বাংলাদেশে পৌঁছলে এমনিই বিদেশ বলে মনে হয় না। তবুও প্রথম বার ঢাকায় নেমে যেটুকু অপরিচিত ঠেকে তা কেটে যায় বুড়িগঙ্গা নদী পার হতে গিয়ে। যেন অবিকল কলকাতার আদিগঙ্গা। ময়লা কালো জল, প্লাস্টিক ও জমে থাকা আবর্জনার স্তূপ, প্রতি মুহূর্তে মিশছে কলকারখানার বর্জ্য; নাকে আপনাআপনি রুমাল চলে যাবে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর বাসস্থান পাশে থাকলেও কলকাতার আদিগঙ্গাও এতটাই দূষিত যে, রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি ‘মৃত’ নদী। নদী তো নয়, কার্যত নর্দমা। সমীক্ষা বলছে, মূল গঙ্গা নদীতে বিভিন্ন উৎস থেকে যে দূষিত জল প্রতি দিন জমা হয়, তার একটা বড় অংশ যায় এই আদিগঙ্গা থেকেই। শুধু কি ময়লা জল? জবরদখল, খাটাল, অজস্র ঝুপড়ি, ছোটবড় কারখানা— কী নেই! এমনকি দেশের জাতীয় নদীর প্রাচীনতম ধারার বেশ কয়েক কিলোমিটার লম্বা অংশ স্রেফ ছিনতাই হয়ে কোথাও রাস্তা, কোথাও সিনেমা হল, কোথাও বা ‘অমুকের গঙ্গা’, ‘তমুকের গঙ্গা’ ইত্যাদি নামে ব্যক্তিগত পুকুরে রূপান্তরিত! 

আদিগঙ্গা বা বুড়িগঙ্গা এই উপমহাদেশে ব্যতিক্রম নয়। এক দিকে আমরা প্রায় সব নদীকেই ভগবান জ্ঞানে পুজো করি, অন্য দিকে তাকে যথেচ্ছ দূষিত করতে আমাদের হাত কাঁপে না। মাটির তলার জল প্রায় শেষ, যমুনা দিল্লির প্রায় শেষ ভরসা, তবু তা এখন দেশের অন্যতম দূষিত নদী, যাবতীয় আবর্জনা ফেলার ঠিকানা। করাচির লায়ারি নদী দিয়ে বিপুল দূষিত জল আরব সাগরে মিশছে। বাগমতির তীরে পশুপতিনাথের মন্দিরে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষ দৌড়ে আসছেন, অথচ সেই নদীর জলে মৃতদেহ ডোবানো হচ্ছে, চলছে অন্যান্য দূষণ। 

বস্তুত, নানা বিষয়ে বিরোধ বা মতভেদ থাকলেও শহরগুলির মধ্য দিয়ে বহমান নদীগুলির রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে গোটা উপমহাদেশ প্রায় সমান উদাসীন। অথচ গোটা অঞ্চলটার সভ্যতাই মূলত নদীকেন্দ্রিক। এবং মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, শুধুমাত্র ওপরে বলা তথাকথিত বড় বড় শহরগুলির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীই নয়, মাঝারি বা ছোট শহরগুলির গা-ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীগুলির অবস্থাও তথৈবচ। পরিবেশ সংগঠন সবুজ মঞ্চের এক সমীক্ষা বলছে, সারা রাজ্যে একশোর কাছাকাছি নদী হয় ইতিমধ্যেই ইতিহাস হয়ে গিয়েছে, বা হওয়ার দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। এ কথা জানতে বিজ্ঞানী হতে হয় না, যে নদীগুলি শহরের সম্পদ তাদের যদি ক্রমেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় তবে তা আজ নয়তো কাল শহরগুলির সর্বনাশ ডেকে আনবে। পানীয় জলের সঙ্কট হবে, শহরের সার্বিক পরিবেশ গোল্লায় যাবে, বৃষ্টির জমা জল বেরোনো আটকে যাওয়ার ফলে নিয়মিত ভাসবে শহরের বড় অংশ, জমা জলে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গির রমরমা বাড়বে, ইত্যাদি। যেমন হচ্ছে উপমহাদেশ জুড়ে। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা প্রায় সাত দশক আগে আপশোস করেছিলেন যে নদীমাতৃক ভারতে নদী নিয়ে সরকারের বিশেষ হেলদোল নেই। এখন নদী নিয়ে নানা মন্ত্রক আছে, নানা পরিকল্পনা হয়, কিন্তু— হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরেও— পরিস্থিতি ভয়াবহ। 

এর কারণগুলো চেনা। শহরগুলির অধিকাংশই যেমন খুশি তেমন ভাবে বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই শহরে যথেষ্ট ময়লা ফেলার সুব্যবস্থা না থাকায় বাড়তি আবর্জনা ও ময়লা জল এসে পড়ে নদীতে। নদীগুলির হয়ে কেউ বলার নেই, তাই ইচ্ছামতো জবরদখল এখানে স্বাভাবিক ঘটনা। সবচেয়ে বড় কথা, প্রায় কোথাও নদীগুলিকে রক্ষা করার কোনও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। আসলে সেই সদিচ্ছা থাকলে তো শহরের একমাত্র মালিকানা না থাকা ‘আরবান স্পেস’কে ইচ্ছামতো (অপ)ব্যবহার করা যাবে না! অতএব যমুনার তীরে ধর্মীয় গুরুকে যা খুশি করতে দেওয়া হয়, বা আদিগঙ্গা বাঁচাতে সরকার প্রায় এক দশক ধরে আদালতের কাছে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও তা প্রতিশ্রুতিই রয়ে যায়। 

বাকি পৃথিবীতে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলির শহরে কিন্তু উল্টো পুরাণ। লন্ডনের টেমস, বার্লিনের স্প্রি, প্যারিসের সিন, নিউ ইয়র্কের হাডসন বা কোলনের রাইন নদীর কাছে দাঁড়ালে বা পাশ দিয়ে হাঁটলে মনে হবে শহরগুলো বেঁচে আছে ওই সব অঞ্চলেই! এদের মধ্যে অনেক নদীই এক সময় বেশ দূষিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশক থেকে, দূষণকে অনেকটাই বিদায় জানানো গিয়েছে। টেমসে বহু দিন পর স্যামন মাছ ফিরে এসেছে, স্প্রি বা রাইন ঝকঝক করছে; নদীগুলিকে কেন্দ্র করে শহরগুলির অর্থনীতি শিরা ফোলাচ্ছে। যে কোনও আধুনিক শহরের অন্যতম সেরা ‘আরবান স্পেস’ হল শহরের মধ্য দিয়ে চলা নদীগুলির আশপাশের অঞ্চল, ঠিক যাকে আমরা, এই উপমহাদেশে, ইচ্ছামতো সবাই মিলে নষ্ট করছি। বলা বাহুল্য, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা আর শহরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া ইউরোপ বা আমেরিকার নদীগুলিকে দূষণমুক্ত করা সম্ভব ছিল না। শোনা যায় স্প্রি নদীকে দূষণমুক্ত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন প্রায় একশো বছর আগে নদীতে সাঁতার কাটা নিষিদ্ধ করেছিল; অন্যান্য বড় নদীর দূষণমুক্তির পিছনেও এ রকম নানা গল্প আছে। কিন্তু এই উপমহাদেশে সে-সব রূপকথার মতোই শোনায়।