে পুলিশ-দারোগার ক্ষমতা ও কার্যভার দেওয়া হয়েছিল।

জেলা গঠনের কিছু দিনের মধ্যে উত্তরাধিকার প্রশ্নে ইংরেজদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে গঙ্গানারায়ণ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিদ্রোহে শামিল হয় সব জঙ্গল সর্দার। ইংরেজদের অনুগ্রহপুষ্ট বরাভূমের জমিদার তাঁর হাতে নিহত হন। জঙ্গলমহলে একটি প্রশাসনিক চৌহদ্দির মধ্যে সমস্ত জঙ্গল সর্দারেরা একত্রিত হওয়ায় ফলে গঙ্গানারায়ণের বিদ্রোহ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নিষ্ফল প্রমাণিত হয় জঙ্গলমহল জেলা গঠনের উদ্দেশ্য। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মি. ডেনট্ গঙ্গানারায়ণের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হলেও জঙ্গলমহলের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি বুঝে তা ভেঙে অন্য জেলার সঙ্গে জুড়ে পৃথক পৃথক জেলা গঠনের প্রস্তাব দেন।

তারই ফলশ্রুতিতে ১৮৩৩ সালে ‘Section V Regulation, 1833’ দ্বারা সৃষ্টি হয় মানভূম জেলার। ৩১টি জমিদারি নিয়ে গঠিত এই জেলার আয়তন ছিল ৭৮৯৬ বর্গমাইল। এর পরে ১৮৪৫ সালে সিংভূম ও ১৮৮১ সালে আইনানুগ ভাবে সৃষ্টি হয় স্বতন্ত্র বাঁকুড়া জেলার। 

১৯১১ সালে অসম ছাড়াও বিহার-ওড়িশা পৃথক প্রদেশ রূপে জন্ম নেয়। তখন মানভূম বিহার-ওড়িশা প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হলেও ১৯৩৬ সালে বিহার-ওড়িশা প্রদেশ ভেঙে গেলে মানভূম বিহারের সঙ্গে যুক্ত হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পরে ১৯৫৬ সালে মানভূম থেকে জন্ম হয় পুরুলিয়া জেলার। বাংলার মানচিত্রে মানভূমের অস্তিত্ব ছিল প্রায় ৭৮ বছর। বিহারের মানচিত্রে তা ছিল ৪৪ বছর। ১৯৫৬ সালের পরে বাংলা ও বিহারের যে মানচিত্র আঁকা হল, তাতে মানভূমের আর কোনও অস্তিত্ব রইল না। 

তদানীন্তন অরুণবন বা জঙ্গলমহলের আজ শুধু নামেই নয়, চেহারাতেও বিলুপ্তি ঘটেছে। সবুজের পরিমাণ কমে শুধু টাঁড়, ভাঙা জমি। জঙ্গল গুটিয়ে পুরুলিয়ার অযোধ্যা, বাঁকুড়ার রানিবাঁধ-ঝিলিমিলি, সারেঙ্গা, তালড্যাংরা-বিক্রমপুর, শালবনি ছাড়া ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুরের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বারবার আলাপ-আলোচনায় যে জঙ্গলমহলের প্রসঙ্গ উঠে আসে, তা কোন এলাকা। তা কি কোনও জেলা বা প্রদেশ? জঙ্গলমহলের এখন আর পৃথক অস্তিত্ব নেই। বিভিন্ন জেলার মধ্যেই তার অংশ ছড়িয়ে। মানভূমকে জড়িয়ে বাংলা ও বিহারের যে সমন্বয় ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, তাকে বাদ দিয়ে পুরুলিয়া জেলার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অসম্পূর্ণ থেকে যায় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সীমান্ত এলাকার ইতিহাসও। সেই ইতিহাসের সাক্ষী এক সময়ের জেলা জঙ্গলমহলও।

লেখক আদ্রার সাহিত্যকর্মী