Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

প্রেমেন্দ্র মিত্রের স্কুলশিক্ষা হয়েছিল নলহাটিতে

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০১:০৮
 নলহাটি হরিপ্রসাদ হাইস্কুলে (অতীতে এম.ই স্কুল) পড়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ছবি: সব্যসাচী ইসলাম

নলহাটি হরিপ্রসাদ হাইস্কুলে (অতীতে এম.ই স্কুল) পড়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ছবি: সব্যসাচী ইসলাম

স্মৃতি কবি, কথাশিল্পী প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাল্যকাল যে স্বচ্ছন্দ ও স্বস্তিময় ছিল না, সে কথা অনেকেরই জানা। বছর সাতেক বয়স হতে না হতেই, মা ও মাতামহের উপর্যুপরি মৃত্যুতে জীবনের শুরুতেই আঁধার নেমে এসেছিল। সে সব কথা তাঁর জীবনকাহিনি সূত্রেই জানা যায়। কিন্তু, অনেকেরই অজানা যে, বীরভূমের নলহাটিই হয়ে উঠেছিল বালক-কবির আপাত-স্বস্তি তথা সুস্থিতির আবাসভূমি। এখানেই পিতার সাহচর্য-বঞ্চিত, মাতৃহীন প্রেমেন্দ্র, মাতামহের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে অভিভাবক রূপে পেয়েছিলেন। প্রতিভাধর কবির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনাও সম্ভব হয়েছিল সেই আত্মীয়েরই বদান্যতায়, এই লালমাটির জনপদে।

পুরাণকথা আর ইতিহাসগাথার গরিমা নিয়ে অপরূপ নিসর্গ-প্রকৃতির নলহাটি। দূরের বাঙালির কাছেও তখন আকর্ষণীয় স্থান ছিল। বয়ে যাওয়া ব্রহ্মাণী, টিলাপাহাড়, পাহাড়-কোলের নলাটেশ্বরী মন্দির ও উপরি ভাগের বিস্তৃত ক্ষেত্র জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীনকালের নলরাজাদের রাজপ্রাসাদ ও গড়ের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে নলহাটি তখন ইতিহাস, পুরাণ-প্রকৃতির এক ‘মিস্টিক’ মিলনক্ষেত্র। ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারে বাতাস পাল্টাতে শহরাঞ্চলের অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালি তখন মনোরম ও স্বাস্থ্যকর এই জায়গায় সাময়িক ভাবে থাকতে আসতেন।

তবে, যে আত্মীয়, বালক প্রেমেন্দ্র মিত্রের থাকা ও পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তিনি বহিরাগত হলেও নলহাটিতে বাস করতেন কর্মসূত্রে। এ নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া না গেলেও অনেকের ধারণা, রেলের চাকরি সূত্রেই সপরিবার বসবাস ছিল এখানে। সেই অভিভাবকের বদলির কারণেই প্রেমেন্দ্র মিত্রকে নলহাটির তখনকার ‘এম.ই স্কুলে’ সপ্তম শ্রেণির পড়া সাঙ্গ করে কলকাতায় চলে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে ‘সাউথ সুবারবান স্কুলে’ অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। সময়ের হিসেবে সালটি মনে হয় ১৯১৭-১৮। কারণ সাউথ সুবারবান স্কুল থেকে ১৯২০ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন। যদিও তাঁর নলহাটি ত্যাগের সমসময়ে এখানকার ‘এম.ই স্কুল’-টি, ‘হাই ইংলিশ স্কুল’ স্তরে উন্নীত হয়ে গিয়েছিল। তবু তাঁকে চলে যেতে হয়। অভিভাবকের বদলির কারণটিই তাই এক্ষেত্রে মুখ্য বলে মনে হয়। সে যাই হোক, যে কঠিন জীবন-পরিস্থিতিতে বালক প্রেমেন্দ্র মিত্রের নলহাটিতে আসা ও পড়াশোনার জন্য এখানে বেশ কয়েক’টি বছর বাস করা, তার প্রেক্ষাপটটি দেখা যাক। ১৯০৪ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্রের জন্ম হয় পিতার কর্মস্থল কাশীতে। পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন হুগলির কোন্ননগরের সম্ভ্রান্ত মিত্র বংশের সন্তান। তাঁদের আদি নিবাস অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার রাজপুরে ছিল বলে জানা যায়। পিতামহ শ্রীনাথ মিত্র সে কালের স্বনামখ্যাত শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের বন্ধু ছিলেন। রেলের ‘অ্যাকাউন্ট্যান্ট’ পদে কর্মরত ছিলেন পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ। সেই সূত্রে জীবনের অনেকটা সময় বাংলার বাইরেই কাটাতে হয় তাঁকে। শৈশবেই প্রেমেন্দ্র মিত্র মা সুহাসিনী দেবীকে হারান। স্ত্রীর মৃত্যুর পর পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ দ্বিতীয় বিবাহও করেন। মাতামহ ডাক্তার রাধারমণ ঘোষের নয়নের মণি ছিলেন প্রেমেন্দ্র।

Advertisement

তৎকালীন ‘ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলে’-র মির্জাপুর ডিভিশনে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন হিতাকাঙ্ক্ষী দাদামশাই। মা-হারা নাবালক দৌহিত্রের যথাযথ শিক্ষার্জনে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সে বিষয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর ছিল। সে কারণে অল্পবয়সী প্রেমেন্দ্রকে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি মির্জাপুরে নিজের কাছে রাখার জন্য নিয়ে চলে আসেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, উপযুক্ত শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাকে ডাক্তার হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে যায়। দৌহিত্যের আলোকিত ভবিষ্যতের সামনে প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেয় তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে। সংশয়ের মেঘ ঘনিয়ে উঠে প্রেমেন্দ্র মিত্রের শিক্ষাজীবনের সূচনাপর্বেই। জীবনের এই সংকটের সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন দাদামশাই রাধারমণ ঘোষের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়, যাঁর বসবাস ছিল বীরভূমের নলহাটিতে।

প্রতিভাবান বালকটির প্রাথমিক শিক্ষার ধারাবাহিকতায় যাতে ছেদ না পড়ে সে জন্য নলহাটিতে নিজের বাড়িতে রেখে তার পড়াশোনার সুব্যবস্থা তিনি করেন। সেই মতো এখানের নেপালচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালাতে সর্বপ্রথম প্রেমেন্দ্র মিত্রকে ভর্তি করা হয় বলে কোনও কোনও সূত্রে জানা যায়। পরবর্তীতে সে সময়ে ‘ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড’ অনুমোদিত নলহাটির একমাত্র এম.ই স্কুলটিতে তিনি ভর্তি হন। এই বিদ্যালয়েই এখনকার হিসেব অনুযায়ী সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। নলহাটিতে তখন আধুনিক শিক্ষাচর্চার পরিমণ্ডলও গড়ে উঠেছিল। বালক প্রেমেন্দ্রকে এখানে রেখে পড়াশোনা করানোর সেটিও অন্যতম কারণ হতে পারে। বিশ শতকের সেই সূচনালগ্নে নলহাটিতে একটি টোল, একটি মক্তব, দশটি পাঠশালা ও একটি ‘এম.ই স্কুল’ থাকার কথা সরকারি নথি সূত্রে পাওয়া যায়। নসিপুরের মহারাজা ভূপেন্দ্র নারায়ণ প্রতিষ্ঠিত, সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ‘মিডল ইংলিশ স্কুল’টি প্রথম দিকে চলতো রাজাদের কাছারিবাড়ির পিছনের দু-কামরা মাটির বাড়িতে। ১৯১২ সালে রাস্তার অপর প্রান্তে নিজস্ব জায়গায় এই বিদ্যালয় স্থানান্তরিত হয়। সময়ের হিসেবে এই সময়কালকেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘এম.ই স্কুলে’ পঠন-পাঠনের কাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। শিক্ষাস্তরের শ্রেণিভিত্তিক বিভাজন অনুসারে তখন ‘মিডল স্কুলে’ তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি, এবং বর্ধিত ভাবে এখনকার সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হতো। এই স্কুলটির প্রথম দিকের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ সিংহ। পরে সেই পদের দায়িত্ব পান ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। এটিই ১৯১৭ সালে ৩ রা ফেব্রুয়ারি ‘হাই ইংলিশ স্কুলে’ উন্নীত হয়। কালক্রমে সেই শিক্ষায়তন এখনকার ‘নলহাটি হরিপ্রসাদ হাইস্কুল’ নামে পরিচিত হয়েছে।

কালস্রোতে একশো বছরেরও বেশি আগের সে সময়ের অনেক তথ্যই আজ হারিয়ে গিয়েছে। যে আত্মীয়ের পরিবারে প্রেমেন্দ্র মিত্র কৈশোরের শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেন, তাঁরা নলহাটির স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়ায় তেমন নির্ভরযোগ্য সূত্রও পাওয়া যায় না। শুধু সময় কালের নিরিখে বিস্তারিত ভাবে না হলেও প্রয়োজনীয় কিছু তথ্যের বিষয়ে আলোকপাত করা সম্ভব হয়। অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরে ১৯২০ সালের যে কাললগ্নে প্রেমেন্দ্র মিত্র কলকাতার ‘সাউথ সুবারবান স্কুল’ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন, ঠিক সেই বছরটিতে নলহাটির হাইস্কুলে উন্নীত বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্ররাও ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বসেছিল। প্রথম বছরের ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করা অন্তত দু’জন ছাত্রের পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন সূত্রে। একজন শশাঙ্কশেখর সিংহ, অপরজন গৌরীশঙ্কর রায়।

একই সালের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার্থী হওয়ায় আমরা নিশ্চিত হতে পারি, ‘এম.ই স্কুলে’ এঁরা প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহপাঠী ছিলেন। ওই সময় কালে কর্মরত শিক্ষক ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ধরণীধর মুখোপাধ্যায় প্রমুখেরা ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের নলহাটির বিদ্যালয় শিক্ষাজীবনের শিক্ষাগুরু। নলহাটিতে এসে তাঁর শিক্ষারম্ভের কালটিকে নিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করা না গেলেও ১৯১৭ সাল পর্যন্ত যে তিনি এখানের ‘এম.ই স্কুলে’ পড়েছিলেন সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। পাঠশালাতে কিছু কাল এবং তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত বছর ছয়-সাতের ব্যাপ্তি ছিল তাঁর এখানের বাল্যশিক্ষা জীবনের।

শৈশবেই মা ও প্রিয় দাদামশাইকে অকালে হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়ে প্রতিভাবান যে বালকটি বীরভূমের নলহাটির নিসর্গপ্রকৃতির আবহে বেড়ে উঠেছিল, ভবিষ্যৎ জীবনে কবি-সাহিত্যিক হয়ে ওঠার প্রেরণা-রসদ এই লালমাটির আকাশ বাতাস তাকে জুগিয়েছিল কি না আমরা বলতে পারি না। তবে, বাল্যের এই শিক্ষা জীবনকাল যে তার মননের ভিত্তিভূমি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কালপর্ব ছিল, তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

(লেখক কয়থা হাইস্কুলের শিক্ষক, মতামত নিজস্ব)

আরও পড়ুন

Advertisement