• bryan
  • ব্রায়ান এ হ্যাচার
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

তিনি আক্রমণের লক্ষ্য, কেননা তাঁর মেধা গভীর, প্রত্যয় অনমনীয়

যে দিকে ঢিল ছুড়ছে সবাই

vidyasagar
  • bryan

Advertisement

বেচারি বিদ্যাসাগর, ফের আক্রমণের লক্ষ্য হলেন। দু’পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আঘাত তাঁরই উপর আছড়ে পড়ল। তাঁর জীবদ্দশায় যে এমন ঘটেনি, তা তো নয়। ভাল করলে মন্দ হয়, এ তিনি ভালই জানতেন। যাঁরা তাঁর নিন্দেমন্দ করতেন, বিদ্যাসাগর তাঁদের সকৌতুকে জিজ্ঞাসা করতেন, কী উপকার তিনি করেছিলেন যে এত বিদ্বেষ তাঁর প্রতি? এমন আর এক জন মানুষেরও দৃষ্টান্ত মেলে না, জনকল্যাণে নিবেদিত হওয়ার জন্য যিনি এত প্রশংসা পেয়েছিলেন, আবার যাঁর এত দুর্নামও করা হয়েছে। আজও তা-ই ঘটছে। প্রথমে তাঁকে আক্রমণ করা হল, তার পর ছুটে এলেন তাঁর রক্ষাকর্তারা। দ্বিতীয় গোষ্ঠীর কিছু লোক প্রথম গোষ্ঠীতেও ছিলেন। একটা মানুষ আর কত সইবে?

বিদ্যাসাগর লোকটার মধ্যেই কি এমন কিছু ছিল, যার জন্য এত শোরগোল? স্বীকার করতেই হয়, এমন কিছু লোক থাকেন যাঁদের নিয়ে চলা মুশকিল। বিদ্যাসাগর যদিও অন্যের প্রতি করুণাবর্ষণ করেছেন সারা জীবন, তবু মানুষটা সেই গোত্রের। তবু, লোকটা যদি সহজে না-মচকানোর পাত্র হয়েই বা থাকেন, তাঁকে নিয়ে বার বার এত ভাঙচুর কেন? কলেজ স্কোয়ার উদ্যানে তাঁর চিত্তাকর্ষক মূর্তির মাথাটির কী দুর্দশা হয়েছিল, কারও জানতে বাকি নেই। সেই সময়ের কিছু নকশাল তাঁর মাথা দিয়ে ছয় হাঁকড়েছিল। ভাগ্য ভাল, সে মাথা খুঁজে পাওয়া যায়, ফের মূর্তিতে স্থাপিতও হয়। তার পর ২০১২ সালে এক দল উন্মত্ত লোক বিদ্যাসাগর কলেজে বেশ কয়েকটা প্রতিকৃতিকে আক্রমণ করে। যদিও, লক্ষণীয়, সে বার বিদ্যাসাগর আক্রান্ত হননি, হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল। বিদ্যাসাগরের যেমন রসবোধ ছিল, তাতে তিনি হয়তো প্রশ্ন করতেন, ওঁদের সঙ্গে তাঁকেও জুড়ে দেওয়ার মতো কী-ই বা করেছেন তিনি?

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

আর কিছু না হোক, সম্প্রতি বিদ্যাসাগর কলেজে তাঁর মূর্তির অর্থহীন ভাঙচুর অন্তত এইটুকু প্রমাণ করে যে, বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ বদলে যায় কিন্তু লক্ষ্য বদলায় না। তার কারণ কি এই যে, যে সব গোষ্ঠী বিদ্যাসাগরকে নিজের দলে টানতে চেয়েছিল, তিনি কোনও দিনই সেগুলোতে নাম লেখাননি? একটা সময়ে তিনি তাঁর নিজের গ্রাম বীরসিংহ ছেড়ে দিয়েছিলেন। নিজের ছেলের সঙ্গেও সম্পর্ক তেমন ভাল ছিল না। সমসাময়িক তরুণদের সঙ্গে যোগ দিয়ে দেশপ্রেমী সংগঠন গড়ে তোলার আহ্বান তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি জানতেন, এর ফলে আরও আঘাত আসবে। শেষ জীবনে কলকাতায় বসবাস ত্যাগ করে প্রত্যন্ত কর্মাটাঁড়ে গিয়ে কেন তিনি বাস করতেন, তার কারণ এর থেকেই বুঝে নেওয়া সম্ভব। বন্ধু ও অনুগতরা সেখানে গিয়ে তাঁর খোঁজখবর নিতেন। যত দূর জানি, তাঁকে হয়রান করার জন্য অন্তত কেউ সেই অবধি ধাওয়া করেননি।

মনে হয়, বিদ্যাসাগর যে কারণে আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করেন, তা হল তাঁর গাম্ভীর্য, ইচ্ছাশক্তি আর দুর্বোধ্যতা। তাঁকে দেখলেই আন্দাজ হয় তাঁর মেধা কত গভীর, প্রত্যয় কত অনমনীয়। তাঁর কর্তব্য তিনি জানতেন, সব অবস্থায় তাতে অটল থাকতেন। আমরা ক’জন সেই দাবি করতে পারি? এই কারণেই, যতই তাঁকে দেখা যাক, কিছুতেই ‘পরিচিত’ বলে দাবি করা চলে না। কোনও একটা আখ্যা বা ব্যাখ্যায় তাঁকে বন্দি করে ফেলা বড়ই কঠিন। যাকে কিছুতেই বোঝা যায় না, তাকে নিয়ে কে না বিড়ম্বিত হয়? লোকটা কি আমাদের পক্ষে, না কি বিপক্ষে? যখনই দুই যুযুধান পক্ষ নিজের নিজের দলের গণ্ডি টানতে থাকে, তাঁকে নিয়ে গোল বাধে।

বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আমার সাম্প্রতিক বইটির শিরোনামে আমি রাখতে চেয়েছিলাম এই কথাটি, ‘এক আধুনিক ভারতীয়ের সন্ধান’ (দ্য হোয়্যারঅ্যাবাউটস অব আ মডার্ন ইন্ডিয়ান)। আমার সম্পাদক ‘সন্ধান’ কথাটা পছন্দ করেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, ‘হোয়্যারঅ্যাবাউটস’ শব্দটি ভারতীয় ইংরেজিতে বড় বেশি পলাতক অপরাধীর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। অবশ্যই সেটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আর সম্ভবত এই মতান্তরের কারণ আমার সম্পাদক আর আমার মাতৃভাষার তফাত। আমি যা ধরতে চেয়েছিলাম, তা হল ওই মানুষটির রহস্যময় সত্তা। কে ছিলেন বিদ্যাসাগর? আজ তিনি কী হয়েছেন? কী করে আমরা নির্দিষ্ট ভাবে নির্ধারণ করব তাঁকে? তেমন নির্ধারণ কি আদৌ সম্ভব? ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে, আমার পছন্দের ‘হোয়্যারঅ্যাবাউটস’ কথাটা নিয়ে বিদ্যাসাগর হয়তো খুব এক চোট হেসে নিতেন, আর তাঁর কৌতুকের লক্ষ্য হতাম আমিই। কারণ শেষ অবধি যা দাঁড়াচ্ছে তা হল, বিদ্যাসাগরের সন্ধান পাওয়া খুবই সোজা। কেবল দেখতে হবে, কোন দিক লক্ষ্য করে ঢিল-পাটকেল ছোড়া হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টাফট্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্বের শিক্ষক। ‘বিদ্যাসাগর: দ্য লাইফ অ্যান্ড আফটারলাইফ অব অ্যান এমিনেন্ট ইন্ডিয়ান’(রাউটলেজ, ২০১৪) বইয়ের লেখক

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন