মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের তুলনাটা একটু কাঁচাই হয়ে গেল। যে কারণে বিজেপি ‘রে রে’ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাহুল গাঁধীর ওপর, সে কারণে একেবারেই নয়। কোন গোষ্ঠী সন্ত্রাসবাদী, আর কোন দল জাতীয়তাবাদী, তার কি আর স্কেল-দাঁড়িপাল্লা হয়? কে কখন ক্ষমতায়, সেটাই ঠিক করে দেয় তার, অথবা বিপরীত দিকে থাকা দলের পরিচয়। এই যেমন, আজকের ঘোর ‘জাতীয়তাবাদী’ আরএসএস-ও এ দেশে এক কালে নিষিদ্ধ হয়েছিল। উল্টো দিকে, মিশরে চরমবাদী দল বলে পরিচিত মুসলিম ব্রাদারহুড থেকেও প্রেসিডেন্ট হন মহম্মদ মুর্সি। কাজেই, দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এক কালে আরএসএস সদস্য ছিলেন বলে সেই দলের সঙ্গে বিরোধী নেতা ‘সন্ত্রাসবাদী’ দলের সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন না, এটা বলা মুশকিল।

তা হলে, রাহুল কাঁচা কাজটা করলেন কোথায়? এইখানে যে, একটা খুচরো মন্তব্যে এমন একটা জটিল বিষয় নিয়ে টানাটানি করতে নেই। তা হলে, প্রশ্নটা বেহাত হয়ে যাওয়া ছাড়া কাজের কাজ আর কিছু হয় না। যদি খুলে বলার অবকাশই না থাকে, তা হলে বোঝাবেন কী করে যে কোথায় এসে মিলে যেতে থাকে আরএসএস আর মুসলিম ব্রাদারহুড? বলবেন কী করে যে সন্ত্রাসবাদটা আসলে প্রশ্নই নয়, মূল কথা হল রাজনীতির পরিসরে ধর্মের ঢুকে পড়ায় জরুরি বিষয়গুলো ধামাচাপা পড়ে যাওয়া?

শুধু রামমন্দির আর গোরক্ষকের আয়নায় সঙ্ঘ পরিবারকে দেখলে খণ্ডদর্শন হবে। শুধু বিজেপির রাজনীতি দিয়েও ধরা যাবে না তাকে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ যেমন রয়েছে তার ছত্রচ্ছায়ায়, গৌ সম্বর্ধন যেমন রয়েছে, তেমনই আছে বিদ্যা ভারতী, মজদুর সঙ্ঘ বা বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, এমনকি মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ। আরএসএস-এর স্বয়ংসেবকরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, এমন ছত্রিশটা সংগঠনের একটা তালিকা রয়েছে ২০১৫ সালে প্রকাশিত নরেন্দ্র ঠাকুর ও বিজয় ক্রান্তি সম্পাদিত অ্যাবাউট আরএসএস বইটিতে। রাহুল গাঁধী কি সেই তালিকায় চোখ বুলিয়েছেন কখনও? মজদুর সঙ্ঘের কর্মসূচিতে হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণের ডাকের চেয়ে ঢের বেশি শুনতে পাবেন শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি। স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ ক্ষণে ক্ষণেই হুঙ্কার দেয় বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে। রামমন্দিরের জুজুতে চোখ আটকে থাকায় উদারবাদীরা দেখতেই পাননি, কী ভাবে বিদ্যা ভারতী হয়ে উঠেছে দেশের সব চেয়ে বড় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক। আরএসএস কেন বিপজ্জনক, তার কারণ খুঁজতে গেলে এই দিকগুলোয় নজর দিতে হবে। বুঝতে হবে, কী ভাবে হরেক সংগঠনের সূত্র ধরে গত তিন দশকে ভারতীয় সমাজের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে আরএসএস।

কিন্তু, তার সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের যোগ কী? সদ্যপ্রয়াত অর্থনীতিবিদ সামির আমিন বছর এগারো আগে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে। আলোচনা করেছিলেন, ইসলামের প্রশ্নটি কেন শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রশ্ন নয়— কী ভাবে সেই সাংস্কৃতিক ভিন্নতার মোড়কে চাপা পড়ে যায় অন্যান্য প্রশ্ন; কী ভাবে রাজনৈতিক ইসলাম ক্রমাগত সাহায্য করে চলে বড় পুঁজিকে, স্থানীয় মানুষের শ্রেণিগত প্রশ্নগুলোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেই। সামির আমিন মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ, ফলে তাঁর বিশ্লেষণ গিয়েছে শ্রেণির প্রশ্নেই। রাহুল গাঁধীর সেই দায় নেই। তিনি দেখাতে পারতেন, কী ভাবে সঙ্ঘের তৈরি করা হিন্দু/ভারতীয়-র সমীকরণে ঢাকা পড়ে যেতে থাকে অন্য প্রশ্নগুলো।

দলিত প্রশ্নেই যেমন। রাজনীতির দায়ে বিজেপি দলিতদের জন্য সংরক্ষণের পক্ষে, কিন্তু আরএসএস-এর সায় নেই তাতে। সঙ্ঘ বৃহৎ হিন্দুত্বের কথা বলে, ধর্মের পরিসরে কেউ ছোট, কেউ বড়, মানতে নারাজ তারা। গত তিন দশকে প্রচুর দলিত, আদিবাসী এসেছেন শাখায়। তাঁদের কথা সত্যি মানলে বলতেই হয়, শাখার পরিসরে তাঁদের সদস্যেরই মর্যাদা দেওয়া হয়। সত্যিই যদি তা হয়, মন্দ কী?

সমস্যা আসলে অন্যত্র। গত কয়েক বছরে শাখার সংখ্যা দিনে দ্বিগুণ বেড়েছে, রাতে চতুর্গুণ। স্বয়ংসেবকের সংখ্যাও বেড়েছে সেই হারেই। সামাজিক পরিসরে শাখার উপস্থিতি এখন আর অগ্রাহ্য করার নয়। অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের জায়গা থেকে দেখলে, দুটো সমান্তরাল দুনিয়া তাঁদের সামনে। একটা শাখার পরিসরে, অন্যটা বাইরে। শাখার ভিতরে বানানো সাম্য, আর বাইরের দুনিয়ায় বৈষম্য। শাখার সাম্যের টানে যদি আরও আরও দলিত যোগ দিতে থাকেন সঙ্ঘে— বস্তুত, যোগ দিচ্ছেনও— তাতে ভারতের বিপদ কোথায়? বিপদ বাইরের দুনিয়ায়। যেখানে অসাম্য পর্বতপ্রমাণ। শাখার ভিতরে থেকে বাইরের সেই অসাম্যের আসল প্রতিকার চাওয়ার উপায় নেই। সংরক্ষণের দাবি করার উপায় নেই, দলিতদের জন্য আরও জায়গা খুলে দেওয়ার দাবি করার উপায় নেই— কারণ, সঙ্ঘের যুক্তি মানলে তো বৃহৎ হিন্দুরাষ্ট্রে আর হিন্দুদের মধ্যে বিভাজন মানা যায় না। বিপদ এখানে। অভিন্ন হিন্দুত্বের গল্পে দলিতদের ন্যায্য দাবিকে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়ায়। ঠিক যেমন মুসলিম ব্রাদারহুডের ইসলামিক সংস্কৃতির আখ্যানে ঢাকা পড়ে যায় যাবতীয় শ্রেণিবিভাজন, আর সেই ফাঁক গলে জিততে থাকে বড়, আন্তর্জাতিক পুঁজি। সাধে কি আর জিগ্নেশ মেবাণী সঙ্ঘের চক্ষুশূল?

সত্তর বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র যেখানে ফাঁক রেখে গিয়েছে, সেখানেই ঢুকেছে আরএসএস। প্রত্যন্ত এলাকায় আদিবাসী ছেলেমেয়েদের জন্য একল বিদ্যালয় চালায় সঙ্ঘ। সে রকম বহু স্কুলেই এক জন শিক্ষক— সেটুকুরও ব্যবস্থা রাষ্ট্র করে উঠতে পারেনি অনেক জায়গাতেই। দেশ জুড়ে একল বিদ্যালয়ে ছাত্রের সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ। আবার, বিদ্যা ভারতীর নেটওয়ার্কে ২০১৬ সালেই স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৩,০০০। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩২ লক্ষের বেশি। ছোট শহরে, অথবা বড় শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কাছে সরকারি স্কুলের উন্নততর বিকল্প হয়েছে এই বিদ্যা ভারতী। তার পাঠ্যক্রম তৈরি হয় সঙ্ঘের মতাদর্শ মেনে। রাষ্ট্র যাদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার যথেষ্ট ব্যবস্থা করতে পারেনি, সঙ্ঘ তাদের হিন্দু জাতীয়তার পাঠ দিয়েছে। ঠিক যেমন মুসলিম ব্রাদারহুডের শিক্ষাপ্রকল্প শেখায় ইসলামি মূল্যবোধ আর সমাজদর্শন। বিপদ এখানেও।

তার চেয়েও ব়ড় বিপদ হল, সামাজিক পরিসরে এই উপস্থিতি ক্রমশ বাড়াতে থাকে আরএসএস-এর গ্রহণযোগ্যতা। আর, তার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে বাড়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের গ্রহণযোগ্যতাও। রাহুল গাঁধী ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখতে পারতেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের সামাজিক কার্যক্রম যে আসলে তার মৌলবাদী রাজনীতি প্রসারের চাল মাত্র, এই নিয়ে কী বিপুল আলোচনা রয়েছে। গ্রহণযোগ্যতা বাড়াই তো স্বাভাবিক। যে দল কাজে-অকাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, যারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখায়, আদিবাসী গ্রামের কোনও হতদরিদ্র বৃদ্ধ মারা গেলে বাড়িতে পৌঁছে দেয় অন্তিম সংস্কারের সব উপকরণ, পুরোহিত— তাদের দাবিকে সমর্থন করাই যায়। অতএব, বিদ্যা ভারতীর ছাত্রীর পরিবারের কাছে কুটুম্ব প্রবোধনেরও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে— তারা শিখিয়ে দেয়, আদর্শ ভারতীয় পরিবার ঠিক কেমন হওয়া উচিত। মজদুর সঙ্ঘের সদস্যরা প্রশ্নই করতে পারেন না, শ্রেণি শোষণের কথা যদি দল স্বীকার না করে, তা হলে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেই বা শ্রমিকের লাভ কী?

তুলনা যদি করতেই হয়, এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে করা ভাল। আরএসএস কী ভাবে বহু রূপে সম্মুখে এসে আসল প্রশ্নগুলোকে লুকিয়ে ফেলতে পারে— মুসলিম ব্রাদারহুডও যেমন পারত— আর তাতে রাজনীতির চেয়েও বড় ক্ষতি গরিবগুর্বো ভারতীয়দের, ধর্মনির্বিশেষে, এই কথাটা স্পষ্ট করে জানানো দরকার ছিল। আরএসএস যে আসলে হিন্দুদেরও স্বার্থরক্ষা করছে না, রাহুল এই কথাটা বললে পারতেন।